আকাশছোঁয়া পেঁয়াজের দাম কমবে কবে

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী   |   ০১:০৬, নভেম্বর ০৩, ২০১৯

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর থেকেই দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। গত এক সপ্তাহেই তিন দফায় বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম। আর গত এক মাসে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম প্রায় ১২০ টাকা বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহেও যে পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১৫০ টাকায়।

সরকারের তরফ থেকে বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাসেও বিশ্বাস রাখার কোনো উপায় নেই। ফলে লাগামহীনভাবে বেড়ে চলা পেঁয়াজের দাম কমবে কবে, এ প্রশ্নই এখন ভোক্তাদের মুখে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে দেশে উৎপাদিত নতুন পেঁয়াজ না ওঠা পর্যন্ত দাম কমার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে আরও প্রায় এক মাস আগুন দামেই পেঁয়াজ কিনতে হবে ক্রেতাদের। জানা গেছে, অক্টোবর মাসে ভারত থেকে নিষেধাজ্ঞার আগে ঋণপত্র খোলা প্রায় ১০ হাজার টন পেঁয়াজ ছাড় করেছে। যা দেশে এলেও বৃষ্টির কারণে অনেকটাই পচে নষ্ট হয়েছে।এছাড়া, গত মাসে মিয়ানমার থেকে প্রায় ১৯ হাজার টন এবং মিসর ও চীন থেকে দুই হাজার টনের মতো পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ খুবই কম।

এদিকে, গত সপ্তাহে দেশের দুটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ প্রায় পাঁচ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলেছে। এর মধ্যে সিটি গ্রুপ আড়াই হাজার টন ও চট্টগ্রামের বিএসএম গ্রুপ আড়াই হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করবে। তবে এসব পেঁয়াজ দেশে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অর্থাৎ চলতি মাসের ১৫ তারিখের আগে এসব পেঁয়াজ দেশে আসার সুযোগ কম।

এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মিসর থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে এলেই দাম কমবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টোটা। ১ নভেম্বর রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম উঠে গেছে ১৫০ টাকায়। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ টাকা কেজিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টিসিবি থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে খোলা ট্রাকে করে ৪৫ টাকা কেজি দরে যে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে, এর পরিমাণও আর বাড়ানোর সুযোগ কম। এছাড়া, চাহিদার তুলনায় টিসিবির বিক্রি করা পেঁয়াজের পরিমাণ খুবই নগণ্য। ফলে তাদের পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আমদানিকারক বলেন, সরকারের চাপে অনেকেই মুখে মুখে পেঁয়াজ আমদানির কথা বলছেন। কিন্তু এত স্বল্প সময়ের জন্য বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির ঝুঁকি কেউ নিতে চাইছেন না। কেননা, আগামী এক মাসের মধ্যেই নতুন পেঁয়াজ উঠে যাবে। আর এখন এলসি খোলা হলেও সেই পেঁয়াজ আসতে ১৫ দিন সময় লেগে যাবে। ফলে ১৫ দিনের মধ্যে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে। তা না হলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। জেনেশুনে কেউ এমন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বলে জানান তিনি।

তবে পেঁয়াজ আমদানিকারক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে এলসি খোলার পরও পেঁয়াজ দেশে আসতে একটু বেশি সময় লাগছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখন অনেক কম। এ জন্যই বাজারে দাম বেড়ে গেছে। খুব শিগগিরই পেঁয়াজের দাম কমে যাবে বলে জানান তিনি।

পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারাকে সরকারের ব্যর্থতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে পেঁয়াজ আমদানির জন্য বাংলাদেশ এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাই ভারতের মর্জির ওপরই নির্ভর করে চলতে হয়। হঠাৎ করে দেশটি নিজেদের বাজার সামাল দিতে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করলে বিপাকে পড়তে হয় বাংলাদেশের ভোক্তাদের। তবে রাতারাতি পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে এ দেশের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ভূমিকাও কম নয় বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সরকারের অদূরদর্শিতার কারণেই পেঁয়াজ নিয়ে এমন সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে। ভারতের বিকল্প কোনো উৎস যদি আমাদের আগে থেকেই ঠিক করা থাকতো, তাহলে একটি দেশ থেকে না পেলে অন্য দেশ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি করা যেত। সেক্ষেত্রে এতটা আকাশছোঁয়া দাম হতো না।

তিনি আরও বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পরদিনই আমাদের দেশের বাজারে যে দাম বেড়ে গেল, সেটা মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কেননা, দেশে সবসময়ই অন্তত এক মাসের চাহিদা পূরণ করার মতো পেঁয়াজ মজুদ থাকে। আর এলসি খোলা হলে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই পেঁয়াজ আনা সম্ভব। কিন্তু আমাদের এখানে যেটা হয়েছে, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভের শিকার হয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। সরকার কঠোর হলেই এদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিলো। পেঁয়াজের দাম নিয়ে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে এর জন্য খোদ সরকার ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরাই দায়ী।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন