আদি বুড়িগঙ্গায় উচ্ছেদে টানাপড়েন

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম   |   ০১:৪৬, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলের দুই পাড় দখল করে শতশত অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন দখলদাররা। আর এসব স্থাপনা উচ্ছেদেও চলছে টানাপড়েন। কারণ বুড়িগঙ্গা চ্যানেল জেলা প্রশাসনের আওতায় থাকায় অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেনি।

এতে জেলা প্রশাসকের দাবি, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব পালন করছে। অথচ সিটি কর্পোরেশনের কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রমই সেখানে নেই। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই তিন সংস্থার টানাপড়েন ও তদারকির অভাবে ভরাট হয়েছে।

জানা গেছে, পুরান ঢাকা আর কামরাঙ্গীরচরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে একসময় পণ্যবাহী বড় ট্রলার-নৌকা চলতো। দল বেঁধে মাছ ধরতেন জেলেরা। কামরাঙ্গীরচরের মানুষের রাজধানীতে আসা-যাওয়ার প্রধান যান ছিলো নৌকা। স্থানীয় লোকজনের স্মৃতিতে এভাবে ধরা পড়ে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল। তবে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল ভরাট-দখলের কারণে পুরান ঢাকা আর কামরাঙ্গীরচর প্রায় মিলে গেছে। নৌকার বদলে মানুষ আদি চ্যানেল পাড়ি দিচ্ছেন হেঁটে।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, আদি চ্যানেল দখলে এক ধরনের উৎসব চলছে। মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টানিয়েছেন অনেকে। অনেক জায়গা দখল করেছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই বাকি জায়গা বিলীন হয়ে যাবে। সরেজমিন দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেলের অধিকাংশ জায়গা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। আদি চ্যানেলের এই অংশে পানি নেই, তবে ডিএসসিসি সেখানে পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য আবাসন সংকট দূর করতে চ্যানেল ভরাট করছে।

এছাড়া আছে অসংখ্য অবৈধ দোকানপাট-বসতঘর। তলদেশে ঘাস জন্মেছে। হেঁটে আদি চ্যানেল পারাপার হচ্ছেন অনেকে। এর মধ্যে লোহার সেতু, রসূলপুর, কালুনগর এলাকায় আবর্জনা স্তূপ হয়ে আছে। এর মধ্যে পশ্চিম রসূলপুর-কালুনগরে এই চ্যানেল ছোট খালে রূপ নিয়েছে। চ্যানেলের ওপর লোহার সেতুর কয়েকশ মিটার পূর্ব-দক্ষিণে মূল বুড়িগঙ্গা নদী।

পূর্ব রসূলপুরের বাসিন্দা মাহমুদ আলী বলেন, ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও এই আদি চ্যানেলে বড় বড় নৌকা চলতো। তারও এক যুগ আগে এই শাখা নদীতে গোসল করতেন মহল্লার লোকজন। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, নদীর দুপাশে দখলের পরিমাণ তত বাড়ছে। যে যেভাবে পারছে নদী ভরাট করে ভোগদখল করছে।
বর্তমানে হাজারীবাগের সিকদার মেডিকেল কলেজ, কামরাঙ্গীর চরে পান্না গ্রুপের ভলভো ব্যাটারির কারখানা, ম্যাটাডোর ব্রাশ ফ্যাক্টরি, ডিপিডিসির বিদ্যুৎ সাবস্টেশনসহ অসংখ্য শিল্প-কারখানা ও বহুতল ভবন এই আদি চ্যানেলের জমিতে গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করে স্থানীয়রা। নদীর দুই পাড়ে নেই কোনো সীমানা প্রচীর। নদীর সীমা চিহ্নিত জন্য একাধিক জরিপ করা হলেও নদীর উদ্ধারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ঢাকা জেলা প্রশাসক। কমিটি আর উপকমিটির বেড়াজালে আটকা পড়ে যায় এই চ্যানেলের উদ্ধার প্রক্রিয়া।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটি উদ্ধারে কাজ করছে ডিএসসিসি ও বিআইডব্লিউটিএ। কিছুদিন আগে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু কিছু অংশ উচ্ছেদ করার পর তা আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেন যে তারা এই অভিযান বন্ধ করেছে আমরা তা বলতে পারবো না। তবে চ্যানেলটি উদ্ধার করে এ দুই পাড়ের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তারা এই বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন।

বুড়িগঙ্গা চ্যানেল উদ্ধারে ২০১৪ সালের ২৫ মে তৎকালীন নৌমন্ত্রী ও নদী উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের সভাপতি শাজাহান খানের নেতৃত্বে একাধিক মন্ত্রী, টাস্কফোর্সের সদস্যরা সরেজমিন বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলটি পরিদর্শন করেন। চ্যানেলটির দূরবস্থা দেখে নৌমন্ত্রী পরের দিনই সচিবালয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন। ওই বৈঠকে আদি চ্যানেল উদ্ধারে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পরে আর সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। কমিটি আর উপকমিটির বেড়াজালে আটকা পড়ে যায় এই চ্যানেলের উদ্ধার প্রক্রিয়া। তখন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়। এর প্রায় এক মাস পর লালবাগ সার্কেলের সহকারী ভূমি কমিশনারকে আহ্বায়ক করে আরও একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। তবে গত পাঁচ বছরেও কোনো কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের কিছুটা পশ্চিমে চাঁদনীঘাট এলাকায় দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার উত্তর দিকের শাখাটি আদি চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। আর দক্ষিণের শাখাটি এখনকার মূল বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার এ দুই ধারার মাঝখানে কামরাঙ্গীর চর, নবাবগঞ্জ চরসহ কয়েকটি এলাকার অবস্থান। কামরাঙ্গীর চর এলাকার কিছু অংশ ছাড়া এই চ্যানেলের পুরোটাই এখন ভরাট হয়ে গেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাড়িঘর, বহুতল দালান ইত্যাদি। অথচ দুই দশক আগেও এ চ্যানেলটি হাজারীবাগ, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুরের পাশ দিয়ে আবারো বুড়িগঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো।

সরেজমিন জানা যায়, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে নতুন করে দখলের আয়োজন শুরু করেছে দখলদার চক্র। আইন অমান্য করে তারা দখলের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলের দুই তীরে দখলযজ্ঞে মেতে উঠেছে চক্রটি। এখন ওই আদি চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কোম্পানির নামে সাইনবোর্ড ঝুলতে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আবদুল মতিন বলেন, আমরা বারবার স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের অবহেলা দেখছি। বুড়িগঙ্গাসহ সব নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করতে হলে সরকারের সঠিক পদক্ষেপ, কঠোর আইন ও বাস্তবায়নই কেবল পারে নদী বাঁচাতে। বুড়িগঙ্গা ও এর আদি চ্যানেল বাঁচাতে হলে সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। কারণ এখানে শুধু অবৈধ স্থাপনা রয়েছে তা নয়। নদী গতিপথ পরিবর্তন করায় অনেকের বৈধ জমিও এখন নদীর সীমানা হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী নদীর জায়গায় স্থাপনা করা যায় না। তাই অনেক বৈধ মালিকের স্থাপনা উচ্ছেদেরও প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া নদী তীরের প্রাচীন স্থাপনা সংস্কার করে সংরক্ষণ করা, নদীতে পানির প্রবাহ বাড়াতে খনন করা ও তীরের সৌন্দর্য সৃষ্টি করা জরুরি। এ সব কাজের জন্য সদিচ্ছা ও দৃঢ়তা দুটোই প্রয়োজন বলে মস্তব্য করেন তিনি

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটি ঢাকা জেলা প্রশাসকের আন্ডারে। এই চ্যানেলের মুখে কিছু অংশ আমরা উচ্ছেদ করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে তা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। সেহেতু আমরা মূল বুড়িগঙ্গা নদী দুই তীর রক্ষা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। সেহেতু আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলেটি উদ্ধারে আর কাজ করা হয়নি। যদি চ্যানেলটি বিআইডব্লিউটিএর আওতায় দেয়া হয়। তাহলে চ্যানেলটি উদ্ধারে কার্যক্রম নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, প্রাচীনকালে গঙ্গা নদীর একটি প্রবাহ ধলেশ্বরী নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত। এই ধারাটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে একসময় গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বুড়িগঙ্গা নামে অভিহিত হয়। ১৮৯৭ সালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে ঢাকার উজানের নদ-নদীগুলো মধুপুর জঙ্গলের উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে সরে যায়। সেই সময় অথবা মতভেদে তারও আগে ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের ফলে সলমাসি, কলাতিয়া, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ এলাকা দিয়ে প্রবাহমান বুড়িগঙ্গা কিছুটা দক্ষিণে সরে যায়। তখন তলদেশের গঠনগত পরিবর্তন হওয়ায় নদীতে পলি পড়ার গতিও বেড়ে যায়।

ফলে মাঝখানে জেগে উঠতে থাকে চর, যার একটি অংশ পরবর্তী সময়ে কামরাঙ্গীরচর ও আরেকটি অংশ নবাবগঞ্জ চর হিসেবে পরিচিত হয়। এসব চরের ভেতর দিয়ে কয়েকটি খাল ও জলাভূমি থাকার প্রমাণ দেখা যায় উনিশ শতকের শুরুর দিকে প্রণীত সিএস ম্যাপে। এই পানি প্রবাহমান হচ্ছে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল নামে পরিচিত।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর