ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচনের আমেজ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম ও আবদুর রহিম   |   ১২:১৩, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

  • বিতর্কিতদের ঠাঁই নেই আ.লীগে
  • ভোটের মাঠে থাকবে বিএনপি

আগামী জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে পারে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক হিসাব কষতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। সরকার ব্যর্থ— এমন জনসম্পৃক্ত বেশকিছু ইস্যু নিয়ে মাঠে থাকার পরিকল্পনা করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। দুই সিটিতেই শক্তিশালী ও যোগ্য প্রার্থী দিতে সব ধরনের ভেতরগত প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সিটি নির্বাচন ঘিরে নানা কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দলটির সমর্থন নিয়ে কাউন্সিলর হয়েছেন এমন অন্তত ৩০ জনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। গাঢাকাসহ আতঙ্কে আছেন আরও ২০ জনেরও বেশি।

ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছে তিনজন কাউন্সিলর। আগামীতে দল ও সরকারের দুর্নীতিবাজ, বিতর্কিতদের ছেঁটে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিদের দায়িত্বে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্বৃত্তায়নচক্র ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, রাজধানীর ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের সরকারি দলের প্রার্থী নির্ধারণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, এটা পরিষ্কার। কাউন্সিলর পদে অধিকাংশ ওয়ার্ডে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা। বেশকিছু ওয়ার্ড ঘিরেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়া বর্তমান কাউন্সিলরের অনুপস্থিতিতে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছেন একাধিক প্রার্থী। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচার চালাচ্ছেন।

তবে নির্বাচনের মূল আকর্ষণ মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়ে স্বস্তিতে রয়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। বিশেষ করে উত্তর সিটি নির্বাচনের প্রার্থী বদলেরর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বদলের গুঞ্জন হলেও শেষ পর্যন্ত বর্তমান প্রার্থীই বহাল থাকবেন বলে জানা গেছে।

ইসি সূত্র মতে, আগামী জানুয়ারি মাসের শেষদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ভোট হবে। ১৫ নভেম্বরের পর তফসিল ঘোষণা করা হবে। দুই সিটিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট হবে।

আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপি বলেন, ডিসেম্বর পর যেকোনো সময় সিটি নির্বাচন হবে। এপ্রিলের মধ্যে হতে হবে। আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। যারা আগ্রহী তাদেরও প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

প্রার্থী নির্ধারণের যোগ্যতা প্রসঙ্গে সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে সব নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচনের মাত্রা একই রকম। এবার একটু ভিন্ন। চারটি বিষয় সামনে প্রার্থী নির্বাচন করে হতে পারে।

প্রথমত. কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সম্পৃক্ত না থাকা। দ্বিতীয়ত. নির্বাচনি এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা। তৃতীয়ত. আমাদের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা। চতুর্থত. ঐ এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে তার সক্ষমতা। এই বিষয়ে যিনি এগিয়ে থাকবেন, তাকে মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্তে আনা হবে। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনেই জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ।

এজন্য উইন অ্যাবল প্রার্থী দিতে চায় দলটি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি উত্তর সিটির উপ-নির্বাচনে মেয়র হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। বছর না পেরুলেও বেশকিছু উদ্যোগের কারণে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

আগামীতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আতিকে ভরসা রাখছেন বলে জানা গেছে। তবে নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতায় আরও আলোচনায় আছেন সাবেক মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক ও ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমত উল্লাহ।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমান সাঈদ খোকন বেশকিছু কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচনার মধ্যে পড়েছেন। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তাকেই এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকরা।

এর বাইরে আলোচনায় আছেন— ঢাকা-১০ আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ।

এদিকে, ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করে রেখেছে দলটি। চট্টগ্রামে প্রার্থী ঠিক করতে এখনো নিয়মিত স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা চলছে। জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর জোটশরিক জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতাসীনদের অধিনে আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিলেও আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সকল নির্বাচনেই শক্তভাবে থাকার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত তারেক রহমান।

ইতোমধ্যে ঢাকা-উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রস্তুতি সভা শুরু করছেন দলের নেতাকর্মী। লন্ডন থেকে তারেক রহমানও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীকে পরামর্শও দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি— বিএনপি নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েই সামনে আগানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সামপ্রতিক ইস্যু নিয়ে সরকারের প্রতিবাদ এবং জনগণের মুখোমুখি থাকতে, রাজনীতিতে টিকে থাকতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অপ্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে উত্তরে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণে মৃত সাবেক মন্ত্রী ও মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনই হবেন চুড়ান্ত প্রার্থী। দলের নীতিনির্ধারণী সূত্র আমার সংবাদকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। নগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ও সহসভাপতি আবু সুফিয়ানের মধ্যে একজন প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে মেয়র প্রার্থী ঠিক কাকে করা হবে গণমাধ্যমে এখনো বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

বিগত নির্বাচনে ঢাকা-উত্তর সিটি কর্পোরেশনে তাবিথ আউয়াল, ঢাকা-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মঞ্জুর আলম মেয়র এই পদে নির্বাচন করেন। দুপুর ১২টায় বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন বিএনপি মেয়রপ্রার্থীরা।

জানা গেছে, ঢাকা-উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনসহ দেশের বিভাগীয় সিটিগুলোতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশের শীর্ষ নেতারা ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছেন।

দলের একাধিক নেতা জানান, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকার এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ ও সরকারি দল সমর্থক ভিসিদের অপকর্ম ফাঁস হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিএনপি এখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত রাখতে ইস্যুকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। সরকারবিরোধী প্রচারণায় নিজেদের মাঠে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দুই সিটির নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার সংবাদকে বলেন, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় এ সরকারের আমলে সব নির্বাচনই প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। বিএনপি গণতান্ত্রিক দল তাই সব সময়ই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকে, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। আমরা এখন সব নির্বাচনেই অংশ নিচ্ছি। তবে আমরা চাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর তা হলে সব নির্বাচনেই বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হবে। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন খোকা। ২৯ নভেম্বর ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে ঢাকা মহানগরের মেয়র ছিলেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন হয়।

ঐ নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনিসুল হক আর দক্ষিণে সাঈদ খোকন নির্বাচিত হন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আজম নাছির উদ্দিন নির্বাচিত হন। ঢাকা উত্তরে মেয়র আনিসুল হক ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। এরপর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি উত্তর সিটির উপ-নির্বাচনে মেয়র হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর