শ্রেষ্ঠ সম্পাদকের সম্মাননা ও প্রাসঙ্গিক কথা

প্রিন্ট সংস্করণ॥নূরুল আমিন চৌধুরী   |   ১০:৩৩, অক্টোবর ৩০, ২০১৯

যেকোন কাজে বা পেশায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার সম্মাননা প্রাপ্তি একজন ব্যক্তি বিশেষের জন্য একটা বিরাট ব্যাপার। আর সেটা যদি হয় সুকৃতিজনিত, কৃতিত্তের জন্যে তাহলে তো কোনো কথাই নেই। গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত এতদসংক্রান্ত দৃষ্টি নন্দন ছবিটি অবলোকন করে অত্র পত্রিকার যেকোন পাঠকের অন্তরেই একটা খুশির ঢেউ লেগেছে বলে আমার বিশ্বাস। এটা আমার সংবাদ পত্রিকা পরিবার সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের জন্যেই একটা সম্মানজনক গৌরবময় স্বস্তিদায়ক খুশির ব্যাপার।

তবে এ ব্যাপারে আমার কিছু কথা আছে। ছবিটির নিচের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে- ‘দৈনিক আমার সংবাদ সম্পাদক ও প্রকাশক হাশেম রেজাকে ২০১৮ সালের শ্রেষ্ঠ সম্পাদক সম্মাননা পদক তুলে দেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান ও অ্যাডভোকেট নূরুল আমিন রুহুল এমপি, অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। ধন্য হলেন সম্পাদক ও প্রকাশক হাশেম রেজা। ধন্য হলো তার অক্লান্ত শ্রমের স্বার্থকতা। ধন্য হলো পত্রিকাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক, সংবাদদাতা ও পাঠকসহ সকল শুভানুধ্যায়ী। এই সম্মানা প্রাপ্তির বিষয়টা সবার মধ্যে নবোদ্যমে কাজ করার একটা প্রেরণা যোগাবে।

আমাদের ছোট দেশটিতে অসংখ্য সংবাদপত্রের ভিড়ে মাত্র সাত বছরে দৈনিক আমার সংবাদ যে পাঠক প্রিয়তা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে সেটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ব্যক্তি হাশেম রেজার ব্যক্তিগত পরিচিতি ও কর্মনিষ্ঠা এর মুখ্যভূমিকা পালন করেছে। আজকাল ফেসবুকের কারণে কিছু লোক সংবাদপত্র পাঠ বিমুখ হতে চলেছে।

পত্রিকার পাঠক প্রিয়তা ও পাঠক সৃষ্টির জন্য সম্পাদক ও প্রকাশক হাশেম রেজার দূরদৃষ্টি সম্পন্ন পদক্ষেপগুলোর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে দেশব্যাপী বিপুল সংখ্যক মফস্বল সংবাদদাতা নিয়োগ ও তাদেরকে ঢাকায় এনে প্রশিক্ষণমূলক উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে তাদের মধ্যে যে উৎসাহ ও প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন সেটা সংবাদপত্র শিল্পে একটা মাইলফলক স্থাপনের উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক রয়েছে।

রয়েছে দক্ষ সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী। সেগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠা একটা সহজ কাজ নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সম্পাদক ও প্রকাশক হাশেম রেজা তা অনেকটাই করতে পেরেছেন। তবে পাঠকপ্রিয়তা বৃদ্ধিটা নির্ভর করবে পাঠক সৃষ্টি ও পাঠক বৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

এটা করার দুটো উপায় হলো: (১) মফস্বল প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া- যাতে মফস্বল শহরের পত্রিকার এজেন্ট ও পত্রিকার স্টলগুলোতে প্রতিদিনের পত্রিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। (২) সম্পাদক- প্রকাশক কমপক্ষে জেলা শহরগুলোকে তার সফরের আওতায় নিয়ে জেলা প্রশাসন, সকল পদের জনপ্রতিনিধি ও সংবাদদাতা ও সাধারণ সংবাদপত্রের উৎসাহী পাঠকদের সমন্বয়ে যদি সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এছাড়া পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় ও বহুল পঠিতকরণের জন্যে অন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে- (১). অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে জোর দেওয়া, (২). সঠিক তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন পেশ করা। (৩). খেলাধুলা ও সাহিত্যের পাতা সমৃদ্ধ করা। (৪). প্রকাশিত সংবাদের ফলোআপ অনুসরণ করে সর্বশেষ তথ্য উপস্থাপন করা। (৫). আন্তর্জাতিক সংবাদ ডেস্ককে সমৃদ্ধ করা। (৬). শব্দ চয়ন ও বানান সঠিক ও নির্ভুল হওয়ার ওপর জোর দেওয়া। (৭). কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য-বিনোদন ও শিক্ষার বিকাশ সম্পর্কিত বিষয়সমূহের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

সংবাদপত্রকে বলা হয় জাতির দর্পণ। নিখুঁত রূপচর্চার জন্যে দর্পণের সামনে দাঁড়ানো ছাড়া রূপচর্চার সৌন্দর্য উপলব্ধি বা অবলোকন করার কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ নারী-পুরুষরাও দৈনন্দিন জীবনে শয্যা ত্যাগের পর এবং ঘর থেকে বের হবার সময় আয়নায় আপন চেহারাটা একবার দেখে নেয়। ঠিক তেমনি আধুনিক যুগে যতই অনলাইন ব্যবস্থাপনায় সংবাদ পাঠ করা যায়, তবুও একটা পত্রিকা হাতে নিয়ে দুচোখের সামনে মেলে ধরে যে স্বাদ, মজা ও পরিতৃপ্তি পাওয়া যায় তার কোনো তুলনাই হয় না।

এজন্যেই প্রিন্ট মিডিয়ার মূল্য ও গুরুত্ব কখনোই হ্রাস পাবেনা। অনুসন্ধিৎসু ও রুচিবান পাঠকদের বিষয়টা মাথায় রেখে সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ দেশি-বিদেশি সংবাদ পরিবেশনায় সমধিক গুরুত্ব দিতে হবে। একটা জাতীয় দৈনিক পত্রিকাকে মান সম্পন্ন ও পাঠক প্রিয় করে তুলতে হলে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। সহজ গণসংযোগ ও গণ যোগাযোগের জন্য দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার সম্পাদকীয় ও প্রধান কার্যালয়টি রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল মতিঝিল প্রধান সড়কের পাশে অবস্থান করাটাও একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এটা জাতীয় দৈনিক পত্রিকার কার্যালয় হিসেবে ছোট পরিসরে হলেও অতি সুন্দর করে গোছগাছ করা ও ছিমছাম পরিবেশে কোলাহলমুক্ত, কার্যালয়টিতে প্রবেশ করলে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়না। এখানে রয়েছে এক শৈল্পিক পরিবেশ। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সবাই যার যার কর্মে মশগুল, বিস্ময়কর হলেও সত্য ও বাস্তব যে এ স্বল্প পরিসরে সুসজ্জিত কার্যালয়ের ভিতরেই সারাদেশের প্রায় সকল উপজেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের গ্রুপভিত্তিক যে সমাবেশ অনুষ্ঠানসমূহে অত্র পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হাশেম রেজা দিকনির্দেশনা প্রদান ও মতবিনিময় করেছেন যাকে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর আয়োজন বললে বেশি বলা হবে না।

তার এই উদ্যোগ প্রশংসাযোগ্য। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা সমূহের সংবাদকর্মীরা সরাসরি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের এমন ঘনিষ্ঠভাবে মুখোমুখি হওয়ার ও তার থেকে দিক-নির্দেশনা লাভের এমন সুযোগটি সৃষ্টি করে হাশেম রেজা প্রশংসনীয় একটা মাইলফলক স্থাপন করে একটা চমক সৃষ্টি করলেন। এতে আশা করা যায় তার পত্রিকার পাঠক প্রিয়তা বৃদ্ধিসহ সার্কুলেশনও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। তবে তজ্জন্য সংবাদকর্মীদেরও কিছু অতিরিক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের কাজ হতে হবে পাঠক সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। যে পত্রিকার চাহিদা যত বেশি, পাঠকপ্রিয়তা যত বেশি, সে পত্রিকার সংবাদকর্মীর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতাও ততবেশি হওয়াই স্বাভাবিক।

আগেই বলেছি যে, সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণস্বরূপ। দর্পণের সামনে দাঁড়ালে যে কেউ নিজের বাহ্যিক চেহারা বা অবয়বটা হুবহু নিখুঁতভাবে দেখতে পারে। তাতে তার সাজসজ্জায় কোনো খুঁত বা দৃষ্টিকটুতা পরিলক্ষিত হলে তা ঠিক করে নিতে পারে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অগ্রগতির ফলে বর্তমান সময়টাতে কেবল নিজেদের সমাজ ও দেশের প্রতিকৃতিটাই সংবাদপত্র নামের দর্পণে প্রতিফলিত হয় না, সমগ্র বিশ্বের প্রতিকৃতিও প্রতিফলিত বা প্রতিবিম্বিত হয়।

তাই যে কোনো দেশের যে কোনো জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনায় এ বিষয়টা মাথায় রেখে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দৈনন্দিনকার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহের সচিত্র প্রতিবেদন সন্নিবিষ্ট হয়ে প্রকাশিত হলে এধরনের সংবাদপত্র কেবল জাতীয় পর্যায়ে নয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়- বিশেষ করে অনলাইন সংস্করণের সুবাদে।

এসব দিক দিয়েও দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকা নিঃসন্দেহে সাফল্যের দাবি করতে পারে আন্তর্জাতিক ডেস্ক কর্তৃক সম্পাদিত বিশ্বসংবাদ প্রকাশের জন্য। পরিশেষে একটি বিষয়ে আমি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেটা হলো কোনো বই, কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা প্রতিষ্ঠানকে কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদানে উপযোগী মনোনীত করতে হলে ওই বইটি, বা ওই ব্যক্তিটি বা ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কিসের সূচকের ভিত্তিতে বা বিশেষ কোন কৃতিত্বের নিরীকে বা প্রেক্ষিতে মনোনীত ও নির্বাচিত করা হয়েছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বা বিবৃতি প্রদান করতে হয়। এ বিষয়টা প্রকাশিত হওয়া খুবই জরুরি।

কারণ বিশ্বসেরা নোবেল পুরস্কারটি বা বিশ্বের অন্য যে কোনো পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদানের সময় এটা বই, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার মাপকাঠিটি জনসমক্ষে তুলে ধরার রেওয়াজটি অত্যাবশ্যকীয়ভাবে প্রচলিত।

কিন্তু সম্পাদক ও প্রকাশক হাশেম রেজাকে ২০১৮ সালের শ্রেষ্ঠ সম্পাদক মনোনীত ও নির্বাচিত করার সূচকের বিষয়টি উল্লেখ করলে খুব ভালো হতো। এটা উল্লেখ থাকার দরকার এজন্যই যে, এ সম্মাননা প্রদানের বিষয়টি সমালোচকদের সন্ধিগ্ধভাব নিরসনে যেমন সহায়ক, তেমনি পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের নিকট এর স্পষ্টতা ও গুরুত্বটা উদ্ভাসিত হওয়ার দিক দিয়েও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

লেখক : কলামিস্ট, সাবেক অধ্যক্ষ, ভুলুয়া কলেজ, নোয়াখালী।

এমএআই


আরও পড়ুন