বদলায়নি সড়কের চিত্র

প্রিন্ট সংস্করণ   |   ০১:২৫, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

যত্রতত্র গাড়ি দাঁড়ানো, লেন না মানা, উল্টোপথে চলা— সবই চলছে আগের মতো। চালকরা মানছেন না সড়ক বিভাজন। উল্টোপথে ব্যক্তিগত গাড়ি, ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন এবং মধ্যসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী উঠানামা, ফুটওভারব্রিজ থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার, মোটরসাইকেলের দখলে ফুটপাত, রিকশার বিড়ম্বনা, সড়কে যানবাহন নৈরাজ্যে অসহায় পথচারী এবং দুর্ঘটনাসহ বাড়ছে প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ববরণের ঘটনা।

ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, আইনের কঠোর প্রয়োগ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে রাজধানীতে চলতি বছরের শুরুতে ট্রাফিক পক্ষ পরিচালনা করে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। গত কয়েকদিন সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছে আমার সংবাদ, উঠে এসেছে পূর্বের রূপ।

দিন শেষে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেটের ব্যবহার দেখা গেলেও বদলায়নি সড়কের চিত্র। সরেজমিন পরিদর্শন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও ট্রাফিক পুলিশ কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নুর মোহাম্মদ মিঠু

মাসে লক্ষাধিক প্রসিকিউশন আইন প্রয়োগের নিদর্শন: মফিজ উদ্দিন আহমেদ (অতি. পুলিশ কমিশনার-ট্রাফিক)

রাজধানীর সড়কগুলোতে গাড়ি পার্কিং থেকে শুরু করে চলমান অবস্থায় লেন না মানা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে থাকা, উল্টোপথে যান চলাচল, ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল, সড়কে রিকশার বিড়ম্বনা— সব মিলিয়ে সড়কে নেই ট্রাফিক শৃঙ্খলা, শৃঙ্খলা ফেরাতে বলার মতো নেই কোনো কার্যক্রমও।

ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কী উদ্যোগ রয়েছে এমন প্রশ্নে মফিজ উদ্দিন বলেন, ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট সার্বিক বিষয়েই আমরা গতানুগতিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বিষয়গুলোকে ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখবো। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ট্রাফিক পক্ষ পরিচালনা করা হলেও বছর শেষে সড়ক ফিরেছে তার পূর্বের রূপে, যেখানে পুরো ট্রাফিক শৃঙ্খলা কায়েমে অবনতি দেখা যাচ্ছে।

এমনটা জানালে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রয়োজন হলে আরেকবার সপ্তাহ বা পনের দিনব্যাপী ট্রাফিক সিস্টেমে উন্নতির জন্য বিভিন্ন বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবো। ট্রাফিক আইনের যে কঠোর প্রয়োগের কথা বলা হচ্ছে বিভিন্নমহল থেকে, তা হচ্ছে না।

কেন হচ্ছে না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ট্রাফিক সিস্টেমে আইনের প্রয়োগ হচ্ছেই। আমাদের প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার প্রসিকিউশন হচ্ছে, মাসে প্রসিকিউশন হয় প্রায় লক্ষাধিক। পুরনো দিনগুলোর এসব প্রসিকিউশনই হচ্ছে ট্রাফিক ব্যবস্থায় আইনের কঠোর প্রয়োগের নিদর্শন।

এত উন্নয়নের মধ্যেও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে: অধ্যাপক ড. শামসুল হক (সাবেক পরিচালক অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এআরআই, বুয়েট)

অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগেই বিরাট দুর্বলতা রয়েছে। পরিকল্পনাতেও রয়েছে গলদ। যদি এতো গলদ থাকে তাহলে কখনোই ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না। গণপরিবহনে এখনো রয়ে গেছে বিশৃঙ্খলা, সড়কেও বিশৃঙ্খলা রয়েছে। এসব আইনের শাসন দিয়ে ঠিক করা সম্ভব নয়। যদি আইনের শাসন দিয়ে ঠিক করতে চায় তাহলে পুলিশ তো এতদিনে কম উদ্যোগ নেয়নি, পরিবহন মালিক সমিতির নেতারাও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন সড়কে আর অনিয়ম হবে না। আমরাও অনেকে বড় বড় কথা বলি, কিন্তু সমাধান তো হচ্ছে না। সিস্টেমের মধ্যেই যখন গলদ থাকে, তখন প্রত্যেকটা ধাপেই সমস্যার সৃষ্টি হবে। যেখানে সিস্টেম কিংবা পরিকল্পনাতেই গলদ সেখানে আইনের শাসন দিয়ে এসব অনিয়ম বন্ধ করা যায় না। তাও আবার অনেক সময় আইন প্রয়োগেও থাকে গলদ। এছাড়া রুট পারমিট সিস্টেমে গলদ, ফিটনেসেও গলদ। দক্ষ চালকের আমাদের দেশে বড়ই অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি মোড়ে সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মোড়ে যদি জটিলতা সৃষ্টি না হয় তাহলে রাস্তায় অনেকটা প্রভাব পড়বে, তখন যানজট কিংবা চালক বা যাত্রীদের ভোগান্তি হবে না। ফলে গতির প্রতিযোগিতাও কমে আসবে। এসব দেখার দায়িত্বে যারা রয়েছেন তাদের আগে দায়িত্ব পালনে সততা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক সিস্টেমের কারণে সড়কে চাপ যত বাড়ছে আমাদের সংশ্লিষ্টদের দৈন্যতাও তত বাড়ছে। পুলিশ হাজার হাজার মামলা দিচ্ছে, কার্যত সমাধান তো হচ্ছে না। মোট কথা- যত দাওয়াই-ই দেয়া হচ্ছে তাও ভুল দেয়া হচ্ছে। রিকশার সমন্বয় করতে হবে রাজধানীর সড়কে। সেনানিবাসে যেমন সমন্বয় করা হয়েছে ঠিক তেমনটাই করতে হবে। এটাকেই বলে ম্যানেজমেন্ট। হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগ করেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে যেখানেই হাত দেবে সংস্কার করতে যাবে সেখানে ব্যর্থতা আসবে। যেমন ট্রাফিক সিগন্যালে সবাই জানে, লালে থামে, সবুজে চলে, তাও কার্যকর হচ্ছে না। যদি হয় তাহলে পথচারী স্বাভাবিকভাবে সড়ক পারাপার হতে পারে। দুর্ঘটনাও কমে আসবে। এসব বিষয়ে সত্যিই সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ। এ একটা জায়গায় সরকারেরও ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। সরকারের এত উন্নয়নের মধ্যে এ একটা জায়গাতেই হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগ করেও ব্যর্থ হতে হচ্ছে। সরকারকেও এ জায়গায় ভালোভাবে নজর দিতে হবে। এ সেক্টরের দৈন্যতা দূর করতে সরকারকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।

ট্রাফিক শিক্ষার অভাবেই ট্রাফিক সপ্তাহের পদক্ষেপ :মীর রেজাউল আলম (সাবেক, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার-ট্রাফিক)

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শুধু আইন প্রয়োগ করে বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না— বিশেষজ্ঞদের এমন মতের বিষয়ে মীর রেজাউল আলম বলেন, এটা আসলে একটা অভ্যাস। ট্রাফিক শিক্ষাটা যদি মানুষের রক্তে প্রবেশ করে, তাহলেই এটা সহজ হয়ে যায়। অন্যথায় আমরা যেমন ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করছি, একটু শক্ত হচ্ছি, সবাই একটু নিয়মের মধ্যে আসছে। আবার একটা সময় তারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। এক্ষেত্রে আসলে মানুষের মধ্যে ট্রাফিক শিক্ষা এখনো রক্তে মিশে যায়নি। এজন্য আমাদের চ্যালেঞ্জ অনেকটাই বেশি। তবু আমরা চেষ্টা করে যাই। আমরা দেখি শুধু এনফোর্সমেন্টটা। এছাড়া ট্রাফিক শিক্ষা বলেন বা ইঞ্জিনিয়ারিং বলেন যে সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে, তাতে আরও একাধিক সংস্থা জড়িত আছে। আমরা যেমন এনফোর্সমেন্টে দিনরাত কাজ করে যাই পাশাপাশি বাকি সংস্থাগুলোরও সক্রিয় সহযোগিতা থাকলে এটাকে ধরে রাখা যাবে। কিন্তু এই শহরের জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এটা ধরে রাখা অনেকটা কঠিন কাজ। বহির্বিশ্বে একদিনের কিংবা এক সপ্তাহ ধরে এবং পক্ষকালব্যাপী ট্রাফিক সপ্তাহের আয়োজন হয় না, সারা বছর ধরেই চলে।

কিন্তু আমাদের দেশে এটা হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রাফিক সপ্তাহের মাধ্যমে আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করি। যেহেতু আমাদের লোকজনের মধ্যে ট্রাফিক শিক্ষা এখনো ওইভাবে কাজ করে না কিন্তু বহির্বিশ্বের তারা করে। কারণ, তাদের জনসংখ্যা কম এবং তাদের মধ্যে ওই সচেতনতা রয়েছে। কিন্তু আমার দেশে তো ট্রাফিক শিক্ষা ওইভাবে নাই। যে কারণে আমাদের এ পদক্ষেপটা নিতেই হয়। আমরা এটা আবার করবো এবং এর মধ্য দিয়ে আরও একটা ঝাঁকুনি দেয়ার চিন্তাভাবনাও আমাদের রয়েছে।

পুলিশ সপ্তাহ অর্থহীন, সারা বছরই করতে হবে: নজরুল ইসলাম (নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিদ)

নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান, ঢাকা মহানগর পরিবহনের কৌশলগত পরিকল্পনা একবার করা হয়েছিল ২০০৬ সালে। পরে সেটা আবার রিভাইস করেছে জাইকা। যেটা অনুমোদিত বা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেখানে সবকিছু বিস্তারিত পর্যালোচনা এবং সুপারিশ দেয়া আছে। পথচারীদের জন্য কী ব্যবস্থা, গণপরিবহনের কী ব্যবস্থা এবং কী ধরনের পরিবহন সড়ক ব্যবস্থা থাকে বা গণপরিবহন ব্যবস্থা  থাকে এ ধরনের অনেক সুপারিশ আছে। গণপরিবহনের জন্য যেখানে বাস, সেখানে শুধুই বাস। ছোট-মাঝারি-বড়, ওখানে এগুলোও থাকার সুযোগ আছে। হয়তো ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তন করে ফেলবে। শত শত কোম্পানির বদলে নির্দিষ্ট চারটা-পাঁচটা কোম্পানি হবে। গণপরিবহনের বড় সুপারিশ হলো মেট্রোরেল হবে, বাস র্যাপিড ট্রানজিট হবে, কমিউটার ট্রেন হবে, ওয়াটার ওয়ে হবে, রিং রোড হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। গণপরিবহনের একটা ব্যবস্থাপত্র এবং পথচারীদের জন্য আরেকটা ব্যবস্থাপত্র। মোট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, এগুলো বিস্তারিত দেয়া আছে। আর যেটা পুলিশ সপ্তাহ বা পক্ষকালীন- এটা অর্থহীন। কোনো দেশেই এরকম করে না, যা সপ্তাহে একদিন বা সপ্তাহ ধরে চলে। এটা সারা বছরের কাজ। এটা একদিনের, এক সপ্তাহের কিংবা এক পক্ষকালের কাজ নয়, এটা সারা বছরের মানে ৩৬৫ দিনই চলবে।

ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে বলেন, তারা জানে কি করতে হবে- রোড সিস্টেম ঠিক করতে হবে, পরিবহন গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে, সিগন্যালিং ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। মোট কথা, এখন তারা যেটা করে এক সপ্তাহ কিংবা পক্ষকাল ধরে- এটা সারা বছর করতে হবে। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে ট্রাফিক আইন প্রণয়ন কিংবা ট্রাফিক ব্যবস্থার সমন্বয় রয়েছে কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমন্বয় নেই। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসি) একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ। এরা রাস্তাঘাট, পরিবহনসহ সব পরিকল্পনা করার দায়িতপ্রাপ্ত্ব, রাজউক- তারা রাস্তাঘাটের প্ল্যানিং করে, মেট্রোপলিটন পুলিশ- তারা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করে। সিটি কর্পোরেশনও কিছু করে। এদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সমন্বয় যারা করে তারাই বলছে সমন্বয়ের অভাব আছে। সুতরাং আমরা ধরে নিতেই পারি সমন্বয়ের অভাব আছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর