সাকিব কাহিনি, কুমিরের পা ছেড়ে লাঠি কামড়ে ধরা

কাকন রেজা   |   ০৫:১৯, নভেম্বর ০৩, ২০১৯

প্রিয়জনদের কেউ কেউ বলছেন, ‘সাকিব কে নিয়ে লিখছেন না কেনো? অনেকেই তো লিখছে।’

যারা বলছেন, সেই প্রিয়জনদের কাছেই প্রশ্নটা রাখি, ‘সাকিব দোষী হলো না শাস্তি পেলো, না ক্ষমা পেলো, এসব কারণে আমাদের যাপিত জীবন কি কোনোভাবে প্রভাবিত হবে? পেঁয়াজের দাম কি কমে যাবে? বিদ্যুৎ, গ্যাস, পেট্রোল এসবের দাম? বিদেশে যে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে সেগুলো কি ফিরে আসবে? চার মাসে সড়কে আড়াই হাজারের উপর মানুষ প্রাণ হারিয়েছে তাদের স্বজনরা কি সান্ত্বনা পাবে? খুন হয়ে যাওয়া তরুণেরা কি ফিরে আসবে?’

জানি এমন প্রশ্নের উত্তর আপনাদের কাছে নেই। যখন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হয়। মানুষ বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা হারায়। একজন মানুষ ঘর থেকে বেরুলে সে নিরাপদে ঘরে ফিরবে কি না তা নিয়ে শংকায় থাকতে হয় স্বজনদের। এমন একটা অবস্থায় ক্রিকেটর মতো একটি খেলা এবং তার খেলোয়ার মানুষের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা ভেবে দেখার অবসর কি আছে আমার-আপনাদের? নেই। থাকলে সাকিব নিয়ে এত চর্চা হতো না। যারা এই চর্চার সৃষ্টি করেছেন তারা জানেন মাথামোটা বাঙালরা এটা নিয়েই মেতে থাকবে, আড়ালে পড়ে যাবে জীবনের অন্যান্য মৌলিক বিষয়গুলো।

আশ্চর্য হই, যখন দেখি, ব্যাংকের টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে, হাজার কোটি টাকা দুর্নীতিতে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, ত্রিশ টাকার পেঁয়াজ হয়ে যাচ্ছে এক’শ ত্রিশ টাকা, নতুন আইনের খড়গ চেপে বসছে মানুষে কাঁধে, তখন এতটা প্রগলভ হয় না কেউ। অথচ সাকিব জুয়ারিদের বিষয় কেনো জানায়নি তা নিয়ে রীতিমত গবেষণা শুরু হয়ে যায়। করুণা এমন মানুষদের, যারা মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার মানেটাই বোঝে না।

ফিনল্যান্ড, ক্রিকেটেও চ্যাম্পিয়ন নয়, ফুটবলেও না। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শান্তির দেশ। যেখানে মানুষের জীবন নিশ্চিত। যেখানে সন্তানের ভবিষ্যত ভেবে বাবা-মা’র মাথার চুলে উঠে যায় না। যেখানে ঘর থেকে বেরুলে ফিরবে কি না ভেবে স্বজনরা শংকিত হয় না। যেখানে চাকরি পেতে ঘুষ দিতে হয় না। যেখানে মানুষ হাজার লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে না। বিদেশে সেকেন্ড হোমও বানায় না। এমন অবস্থা ও ব্যবস্থাটাই প্রয়োজন। ক্রিকেটের চেয়ে যাপিত জীবন নির্বিঘ্ন হলো কি না, আমি কথা বলতে পারছি কি না, আমার মত শাসকগোষ্ঠীর কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে কি না- এটা বেশি প্রয়োজন।

একজনের লেখা দেখলাম সাকিবকে নিয়ে। লেখা নয় বরং গবেষণাপত্র বলা যায়। কেনো সাকিব জুয়ারির প্রস্তাব গোপন রাখলেন এ নিয়ে তার আক্ষেপের শেষ নেই। সাকিব যে সত্যিকার অর্থেই দোষী তা প্রমাণে চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি নেই সে পত্রে। আমি ওই ভদ্রলোকের লেখা পড়ি, তার প্রতি দৃষ্টি রাখি, কেউকেটা হিসাবেই রাখি। আমার মনে পড়ে না বাংলাদেশ ব্যাংকের লোপাট হওয়া টাকার বিষয়টি সাবেক গভর্নর আতাউর রহমান যখন দুই মাস লুকিয়ে রাখলেন, সে বিষয়ে তার তেমন গবেষণাপত্র রয়েছে কি না। তিনি সেই লুকিয়ে রাখার কারণ উদ্ধার করতে চেয়েছেন কি না, যেমনটা করেছেন সাকিবের ক্ষেত্রে, আমার জানামতে করেননি।

আমাদের টাকাই থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকে। যে টাকা চুরি গেছে সেটা আমাদের টাকা। যে টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে তা আমাদের টাকা। এই টাকা লোপাটে-পাচারে ক্ষতি হয়েছে আমাদের। অথচ সাকিব যদি জুয়ারিদের টাকা পকেটে তুলতো তাতেও আমাদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হতো না। আমাদের যাপিত জীবনে সাকিবের সেই দোষের কোনো প্রভাব পড়তো না।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে বারবার সেই শেয়াল আর কুমিরের উদাহরণ টেনে আনতে হয়। ওই যে, ‘পা না ধরে লাঠি ধরেছিস’, সেই গল্পটা। শেয়ালতো কুমিরের বাচ্চা খেয়ে নিয়েছে। কুমির রয়েছে প্রতিশোধের ধান্ধায়। নদী পার হতে গেলেই শেয়ালকে ক্যাঁক করে ধরে নেবে। একদিন পেয়েও গেলো শেয়ালকে। শেয়াল নদী পাড় হচ্ছে এমন সময় কুমির তার পা কামড়ে ধরলো। শেয়াল দেখলো মহা মুসিবত। চালাক শেয়াল দমে না গিয়ে বললো, গাধা কুমির তোর আর বুদ্ধি হলো না, পা ছেড়ে লাঠি কামড়ে ধরলি। যেই বলা, কুমির তাড়াতাড়ি পা ছেড়ে উল্টো শেয়ালের লাঠিটাকে কামড়ে ধরলো। আর সেই সুযোগে শেয়াল পগারপার।

সাকিবের গল্প সেই শেয়াল পগারপারের নিমিত্তেই। শেয়াল ভাগানোর কিচ্ছাই আজ আমাদের শুনতে হচ্ছে নানাভাবে, নানা আঙ্গিকে বারবার।

লেখক : সাংবদিক ও কলাম লেখক

আরআর


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর