এক দশকে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়

এনায়েত উল্লাহ   |   ১০:০৭, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

ঘূর্ণিঝড় একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দুর্যোগ, যা আবহাওয়াবিদরা কিছু সময় আগে বুঝতে পারেন। বিপর্যয় যখন, তখন এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে আগাম জানানো উচিত। গণসচেতনতা বৃদ্ধি বা সতর্কতা জারিতে বারবার দীর্ঘ, জটিল ও অর্থহীন একটি বাক্য বলার থেকে ঘূর্ণিঝড়ের একটি নামকরণ করে নিলে বিষয়টি সহজ হয়।

সাধারণ মানুষের বুঝতেও সুবিধা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের এসব নামকরণ করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার অধীনস্থ বিভিন্ন আঞ্চলিক কমিটি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এই আঞ্চলিক কমিটি তৈরি করে সমুদ্রের ওপর ভিত্তি করে।

যেমন- উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সব ঝড়ের নামকরণ করবে ডব্লিউএমও’র আটটি সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ওমান। এদের একত্রে ‘স্কেপে’ বলা হয়।

১৯৪৫ সাল থেকে গ্রীষ্মম-লীয় অঞ্চলে শুরু হয় সাইক্লোন-টাইফুন ও হারিকেন তথা ঘূর্ণিঝড়ের আনুষ্ঠানিক নামকরণ। একসময় ঝড়গুলোকে নানা নম্বর দিয়ে শনাক্ত করা হতো। কিন্তু সেসব নম্বর সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হতো। ফলে সেগুলোর পূর্বাভাস দেয়া, মানুষ বা নৌযানগুলোকে সতর্ক করাও কঠিন মনে হতো।

এ কারণে ২০০৪ সাল থেকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোয় ঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। সে সময় আটটি দেশ মিলে ৬৪টি নাম প্রস্তাব করে। সেসব ঝড়ের নামের মধ্যে এখন বুলবুল ঝড়কে বাদ দিলে আর পাঁচটি নাম বাকি রয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা আঞ্চলিক কমিটি একেকটি ঝড়ের নামকরণ করে। উদাহরণস্বরূপ ভারত মহাসাগরের ঝড়গুলোর নামকরণ করে।

একসময় ঝড়ের নাম হিসেবে নারীদের নামকে প্রাধান্য দেয়া হলেও পরবর্তীতে আবারো পুরুষের নাম সংযোজিত হতে থাকে। বর্তমানে বস্তু বা অন্য বিষয়ের নাম অবস্থাভেদে টেনে আনা হয়েছে। যেমন- সিডর, মেঘ, বায়ু, সাগর ইত্যাদি।

উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সব ঝড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দেয়া নামগুলো হলো- অনিল, অগ্নি, নিশা, গিরি, হেলেন, চপলা, অক্ষি, ফণী।

সাইক্লোন, হারিকেন ও টাইফুন শুনতে তিনটি পৃথক ঝড়ের নাম মনে হলেও আসলে এগুলো অঞ্চলভেদে ঘূর্ণিঝড়েরই ভিন্ন ভিন্ন নাম। সাধারণভাবে ঘূর্ণিঝড়কে সাইক্লোন বা ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বলা হয়। সাইক্লোন শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ কাইক্লোস থেকে, যার অর্থ বৃত্ত বা চাকা। এটা অনেক সময় সাপের বৃত্তাকার কুণ্ডলী বুঝাতেও ব্যবহৃত হয়।

১৮৪৮ সালে হেনরি পিডিংটন তার ‘সেইলর’স হর্ন বুক ফর দ্য ল অব স্টর্মস’ বইতে প্রথম সাইক্লোন শব্দটি ব্যবহার করেন। তারপর থেকেই ঘূর্ণিঝড় বোঝাতে সাইক্লোন শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। আটলান্টিক মহাসাগর এলাকা তথা আমেরিকার আশেপাশে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ১১৭ কিলোমিটারের বেশি হয়, তখন জনগণকে এর ভয়াবহতা বোঝাতে হ্যারিকেন শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

মায়া দেবতা হুরাকান- যাকে বলা হত ঝড়ের দেবতা, তার নাম থেকেই হ্যারিকেন শব্দটি এসেছে। তেমনিভাবে, প্রশান্ত মহাসাগর এলাকা তথা চীন, জাপানের আশেপাশে হ্যারিকেনের পরিবর্তে টাইফুন শব্দটি ব্যবহুত হয়, যা ধারণা করা হয় চীনা শব্দ টাই-ফেং থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রচণ্ড বাতাস। অনেকে অবশ্য মনে করেন, ফার্সি বা আরবি শব্দ তুফান থেকেও টাইফুন শব্দটি আসতে পারে।

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ ও অর্থ নিয়ে রয়েছে আগ্রহ। আসুন চলমান ও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপারে জেনে নেই।

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এই ঘূর্ণিঝড়ের নামটি দিয়েছে পাকিস্তান। তবে অনেকেই জানেন না এর নাম বুলবুল দেয়া হলো কীভাবে?

ফণী : চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভারত ও বাংলাদেশে তা-ব চালিয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ফণী। সরকার ও উপকূলীয় অঞ্চলবাসী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ায় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি করতে পারেনি ফণী। বছরের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘূর্ণিঝড় ফণীর নাম দিয়েছিল বাংলাদেশ। ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট এই ঘূর্ণিঝড়টি চলতি বছরের ৩ মে ওডিস্যায় আঘাত হানে। পরবর্তীতে দুর্বল হয়ে ৪ মে বাংলাদেশে আঘাত হানে। ফণী অর্থ সাপ বা ফণা তুলতে পারে এমন প্রাণী।

তিতলি : তিতলি নামক ঘূর্ণিঝড়টি ভারত মহাসাগর থেকে ২০১৮ সালের ৬-৯ অক্টোবর কলকাতা থেকে ৮০০ কিলোমিটার (মাইল) দক্ষিণে এর জন্ম। ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর ভারতের ওড়িস্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে। এর নামকরণ করেন পাকিস্তান। যার অর্থ প্রজাপতি।

নার্গিস : উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্টি হওয়া একটি ঘূর্ণিঝড়, যা ২০০৮ সালের ৩ মে মিয়ানমার উপকূলে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করে পাকিস্তান। ভারত মহাসাগর থেকে সৃষ্ট এ ঝড়টি। যার অর্থ ডেফোডিল নামক ফুল।

রেশমী : ২০০৮-এ উত্তর ভারত মহাসাগরীয় ঘূর্ণিঝড় অঞ্চলের সপ্তম গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড় এবং দ্বিতীয়বার ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। আবার সেই বছরে এটি ছিলো বঙ্গোপসাগরে পঞ্চম গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড়। এটি ছিলো মোটামুটি দুর্বল আকৃতির গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড়, এটি কিছুটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি সংঘটিত করেছিল বাংলাদেশ এবং ভারতে। ২০০৮ সালের ২৪ অক্টোবরে বঙ্গোপসাগরে একটি নিুচাপ সংঘটিত হয়েছিল। এর নামকরণ করে শ্রীলঙ্কা।

সিডর : সিডর ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে এবং পুরো দক্ষিণাঞ্চলকে ল-ভণ্ড করে দেয়। এর নামকরণ করে ওমান। এর জন্ম বঙ্গোপসাগরে। যার অর্থ চোখ।

আইলা : উত্তর ভারত মহাসাগরে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়। জন্ম নেয় ২১ মে। ভারতের কলকাতা থেকে ৯৫০ কিলোমিটার (৫৯০ মাইল) দক্ষিণে। ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ২৫ মে আঘাত হানে। এর নামকরণ করে মালদ্বীপ। ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট এই ঝড়টি। আইলা অর্থ ডলফিন বা শুশুক জাতীয় জলচর প্রাণী।

এমআর


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর