চাকা ঘুরলেই ‘কাঙালি ও লাঠিয়াল’ নামে চাঁদাবাজি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা   |   ১২:৪৪, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

গাড়ির চাকা ঘুরলেই চাঁদাবাজি। পরিবহন চাঁদাবাজরা অপ্রতিরোধ্য। এদের চাঁদাবাজি কোনোক্রমেই থামছে না। গণপরিবহনের মালিক, শ্রমিক ও চালকগণ এদের বেপরোয়া আক্রোসে বিপর্যস্ত। হরেকরকম নামে এরা চাঁদাবাজি করছে।

এর মধ্যে ‘কাঙালি ও লাঠিয়াল’ অন্যতম। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলেও পরিবহন চাঁদাবাজদের কানে পানি যায়নি। ফলে পরিবহন ব্যবসায়ীর এদের বিরুদ্ধে দ্রুত শুদ্ধি অভিযান দাবি করছেন।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলছেন, রাজধানীর রাস্তাগুলোতে গাড়ি নামলেই দৈনিক চাঁদা, পুলিশের বখরা, মাস্তান ভাতাসহ মোটা অঙ্কের চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে হয়। ফলে পরিবহনের চালক-হেলপারের বেতন-ভাতা পরিশোধ হলেও মালিক পক্ষের কিছুই থাকছে না। আবার পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা, চালক, কন্ডাক্টর, হেলপারের বেতন-ভাতা ছাড়াও রুট খরচ, পার্কিং বখরা, টার্মিনাল খরচ, মাস্তান ভাতা পরিশোধ করতে হয়।

তাছাড়া নগরীর বিভিন্ন রাস্তার মোড় বা পয়েন্টে থানা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য থামানোর সাধ্য কারো নেই। চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পুলিশ ও সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে চাঁদাবাজচক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রে শুধু এখনই নয়, এরশাদ সরকারের সময়, চার দলীয় জোট সরকারের সময় এবং বর্তমান সরকারের চলতি সময়ে একই তালে চাঁদাবাজি চলছে। পরিবহনে চাঁদাবাজির ঘটনার বেশকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঘটেছে।

এই চাঁদাবাজগোষ্ঠীর কাছে পরিবহন ব্যবসায়ীরা একপ্রকার জিম্মি। পরিবহন খাতে গাড়ির মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামেই সিংহভাগ চাঁদাবাজি ঘটলেও সড়ক, মহাসড়ক, টার্মিনাল-স্ট্যান্ডে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপও প্রকাশ্যেই চাঁদবাজি করছে।

নগরীর বাস টার্মিনালগুলোতে যে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে তা অবিশ্বাস্য। দিনরাত চাঁদা আদায়ের কাজটি করে ‘লাঠি বাহিনী’, ‘যানজট বাহিনী’ ও ‘লাইন বাহিনী’। রাজধানীতেই নয়, সারা দেশে এই চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি অসহায় ২০ লাখ পরিবহন শ্রমিক নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার।

শ্রমিকরা বলছেন, চাকা ঘুরলেই যুক্ত হয় চাঁদার দাবি। টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের হওয়ার আগেই একেকটি গাড়িকে জিপি নামক চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এটি আদায় করে লাঠিবাহিনী। টার্মিনালের মুখেই যানজট বাহিনীকে দিতে হয় ২০ টাকা ‘কাঙালি চাঁদা’। এরপর লাইনম্যানের পালা। এ ক্ষেত্রে দিতে হয় ৩০ টাকা।

এর বাইরে রয়েছে টার্মিনালের টোল। শুরু হয় পরিবহন-সংশ্লিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের নামে ৫০ টাকা, মালিক সমিতি ৮০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন ৪০ টাকা, টার্মিনাল কমিটি ২০ টাকা, কলার বয় ২০ টাকা, কেরানির ভাতা ২০ টাকা, মালিক শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের নামে ৫০ টাকা। মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নানা খাতের চাঁদার ধকল।

গাবতলী থেকে যাতায়াত করা ১৫১টি রুটের কয়েক হাজার যানবাহনে প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজি হচ্ছে। মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে একই স্টাইলে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।

অভিযোগে জানা গেছে, গুলিস্তান এলাকায় পরিবহনের চাঁদাবাজদের মধ্যে জনৈক শাহাবুদ্দিন ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত রাজধানীর ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত কাঙ্গালী জাকির, ঠান্ডা, ফরমা জাকির মতিঝিল, পুরান ঢাকায় ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। এদের বিরুদ্ধে মতিঝিল, সুত্রাপুর ও রমনা থানায় বেশকটি ছিনতাইয়ের মামলা ছিলো। ২০০১ সাল থেকে কাঙ্গালী জাকির ও ঠান্ডা ডিটেনশনে ছিলো।

এরপর তারা জামিনে বের হয়ে পুনরায় পরিবহনে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় তারা নিহত হন। জনৈক শাহাবুদ্দিন স্বেচ্ছাসেবক দল করতেন। এখন তিনি সরকারি দলে ঢোকার চেষ্টা করছেন। চাঁদাবাজির টাকায় পরিবহনের মালিক হয়েছেন।

শুধু তাই নয়, বিআরসিটি বাসে যাত্রী তুলে দেয়ার নামে কমিশন আদায় করেন। উৎসব ও বন্ধন পরিবহনের কর্মচারীরা বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হলেও এখনো তাদের চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, চাঁদাবাজির বিরোধে সন্ত্রাসী কানা বাবু ও লোটন শাহাবুদ্দিনের এক হাত কেটে বিচ্ছিন্ন করেছিল। তার পরই পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার মুচিপট্টিতে কানা বাবু ও লোটনকে গুলি করে হত্যা করেছে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা।

এছাড়া রহমান নামে অপর এক সড়ক পরিবহন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। তিনি বর্তমান সময়ের আলোচিত এক পরিবহন চাঁদবাজের অন্যতম সহযোগী। তার নেতৃত্বে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।

অপর সূত্র জানায়, গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে এই পরিবহন চাঁদাবাজরা বসে থাকেন। দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাঁদাবাজির ভাগ হিসাবে প্রতিদিন ১৬ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। নুরু নামে এক ব্যক্তি এই টাকা পরিশোধ করেন। আহাদ পুলিশ বক্সের পাশে জনৈক সোহেলের বিকাশের দোকান থেকে এই টাকা পরিশোধ করা হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে। ওই সোহেলের মোবাইল ফোন চেক করা হলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবহন শমিক-মালিকদের ৯৩২টি সংগঠন রয়েছে সারা দেশে। এর মধ্যে ৬৮৬টিই অবৈধ সংগঠন। প্রতিটি সংগঠন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে শাখা-ইউনিট খুলে প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। পরিবহনের রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ১৫ হাজার পরিবহনে ২৯ ধরনের চাঁদাবাজি হচ্ছে।

এতে প্রতিদিন কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধ করতেও চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নামে, মালিক সমিতির নামে ও বিভিন্ন রুট কমিটির ব্যানারে প্রতিদিন ছয় কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

এছাড়া, পুলিশের নাম ভাঙিয়েও কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই সিন্ডিকেট মহাখালী, ফুলবাড়িয়া, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবেই পরিচিত। নগরীতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ হাজার বাস চলাচল করে।

গুলিস্তান থেকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০, সায়েদাবাদ থেকে সাড়ে ৩ হাজার, মহাখালী থেকে ২ হাজার ৬০০, ফুলবাড়িয়া থেকে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০, মিরপুর থেকে ৮০০, মতিঝিল কমলাপুর থেকে প্রায় ৬০০, আজিমপুর থেকে ৬০০, গাবতলী থেকে ৩ হাজার ৬০০ ও ভাসমান বাস আরও ১ হাজার ৫০০। এসব বাস থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।

আবার গুলিস্তান টার্মিনাল ছাড়ার আগেই গাজীপুর চৌরাস্তা রুটের প্রতিটি পরিবহনের একটি বাসের জন্য চাঁদা দিতে হয় ৪৫০ টাকা, যা ‘টার্মিনাল চাঁদা’ নামে পরিচিত। এর বাইরে সিটি কর্পোরেশনের ইজারাদার ও সিরিয়ালের জন্য দিতে হয় আরও ১০০ টাকা। সব মিলিয়ে ৫৫০ টাকা পরিশোধের পর এ রুটে একটি বাস রাস্তায় নামে।

এছাড়া টার্মিনাল থেকে বের হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত যেতে ৬টি জায়গায় আরও ৩০০ টাকা খরচ হয়। রুটসমূহে চলাচলকারী প্রতি ট্রিপে একটি বাসের মালিককে কমপক্ষে ৮৫০ টাকা গুনতে হয়। এর মধ্যে টার্মিনাল চাঁদা ৪৫০ টাকা এবং সিরিয়াল ও সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দিতে হয় ৩৩০ টাকা।আবার গাড়ি রিকুইজিশন ঠেকাতেও বাস-মিনিবাস থেকে ৫০০-৫৫০ টাকা চাঁদা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে পরিবহন ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতা ইসমাঈল হোসেন বাচ্চু জানান, এই পরিবহনব্যবস্থা হচ্ছে একটি শিল্প। এই শিল্প ক্যাসিনোর চেয়েও ভয়াবহ চাঁদাবাজি হচ্ছে। এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসাবেই শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন। তাহলেই এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব এবং এই ব্যবসা চলবে বলে জানান তিনি।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর