মাদক ব্যবহারই সমাজে অস্থিরতার কারণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারিহা হোসেন   |   ০২:২৯, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মাদক, ইয়াবাসহ নানা রকম নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নানা রকম সামাজিক অপরাধ, অপকর্ম, খুন ধর্ষণসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ূয়া যুবক যুবতীসহ ওঠতি বয়সের বিপুল সংখ্যক তরুণ তরুণী এমন কি মধ্য বয়সী নারী পুরুষের একটি অংশও জড়িয়ে পড়েছে সর্বনাশা নেশায়। ফলশ্রুতিতে পরিবারে, সমাজে, সংসারে রাষ্ট্রে এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে। একই সাথে বাড়ছে সামাজিক, পারিবারিক পর্যায়ে অস্থিরতা, অপরাধ প্রবণতা।

পাশাপাশি মাদকাসক্তির ফলে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, ব্যক্তিত্ব ও ইচ্ছাশক্তির মারাত্বক ক্ষতি হয়। একই সাথে মাদকাসক্তি একজন সম্ভাবনাময় সৃজনশীল কর্মচঞ্চল মেধাবী তরুণের তারুণ্য ও উদ্যমকে ধ্বংস করে দেয়। নেশাগ্রস্ত মানুষের কাছে ক্রমাগত নেশার চাহিদা, আসক্তি বাড়তে থাকে। চাহিদা পূরণে বাধাগ্রস্ত হলে উম্মাদ হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তি। তখন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার চাহিদা পূরণে খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, অপরহরণসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। পরিণামে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এর বিরুপ প্রভাব পড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র।

পরোক্ষভাবে পুরো জাতিকে ঠেলে দেয় এক ঘন কালো অন্ধকারের দিকে। মাদকাসক্তির পরিণামে পারিবারিক সহিংসতা, স্বামী স্ত্রীতে দ্বন্দ্ব, ছাড়াছাড়ি, কোলের শিশুকে হত্যা, নিজে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে জীবনের, সংসারের, সমাজের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করছে। বিকৃত মানসিকতার বড় নজির হচ্ছে, বিগত সময়ে গুলশানের হলি আর্টিজানে সংঘটিত স্মরণকালের ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় অংশ নেয়া বিপথগামী যুবকদের সবাই ছিলো নেশাগ্রস্ত। তারা শুধু নেশা গ্রস্তই ছিলোনা একই সাথে ধর্মের নামে তাদের সকলেরই ব্রেন ওয়াশ করে তাদেরকে একরকম অন্ধ করে ফেলা হয়েছিলো।

নানা রকম মাদক দ্রব্যেরে ব্যবহারে মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ে এবং তীব্র আসক্তি সৃষ্টি করে। মাদক দ্রব্য গ্রহণ করলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে এবং দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টির পাশাপাশি মাদক গ্রহণের পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। মূলত: মানুষ নেশার জন্য যা ব্যবহার করে তাই মাদক দ্রব্য।

সেটি হতে পারে ইনজেকশন, ধূমপান, ইয়াবা সেবন, মদ্যপান, এলকোহল, হেরোইন, কোকেন, আফিম, মারিজুয়ানা, গাঁজা, ফেন্সিডিল, বিয়ার, কেটামিন, স্পিড, বিভিন্ন রকমের ঘুমের ওষুধ থেকে শুরু করে জুতা লাগানোর অ্যাইকা প্রভৃতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ড্রাগ হলো এমন বস্তু যা গ্রহণ করলে ব্যক্তির এক বা একাধিক কার্যকলাপের পরির্তন ঘটায়। একটা ড্রাগের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে তার রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্যের উপর।

এই ড্রাগ অপব্যবহারের কারণে রোগী তার রোগের জন্য ওষুধের গুণাগুণ পাওয়ার বদলে হয়ে যায় বিষ। তাই অনেক সময় বিষ স্বল্প মাত্রায় প্রয়োগ করলে হয় ওষুধ, কিন্তু বেশি মাত্রা বা অযথা গ্রহণ করলে হয় বিষাক্ত বা শরীরকে নিস্তেজ করে, মৃত্যু ডেকে আনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অপব্যবহারের মাধ্যমে মাদকাসক্তির সূচনা হয়। সিগারেট থেকে নেশা শুরু করলেও মাদকের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে শুরু হয়। বেশির ভাগই শুরু হয় বন্ধুবান্ধবের সহচার্যে।

মূলত মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে এ জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।

ফলে মাদক সেবীরা দিনে দিনে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাদকাসক্তির বড় কারণ হলো মাদকের সহজলভ্যতা। বন্ধুদের চাপে, সহচার্যে অনেকে মাদকে আসক্ত হয়। আবার কখনো কখনো বাবা-মায়ের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকে মাদক গ্রহণ করে থাকে। অনেকের মাঝে মাদক নিয়ে স্মার্ট হওয়ার প্রবণতা থাকে যা তাকে ঠেলে দেয় মাদকের জগতে। মানসিক সমস্যা বিশেষ করে হতাশা, একাকীত্ববোধ, বিষন্নতা থেকে রেহাই পেতে মাদককে বেছে নেয়। এন্টি সোশ্যাল পারসোনালিটি, শৈশবে বিকাশে সমস্যা থাকলেও অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

প্রেম- ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা টানাপোড়েনে মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে মাদক গ্রহণ করে। পারিবারিক কলহলের কারণে অনেক সময় মাদকে আসক্ত হয়ে থাকে। মাদকাসক্তির বড় কারণও হলো মাদকের সহজলভ্যতা। প্রকৃতপক্ষে মাদকাসক্ত ব্যক্তি আসলে একটা সময়ে আর আনন্দের জন্য নেশা নিচ্ছে না। এটা তার অভ্যাসে বা নেশায় পরিণত হয় তখন এ থেকে পরিত্রাণের পথ থাকেনা। মাদকাসক্ত ব্যক্তির খাওয়ার, ক্ষুধার প্রবণতা হ্রাস পায় এবং ঘুমের সময়সীমার পরিবর্তন চলে আসলে।

ওজন হঠাৎ করে বেড়ে যায়, বা কমে যায়। চোখ লাল হয়ে থাকলে এবং চোখের মণি স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ছোট দেখায়। নাক দিয়ে প্রায়ই রক্ত পড়ে। চেহারা এবং পোশাক পরিধানে অবহেলা। শরীরে এমন কোনো ক্ষত বা কাটা ছেড়া দেখা গেলে যা সম্পর্কে তারা জানে না বা কীভাবে আঘাত পেলো তা আপনাকে বলতে না চাইলে।

তাদের মুখে বা শরীরে বা পোশাকে অদ্ভুত গন্ধ বের হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির চেহারায় কালো ছোপ ছোপ দাগ তৈরি হয়। ক্লাস বা অফিসে ঘনঘন যেতে না চাওয়া বা প্রতিষ্ঠানে কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। পরিণামে, পরীক্ষায় ফেল করা, চাকরি হারোনোর ঘটনা ঘটে। কাজে অমনযোগী হয়, ব্যক্তিগত শখ বা খেলাধুলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার সহকর্মী, শিক্ষক বা বন্ধুদের কাছ থেকে ঘনঘন নালিশ আসতে থাকলে। মাদক ব্যবসায় রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রীরা জড়ি পড়েছে। সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মসমর্পণ বা অভিযান অব্যাহত রাখার ঘটনার পরও ইয়াবাসহ অবৈধ মাদক পাচার বা এর ব্যবসার প্রত্যাশা অনুযায়ী কমেনি। এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, মাদক বিরোধী অভিযান চললেও, এখনো মাদকে আসক্ত তরুণদের এ থেকে পুরোপুরি সরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

ফলে এর ব্যবসাও বন্ধ হচ্ছে না। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছেন মাদকের ক্ষতি ও অপব্যবহার নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড আরোও বাড়ানো দরকার। শিক্ষার সকল স্তরে মাদকাসক্তি সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে ডাটা সংগ্রহ করা ও গবেষণা করার সুযোগ রাখা প্রয়োজন।

এ সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা, গণসচেতনতা সৃষ্টি, প্রচার-প্রচারণা, প্রদর্শনী, সেমিনার, আলোচনা সভা, ওয়ার্কশপ, মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রচলিত আইনে মাদক সংক্রান্ত মামলাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

দোষী সাব্যস্ত হলে এ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান জরুরি। যাতে পরবর্তীতে আর কেউ এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে, সহযোগিতা বা মদদ যোগাতে সাহস না পায়। শাস্তির বিষয়টি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে হবে এবং মাদক দ্রব্যের প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে মাদক দ্রব্যের চোরাচালান ও সরবরাহ সম্পূর্ণরুপে বন্ধ করতে হবে।

মাদক পাচার ও চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে বাংলাদেশকে যাতে ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশে চোরাচালানের সম্ভাব্য পয়েন্টগুলোতে চোরাচালান রোধের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সমাবেশ ঘটানোসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাদকের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রয়োজন প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। তবে সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র মাদকের ভয়াবহতা ও অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পাবে।

এমএআই

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর