‘মেথরের ছেলে বলে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছে’

মো. হুমায়ুন কবির, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)   |   ০৬:৪৪, নভেম্বর ০৭, ২০১৯

ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের গো-হাটা সংলগ্ন হরিজন কলোনির ছেলে নয়ন বাশফোড় (১৩)। তার বাবা মৃত মিন্টু বাশফোড়। বাবা না থাকালেও নয়ন চেষ্টা করেছিলেন স্কুলে পড়ালেখা করার। কিন্তু সহপাঠীদের অবহেলায় আর শিক্ষকদের পাশে না পেয়ে পড়ালেখা ছাড়তে হয় তাকে। বর্তমানে নয়ন পেটের দায়ে রিকশাচালক হয়ে গেছে।

অবহেলিত নয়ন দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, স্কুলে গেলে ক্লাসের কেউ কথা বলত না। একসাথে বেঞ্চে বসতে দিত না। কিছু জানতে চাইলে ‘মেথর’ বলে গালি দিত। কিছু না করলেও আমার সাথে ঝগড়া করত, মারতেও চাইত। স্যারের কাছে বিচার দিলেও সে কিছু বলত না। বিস্কুট দিয়ে আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিত। ঠিকমতো আামকে ক্লাসও করতে দেয় নি।

নয়ন আরও জানান, আমরাতো গরিব। ভালা ইশকুলে (স্কুলে) পড়নের টেকা নাই। তাই টু পর্যন্ত পইড়া ইশকুল (স্কুল) ছাইড়া দিছি। অহন পেটের দায়ে রিকশা চালাই।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) সকালে রিকশাচালক নয়নের দেখা মেলে গৌরীপুর পৌর শহরের উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে। রিকশা নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিল নয়ন। ইশারায় ডাক দিতেই জিজ্ঞাসা করেন কই যাইবেন বাবু। যাত্রীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমার সংবাদের সঙ্গে গল্প হয় নয়নের।

নয়ন বলেন, আমি অনেক ছোট থাকতেই আমার বাবা মারা গেছে। তারপর মা পৌরসভার কাজ (পরিচ্ছন্ন কর্মী) অনেক কষ্ট করে আমাদের সংসার চালাচ্ছেন। আমরাও অভাবের মইধ্যে খেয়ে-না খেয়ে বড় হয়েছি। ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করে চাকরি করব। তবে মেথরের ছেলে বলে (স্কুলে) পড়তেই পারলাম না। স্কুলে যাওয়া বাদ দেয়ার পর মা বলত বাড়ি বসে থাকলে খাবি কি। টাকা রোজগারের একটা পথ বের কর। তারপর থেকেই ভাড়ায় রিকশা চালানো শুরু করেছি। আমি লম্বায় ছোট হওয়ায় রিকশা চালাতে অনেক কষ্ট হয়।

নয়নের মা মালতী বাশফোড় পেশায় পৌরসভার পরিচ্ছন্ন কর্মী। তার পরিবারের চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় ভাই ফকিরা বাশফোড় ও বড় বোন রাধা বাশফোড় বিয়ে করে আলাদা হওয়ার পর পরিবারকে সাহায্য করে না। দ্বিতীয় ভাই রাখাল বাশফোড় পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করে। ছোট ভাই মুন্না বাশফোড় (স্কুলে) না পড়তে পেরে বাড়িতেই থাকে।

প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপজেলার শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রিকশায় যাত্রী নিয়ে ছুটে চলেন নয়ন। দিনশেষ তার আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেখান থেকে রিকশার মালিককে ১৫০ টাকা দিতে হয়। বাকি যে টাকা থাকে সেখান ৫০ টাকা নিজের জন্য রেখে বাকিটা মায়ের হাতে তুলে দেন নয়ন।

রিকশাচালক নয়ন বলেন, রিকশা চালানোর সময় স্কুলের ছাত্ররা আমাকে দেখলেই টিটকারি মেরে বলত ‘মেথরের ছেলে রিকশা চালায়’। আবার আমি ছোট বলে অনেক পেসেঞ্জার (যাত্রী) ধমক দিয়া ভাড়া কম দেয়। তখন খুব খারাপ লাগে। মনে মনে ভাবি কেউ যদি আমারে পড়ালেখার খরচ দিতো, তাইলে আমি সত্যিই রিকশা চালান বাদ দিয়ে (স্কুলে) ভর্তি হইতাম।

নয়নের সঙ্গে কথা বলার সময় একযাত্রী এসে বললেন, ‘এই ছেলে রিকশা চালক কোথায় গেছে বলতে পারো? কথার রেশ টেনে নয়ন বলেন, আমিই চালক, কোথায় যাবেন বাবু? বিস্মিত হয়ে যাত্রী নয়নকে বললেন, তোমার তো এই বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা। তুমি রিকশা চালাও কেনো বাবা?। নয়নের সোজাসাপটা জবাব স্কুলে তো মা ভর্তি করছিল। তবে মেথরের ছেলে বলে স্কুলে পড়তে পারি নাই। এখন পেটের দায়ে রিকশা চালাই।

এমআর


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর