নাগরিকপঞ্জির ফাঁদে আসামের বাঙালি

প্রিন্ট সংস্করণ॥লে. কর্নেল মো. রুহুল আমীন (অব.)   |   ০২:৩৪, নভেম্বর ০৭, ২০১৯

সাম্প্রতিককালে হঠাৎ করেই উত্তর—পূর্ব ভারতের আসাম রাজ্যের প্রায় ২০ লাখ মানুষ এক সরকারি আদেশে পরিচয়হীন, অধিকারহীন ও রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ল। তাদেরকে বলা হচ্ছে অবৈধ অভিবাসী বা উদ্বাস্তু। অথচ যুগ যুগ ধরে এই মানুষগুলো ছিলো ভারতের আসাম রাজ্যের নাগরিক। এখন তারা “না ঘর কা, না ঘাট কা”।

বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে কত অদ্ভুত ও চমকপ্রদ ঘটনাই না ঘটে। আর এসবই হচ্ছে রাজনীতি ও কূটনীতির চাল যা অমানবিক। এই মানুষগুলো ছিলো আসামের উন্নয়নের স্থপতি, স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশীদার, দেশের পক্ষে কার্গিল যুদ্ধের সৈনিক, মন্ত্রী, সাংসদ, ব্যবসায়ী, কবি ও সাহিত্যিক। এখন তাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে আশ্রয় কেন্দ্র।

যাদের কথা বলছি তারা আর কেউ নয়— আসামের ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান। এদের এখন কোনো রাষ্ট্র নেই, নেই কোনো দেশ। এরা অবৈধ অভিবাসী, উদ্বাস্তু, বিদেশি, আশ্রয় প্রার্থী ইত্যাদি। গত ৩১ আগস্ট ২০১৯ তারিখে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জী বা নিবন্ধন বা এন আর সি অনুযায়ী এই ১৯,০৬,৬৫৭ জন মানুষ আর ভারতীয় নয়। ভারতের নাগরিক তালিকা থেকে তারা বাদ পড়লো। আসামের বিজেপি সরকারের এই হলো সিদ্ধান্ত।

তবে তাদেরকে এবং বিশ্ববাসীকে জানানো হলো যে তারা ইচ্ছে করলে নবগঠিত “ বিদেশি ট্রাইব্যুনাল” নামে পরিচিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আপীল করতে পারবে। যারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রমাণ করতে পারবে যে তারা আসাম অর্থাৎ ভারতের নাগরিক তাদেরকে এই তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে। আপীলে প্রত্যাখ্যাত হলে বা হেরে গেলে তাদের ভাগ্য হবে অনিশ্চিত, তাদের থাকবে না কোনো ঠিকানা, সাময়িকভাবে আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিবে।

‘ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়মাবলী, ২০০৩’ ((Citizenship Registration of Citizens and Issue of National Identity Card) ) Ruls,2003) —এর অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জীতে ভারত ও ভারতের বাইরে থাকা নাগরিকদের তথ্যাবলী সন্নিবেশিত থাকবে। আসামের এন আর সি মূলত: এই রাজ্যে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিকদের তালিকা। এই নিয়মের অধীন নিবন্ধনকৃত ভারতের নাগরিকগণকে একটি পরিচয়পত্র দেয়া হয়। ২০১৫ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এন আর সি—র কাজ শুরু হয়।

২০১৮ সালের ৩০ জুলাই এন আর সির খসড়া প্রকাশ করা হয় যাতে ৪০ লাখ আসামবাসীর নাম উঠেনি। ১ম খসড়া প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর। উল্লেখ্য, কেবল আসামেই এই এন আর সি কার্যক্রম চলছে, অন্য কোনো রাজ্যে নেই। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশ বলে নিবন্ধন হাল নাগাদ করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

রাজ্যের ৩.৩ কোটি মানুষ প্রমাণ করেছিল যে তারা ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর আগে ভারতীয় নাগরিক ছিলো। আসামে এন আর সি সর্বপ্রথম ১৯৫১ সালে তৈরি হয়েছিল। এই তালিকায় যারা ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে ভারতের বাসিন্দা ছিলেন বা ভারতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বা তাদের বাবা—মা জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বা ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ —এর আগে কমপক্ষে ৫ বছর ভারতে বসবাস করেছিলেন তারা তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। আজ সেই তারাই তালিকার বাহিরে। আসাম থেকে বাঙালিদের বহিষ্কারের ষড়যন্ত্র শুরু হয় পঞ্চাশ—এর দশকে “বংগাল তাড়াও” আন্দোলনের মাধ্যমে।

আসামে ত্রিশের দশক থেকে বৃটিশ রাজ জঙ্গলাজীর্ন ও অনাবাদী জমিকে আবাদ করার জন্য পূর্ব বাংলা থেকে বাঙালিদেরকে ঐ অঞ্চলে নিয়ে যায়। আসামের অনাবাদী ভূমিকে এরা কৃষি জমিতে উন্নীত করে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর তারা আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা মূলত: হিন্দু। মুসলমানরা পূর্ব বাংলায় চলে আসে।

শিক্ষা—দীক্ষায়, চাকরি— ব্যবসায় এরা আসামের আদিবাসীদের তুলনায় উন্নতি লাভ করে। এটিই তাদের জন্য কাল হয়েছে। ঈর্ষান্বিত হয়ে বাঙালিদের বিতাড়নের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। নৃশংস ‘বংগাল তাড়াও’ আন্দোলনে হাজার হাজার বাঙালি হত্যার শিকার হয়। ফলশ্রুতিতে ৫০ হাজার বাঙালি পশ্চিম বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হয়। অনেকে নিজ বাসভূমি ছেড়ে বাঙালি অধ্যুষিত আসামের বরাক উপত্যকায় চলে আসে। এভাবেই চলে যাচ্ছিল।

কিন্তু ১৯৭৯ সালে বাঙালি বিরোধী সর্ব আসাম ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হলে আবার শুরু হয় বাঙালি নিধন। ছয় বছর ব্যাপী এই আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন তা প্রশমনের জন্য রাজীব গান্ধী সরকারের সময় ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট আসাম চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে যারা ভারতে তথা আসামে ছিলো তারা নাগরিক অধিকার পেয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তি আর বাস্তবায়িত হয়নি। বিজেপি ২০১৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে “বংগাল তাড়াও” —কে অন্তর্ভুক্ত করে।

৮০ লাখ বাঙালিকে আসাম থেকে বিতাড়নের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আদিবাসী আসামীরা এই টোপ গিলে যার ফলে বিজেপি আসামে জয়ী হয়। এরপরই খেলা শুরু হয়, শুরু হয় এন আর সির কাজ। এন আর সি নিয়ে ভারতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। ভারতের বুদ্ধিজীবীরা, নিরপেক্ষতাবাদীরা, দূরদর্শী রাজনীতিকরা সোচ্চার হয় এর সমালোচনায়। পঞ্চাশ দশকের এন আর সি আর এখনকার এন আর সি—তে আকাশ—পাতাল তফাৎ। আসাম চুক্তির সাথেও বর্তমানের এন আর সি সাংঘর্ষিক। বিজেপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক স্বার্থে এন আর সি বা নাগরিক পঞ্জীর রূপ পরিবর্তিত হয়ে যায়।

এজেন্ডা হল বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম জনগণকে আসাম থেকে বিতাড়ন। লক্ষ্য দুটি— একটি হলো ভারত থেকে মুসলমানদের বিতাড়ন, দ্বিতীয়টি হলো প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বাঙালিরা বিজেপির ভোটার নয়, বরং কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক, তাই তাদের বহিষ্কার। এর ধারাবাহিকতায় ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও একইভাবে এন আর সি কার্যক্রম শুরু হবে বলে সরকার ঘোষণা দিয়েছে।

পরবর্তী লক্ষ্য সম্ভবত: পশ্চিম বাংলা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এর বিরুদ্ধে একাট্টা। বিজেপি মনে করে এই বাঙালিরাই তৃণমূলের শক্তি। আসাম এবং ভারতীয় বিজেপি নেতারা বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন যে চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৪ থেকে ১৫ লাখ তথাকথিত অভিবাসী অর্থাৎ বাংলাদেশিদের আদি নিবাস বাংলাদেশেই ফেরত দিতে হবে। শুধু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত তারা ডিটেনশন ক্যাম্প বা বন্দি শিবির বা আশ্রয় কেন্দ্রে থাকবে। এটিও কতটুকু বাস্তব সম্মত তা সময়ই বলবে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয় শংকর গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসে বলে গেছেন যে এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বিবৃতি দিয়েছেন যে- এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমাদের চিন্তার কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরূপ আশ্বাস দিয়েছেন। সত্যিই কি আমাদের চিন্তার কিছু নেই ?

মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আমরা উপঢৌকন পেয়েছি ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। এখন অপেক্ষা কবে আসামের বাঙালিরা আমাদের অতিথি হয়ে আসবেন। এই অতিথির সংখ্যা আরো বেশী। চট্টগ্রাম—কক্সবাজার প্রাকৃতিক—সামাজিক চরিত্র হারাচ্ছে যেভাবে অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের আগমনে, আসামের পার্শ্ববর্তী সিলেটের অবস্থাও কী হবে সেটা দেখার অপেক্ষায়ই আমরা থাকব।

মজার ব্যাপার হলো ভারতের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন চিন্তাবীদরা আসামের বাঙালিদের নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছে এই জন্য যে, এর ভবিষ্যৎ শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয় ভারতের জন্যও আত্মঘাতিমূলক হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন কেন বোধগম্য হচ্ছে না।

আমাদের দৃষ্টি বর্তমানের মধ্যে সীমিত আর ভারতীয়রা ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন, এখানেই পার্থক্য। অথবা অন্য কোনো অজানা কারণ থাকতে পারে। বিজেপি তো ধর্ম নিরপেক্ষ দল নয়, মৌলবাদী দল। অথচ ভারতের সংবিধান অনুযায়ী ভারত ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ। সেই চরিত্র কি আছে ? কাশ্মীরের সংবিধানে পরিবর্তন করে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ভারতের সমালোচনা হচ্ছে। ভারতের কূটনীতি আক্রান্ত।

এছাড়া, কাশ্মীর নিয়ে যে কখনো ঝড় উঠবে তা কে জানে। বাঙালিদের নিয়ে এই খেলায় সাময়িকভাবে সরকার জয়ের ঢেকুর তুললেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ভুক্তভোগী বা আক্রান্ত মানুষ হিংস্র পশুর মত আচরণ করতে পারে। তাতে ভারত, বাংলাদেশ কেউ স্বস্তিতে থাকবে না। একটা বাস্তব সত্য কি- ক্ষমতাসীন কারো মাথায় আসে না যে ১৯ লাখ বা কিছু কমে যদি ১৫ লাখও হয় যারা ভারতীয় নাগরিকত্ব হারাবে তারা কোথায় যাবে। ভারত কোন সুখে তাদের খাওয়াবে—পরাবে!

যেহেতু তারা বাঙালি, যেহেতু তারা বাংলা থেকে গিয়ে অভিবাসী, যেহেতু তাদেরকে আসামের এবং ভারতের ক্ষমতাসীনরা বাংলাদেশি বলে আখ্যা দিয়েছেন, তাহলে সহজ সমীকরণ হলো, তারা বাংলাদেশের সীমান্তেই হয়তো একদিন জড় হবে যেমন হয়েছিল রোহিঙ্গারা। তখন বলা হবে মানবিক কারণে তাদের নিতে হবে অথবা তাদের প্রতিহত করা হবে, মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে হবে। একটা বিষয় মনে জাগছে, কেমন আছে এই ২০ লাখ বাঙালি, কি তাদের মনের অবস্থা, কেমন করে তারা দিন কাটাচ্ছে।

মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেছে ইতোমধ্যে ১০০ বাঙালি আত্মহত্যা করেছে। তাদের মনোবলতো পায়ের পর্যায়েই যাওয়ার কথা। একদিন যাদের গোলা ভরা ধান ছিলো, পুকুর ভরা মাছ ছিলো, বাগান ভরা ফল— তরকারী ছিলো আজ তারা এক কলমের খোঁচায় সর্বহারা। তাদের জমি, ঘর, ব্যবসা, চাকরি কিছুই থাকবে না। তিন পুরুষ থেকে বাপ—দাদার ভিটে থেকে তাদের বিদায় নিতে হবে, আশ্রয় কেন্দ্রে রেশনের উপর নির্ভর করতে হবে! কি অপরাধে ? তাদের গোত্র ভিন্ন এই জন্য ? এরা সবাই কিন্তু দিন মজুর বা অশিক্ষিত জনগণ নয়।

এদের মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রখ্যাত সাবেক মন্ত্রী, সাংসদ, সেনা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব, কবি—সাহিত্যিক। তাদের অনেকের নামও আমরা জানি। আজ তারা পথের মানুষ। একদিন তারা সীমান্তের কাটাতারের বেড়া ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে, হা-পিত্যেস করবে। মানবতার প্রতি কী নির্মম নিষ্ঠুর অবহেলা! প্রায় ১৪০ কোটি ভারতীয় মানুষের কাছে যদি ১৫ থেকে ২০ লাখ লোক বোঝা হয় তবে ১৫ কোটির বাংলাদেশে তারা কী হবে যেখানে আরো ১১ লাখ মজুদ রয়েছে আগে থেকেই। আমরা আশাহত হলেও একেবারেই নিরাশ হবো না।

শুভবুদ্ধির উদয় হয়তো হবে। বিশ্ব বিবেক, ভারত বিবেক এবং বাংলাদেশের বিবেক হয়তো জাগরিত হবে। হয়তো আমরা শুনবো “মানুষ মানুষের জন্য” আরো দরাজ গলায়। নতুন নতুন ভুপেন হাজারিকা, ফকীর আলমগীর, লালন ফকির, হাছন রাজা, আব্দুল করিম বয়াতী মানবতার গান নিয়ে রাস্তায় নামবে হয়তো। আর যদি কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান না—ই হয় তবে বুঝব যে পৃথিবী ধ্বংসের আর বেশী বাকী নাই।

লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর