‘নির্লজ্জ ফারজানা তোর জ্বালায় বাঁচি না’

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |   ০২:০৪, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ক্লাস নেই, পরীক্ষা নেই। অফিস-আদালত নেই, কাজকর্ম কিছুই নেই। আছে শুধু অখণ্ড অবসর! পুরো দেশের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীর জন্য দিনটি এমন হলেও অবসর মিলছে না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা! ঘুম, নাওয়া-খাওয়া সব কিছুই যেন ভুলে গেছেন। দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে শুধু উচ্চারিত হচ্ছে প্রতিবাদী স্লোগান।

স্লোগানগুলো কখনো কণ্ঠ ছেড়ে উঠে আসছে— পোস্টারে, গ্রাফিতিতে, চিত্রাঙ্কনে। তারা বলছে, ‘নির্লজ্জ ফারজানা তোর জ্বালায় বাঁচি না’, ‘দুর্নীতিবাজের আস্তানা, জ্বালিয়ে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘ভিসি তোমায় জানিয়ে দিলাম, ওয়ালাইকুম আসসালাম’, ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’, ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘আওয়ার ক্যাম্পাস আওয়ার রাইট, সেভ দ্য ক্যাম্পাস জয়েন দ্য ফাইট’।

দুর্নীতির অভিযোগে জাবি ভিসির পদত্যাগ দাবিতে গত কয়েকদিনে ঠিক এভাবেই প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মিছিলে, কনসার্টে, স্লোগানে একটি দাবির কথায় জানাচ্ছেন তারা। অব্যাহত আন্দোলনের ধারবাহিকতায় গতকাল শুক্রবারও একই দাবিতে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তার আগে দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। এরপর পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী চিত্রাঙ্কন শুরু করেন।

তাদের আঁকা একটি চিত্রাঙ্কনের পাশে লেখেন, ‘নির্লজ্জ ফারজানা তোর জ্বালায় বাঁচি না’। চিত্রাঙ্কন শেষে মিছিল নিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে প্রদর্শন করেন তারা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, চিত্রের মাধ্যমে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করেছেন। চিত্রের মাধ্যমে উপাচার্যের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ছাত্রলীগ দ্বারা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাসহ সকল অনিয়ম তুলে ধরছেন তারা। একই সাথে উপাচার্যের অপসারণ চাইছেন।

আন্দোলকারীরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত জমা দেয়া হবে।

এর আগে গত মঙ্গলবার উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে তার বাসভবনের সামনে অবস্থানরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। চিত্রের মাধ্যমে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করছেন আন্দোলনকারীরা এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ ৩৫ থেকে ৪০ জন জন আহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া গত বুধবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ সকল ধরণের মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে উপাচার্য অপসারণের এক দফা দাবি নিয়ে এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

উপাচার্য অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক অধ্যাপক রায়হান রাইন। তিনি বলেন, ‘হামলা-মামলা ও হুমকিতে অগ্রাহ্য করে নৈতিকস্খলন ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত উপাচার্যকে অপসারণ এবং দুর্নীতিতে জড়িত সকলের রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন চলবে।’

উল্লেখ্য, ‘উন্নয়নের নামে বৃক্ষ নিধন’ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে গত আগস্ট মাসে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ছাত্রলীগকে উপাচার্য দুই কোটি টাকা ‘ঈদ সালামি’ দিয়েছেন এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তার পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। গত সপ্তাহ থেকে আন্দোলনকারীরা তার অপসারণ দাবিতে শুরু করেন ধর্মঘট।

পরে সোমবার তারা উপাচার্যের বাসভবন অবরোধ করেন। লাগাতার এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার নেতৃত্বে শুরু হওয়া একটি মিছিল উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় আট শিক্ষক, চার সাংবাদিক ও কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীসহ ৩৫-৪০ জন আহত হন।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর