সৌদি থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরার কারণ কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   ১২:৫৩, নভেম্বর ০৭, ২০১৯

সংসারে সচ্ছলতা আনতে অনেক স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু, তাদের সে স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন। নিয়মভঙ্গের অভিযোগে সৌদি আরব সরকার গেলো পাঁচদিনে ৪২১ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে ফেরত পাঠিয়েছে।

দেশে ফেরত আসা এসব কর্মীরা বলছেন, আকামার মেয়াদ থাকার পরো তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে সৌদি সরকার।

বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে চলতি মাসের প্রথম পাঁচদিনে মোট ৪২১ জন ফিরেছেন। এর মধ্যে ১ নভেম্বর ১০৪ জন, ২ নভেম্বর ৭৫ জন, ৩ নভেম্বর ৮৫ জন, ৪ নভেম্বর ৬১ জন ও গতকাল ৬ নভেম্বর ৯৬ জন ফিরেছেন।

চলতি বছর অন্তত ১৮ হাজার শ্রমিক সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন – বলছে এক পরিসংখ্যান। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে ফেরা এবং এখনো না-ফেরা শ্রমিক, দূতাবাস এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞ- এ রকম নানা পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, এর পেছনে বড় কারণ হলো তথাকথিত সৌদি ফ্রি ভিসা, আর সৌদি আরবের নতুন শ্রমনীতি এবং অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা।

সৌদি আরবে ১৬ বছর ধরে কর্মরত এস এম শামীম নামের এক যুবক বলেন, ফ্রি ভিসায় কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের আকামা ফি বাড়িয়ে দেয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ থেকেই সবচেয়ে বেশি শ্রমিক ফ্রি ভিসায় সৌদি আরবে কাজ করতে যান। ভিসায় উল্লেখ থাকা নির্দিষ্ট কোম্পানির বাইরে কাজ করলে সেটি সৌদি আইনে এখন অবৈধ। কিন্তু ফ্রি ভিসায় গিয়ে আয় রোজগার বাড়াতে অনেকেই সে কাজটি করত বাধ্য হন।

এখন সৌদি আরবের যে নতুন নিয়ম তাতে ওয়ার্ক পারমিটের ভেতর আপনার যে পেশা তার বাইরে আপনি কোনো কাজ করতে পারবেন না। কিন্তু ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করে যারা এখানে আসে তারা ৬০০, ৭০০ বা ৮০০ রিয়াল বেতন পায় এই টাকায় তাদের হয় না। তখন তারা কী করে, ডিউটির পরে তারা বিভিন্ন জায়গায় কাজে যায়।

কিন্তু যদি সে ধরা পড়ে, তখন পুলিশ চাইলে তাকে পাঠায়ে দিতে পারে। এটাও একটা কারণ।

এস এম শামীম আরো বলেন, সব দেশের শ্রমিকদেরই একইভাবে ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষ, তবে বাংলাদেশের শ্রমিকরা সংখ্যায় বেশি।

এর আরেকটা কারণ হলো – সে স্পন্সরের সঙ্গে চুক্তি করে আসে যে তার ঐখানে কাজ করবে। ধরেন, ড্রাইভার হিসেবে গেল। কিন্তু সে গিয়ে সেখানে সুবিধা-অসুবিধা দেখে অন্য যায়গায় গিয়ে কাজ করা শুরু করলো।

কোনো শ্রমিক এভাবে কারো বাসা বা ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে গেলে ঐ মালিক তার বিরুদ্ধে একটা জিডি করে রাখে। এরপর ঐ শ্রমিক যখন ধরা পড়ে তখন তাকে বের করে দেয়। এছাড়া সৌদি সরকার ফ্রি ভিসার শ্রমিকদের জন্য ইকামা নবায়ন ফি-ও এখন বাড়িয়ে দিয়েছে।

শামীম আরো জানান, এখন আকামা রিনিউ করতে লেবার অফিসের ফি হচ্ছে প্রতি মাসে ৬০০ রিয়াল। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে সেটি ৮০০ রিয়াল করা হয়েছে। সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বলছেন এ ফি-টা খুব বেশি, এটা পে করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব।

তার মতে – এখন ফ্রি ভিসাতে কোনো লোকের কোনো অবস্থায়ই সৌদি আরব আসা যাবে না। কোনো লোকের আপন ভাই যদি বলে যে তুমি আসো তোমাকে ফ্রি ভিসায় নিয়ে আসতেছি, আমার পরামর্শ হইলো আপন ভাইয়ের কথাও শুনবেন না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ফ্রি ভিসার লোক পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া।

ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১০ মাসে ৯৬০জন নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে ৪৮ জন নারীর মৃতদেহ এসেছে সৌদি থেকে। ফিরে আসা এই নারীদের বেশিরভাগই নির্যাতনের শিকার হবার অভিযোগ করছেন।

এদিকে, সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত আসা নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস সম্প্রতি একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, যদি কেউ স্পন্সরের বাইরে কাজ করে, পালিয়ে যায় কিংবা ইকামা, বর্ডার ও শ্রম আইনের কোনো ধারা ভঙ্গ করে তাহলে তাকে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করে সৌদি সরকারের অর্থায়নে ডিপোর্টেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে।

এছাড়া সৌদি সরকার কর্তৃক সম্প্রতি কিছু পেশা ও সেক্টরে নন-সৌদিদের কাজ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় ঐসকল পেশায় যদি কোনো প্রবাসী নিযুক্ত থাকেন, তিনি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং এরকম অবৈধ প্রবাসীদেরও সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

কেউ নির্দোষ দাবি করলে তাকে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগেরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এমএআই


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর