আমার সংবাদকে কৃষক লীগ সভাপতি-সম্পাদক

তৃণমূল পর্যন্ত ঢেলে সাজানোর প্রত্যয় সমীর-স্মৃতির

প্রিন্ট সংস্করণ   |   ০২:১৬, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

দীর্ঘ সাত বছর পর গত ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে কৃষক লীগের জাতীয় সম্মেলন। ওই সম্মেলনের মধ্যদিয়ে সমীর চন্দ চন্দ্র সভাপতি ও অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতিকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে সংগঠনের দায়িত্ব পেয়েই কাজ শুরু করেছেন নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। সংগঠনের নানা পরিকল্পনা নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রফিকুল ইসলাম

কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করতে প্রস্তুত: সমীর চন্দ চন্দ্র
বাংলাদেশ কৃষক লীগের সভাপতি সমীর চন্দ চন্দ্র বলেছেন, বাংলাদেশের কৃষক শ্রেণির মানুষ প্রায় সবাই গ্রাম-গঞ্জে বাস করে। ফলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের পাশে কেউ থাকে না। কিন্তু এখন থেকে ওইসব কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক লীগের সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। গতকাল তার নিজ কার্যালয়ে আমার সংবাদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কৃষকের সব সমস্যায় তাদের পাশে দাঁড়ানোই কৃষকলীগের মূল নীতি। শুধু তাই নয়, কৃষকের সুখ-দুঃখ ও সুবিধা-অসুবিধা সরকারের নীতিনির্ধারণীপর্যায়ে পৌঁছে দেয়া কৃষকলীগের দায়িত্ব। সেজন্য প্রয়োজন গ্রাম ও ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি। কিন্তু গ্রাম ও ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠন করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। মূলত যেসব মানুষ কৃষিকাজের সাথে সরাসরি জড়িত তাদের ধারণা, কোনো সংগঠনে সময় দেয়ার চেয়ে একবেলা কাজে সময় দিলে উৎপাদন বেশি হবে। ফলে কৃষকলীগ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি কৃষকের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করার জন্য আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা সঠিকভাবে পালন ও বাস্তবায়ন করায় আমি প্রস্তুত। সামনের সব বাঁধা পেরিয়ে গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে সংগঠনকে ঢেলে সাজানো হবে। এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করা হবে। সেজন্য ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সমীর চন্দ চন্দ্র বলেন, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন দেশ পরিচালনার নামে বাংলার কৃষকদের শোষণ করেছে। কেউ কৃষকের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করেনি। সেজন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন দেশের কৃষকের অধিকার আদায় ও তাদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কৃষকলীগ গঠন করেছিলেন। বাংলার কৃষির উন্নয়নে আজ যেসব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর কোনো কোনোটা বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আবার কোনো কোনোটা সংস্কার করে আধুনিকায়ন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফলেই আজ বাংলাদেশের কৃষি একটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

কৃষকলীগের এই নেতা বলেন, সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় কৃষকলীগ কৃষির উন্নয়নের জন্য ব্যাপক ভূমিকা রাখে। কিন্তু ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলার প্রতিটি কৃষকের জীবনে আমানিশা নেমে আসে। এরপর যারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে তারা পাকিস্তানের মতোই দেশ শাসন করেছে। নির্মমভাবে নির্যাতন করেছে দেশের কৃষক শ্রেণির মানুষকে। অনেক কৃষককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই ওইসব অবহেলিত ও নির্যাতিত কৃষকের জন্য কাজ শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশের কৃষিতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তার নেতৃত্বেই আজ কৃষিতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন দৃশ্যমান।

কৃষকলীগ শুধু কৃষকরাই করবে— এ ধারণা ঠিক নয় জানিয়ে সমীর বলেন, কৃষকরাই শুধু কৃষকলীগ করবে সেই ধারণা ঠিক নয়। তারাই কৃষকলীগের রাজনীতি করতে পারবে, যারা দেশের কৃষক নিয়ে ভাবেন, কৃষক নিয়ে বিশ্লেষণ করেন, কৃষকের সুখ-দুঃখ বোঝেন। তিনি বলেন, যারা কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত কৃষির সাথে যুক্ত থাকেন তারাই কৃষকের ব্যথাটা বোঝেন। এবার ওইসব নেতাকে কৃষকলীগে মূল্যয়ন করা হবে।

বিশ্বজুড়ে কৃষকলীগের কমিটি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সে বিষয়ে আপনার কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না— জানতে চাইলে কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমি আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখেছি ও শুনেছি দেশের বাইরে কৃষকলীগের কমিটি রয়েছে। কিন্তু ২০১২ সালে গঠিত কমিটির কোনো আলোচনায় দেশের বাইরে কমিটি দেয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি, অনুমোদনও দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, দেশের বাইরে কৃষকলীগের কমিটির দেয়ার বিধান আছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে কমিটি করা যেতে পারে।

কৃষকলীগের কমিটি ঘোষণার পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতো অল্প সময়ের মধ্য কমিটি গঠন বিতর্কমুক্ত রাখা সম্ভব কি না— জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি বলেন, ছাত্রলীগের রাজনীতি ছাড়ার পর আমি কৃষকলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছি। দীর্ঘদিন এই সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকায় সব নেতাকর্মী সম্পর্কে আমি সব জানি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিতর্কমুক্ত কমিটি উপহার দেবেন। তিনি বলেন, সৎ, দক্ষ, ত্যাগী, মেধাবী, পরিশ্রমী এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। সেজন্য আমরা সভাপতি-সম্পাদক ঐক্যবদ্ধ আছি।

কৃষি উন্নয়নে নারীর গুরুত্ব অনেক: উম্মে কুলসুম স্মৃতি
কৃষিতে নারীদের ভূমিকা অপরিসীম উল্লেখ করে বাংলাদেশ কৃষক লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি বলেছেন, বাংলাদেশের কৃষিতে নারীদের গুরুত্ব অনেক বেশি। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ করা পর্যন্ত পুরুষের পাশাপাশি নারীদের প্রয়োজনীতা অপরিসীম। তাই কৃষির সাথে সম্পৃক্ত তৃণমূলপর্যায়েও নারীদেরকে কৃষকলীগের রাজনীতিতে যুক্ত করা হবে। এবং কৃষক ও কৃষানির সমন্বয়ে কৃষি খাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। গতকাল কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমার সংবাদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রীর দেয়া দায়িত্ব পালনের জন্য আপনি কতটুকু প্রস্তুত আছেন জানতে চাইলে স্মৃতি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আমি কৃষকলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত আছি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের কারণে দেশের কৃষি ও কৃষক সম্পর্কে আমার সব ধারণা আছে। বিশেষ করে কৃষি উন্নয়নের জন্য কী করতে হবে। কৃষকের কল্যাণের জন্য কী করণীয়— সবগুলোই আমার জানা। তাই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা সঠিকভাবে পালনরে জন্য আমি সবসময় প্রস্তুত আছি।

কৃষকলীগের এই নেত্রী বলেন, ৭৫ পববর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কৃষিকে নির্মমভাবে আঘাত করেছেন। নির্বিচারে হত্যা করেছেন সাধারণ কৃষকদের। কিন্তু বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আশার পর দেশের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এবং সেই সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের কৃষি খাতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এই ধারাবাহিকতা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণার সাথে সাথে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে অল্পসময়ে কমিটি গঠন আপনার জন্য কতটুকু চ্যালেঞ্জ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতো অল্প সময়ের মধ্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। তবে কোনো চ্যালেঞ্জ আমাদের কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। তিনি বলেন, কৃষকলীগের কর্মী থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল পদে দায়িত্ব পালন করেছি। কাজেই সব নেতাকর্মীদের সম্পর্কে আমার সুনির্দিষ্ট ধারণা রয়েছে। ত্যাগী, পরিশ্রমী ও বিতর্কিত মুক্ত নেতাদের সমন্বর বেঁধে দেয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।

কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কৃষকলীগকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে স্মৃতি বলেন, গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলাসহ সকল স্থানে কৃষকলীগকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হবে। এবং ওইসব স্থানে স্বচ্ছ, পরিশ্রমী, দৃনীতিমুক্ত ও কৃষকবান্ধব নেতৃত্ব তুলে আনা হবে। এবং বঙ্গবন্ধু দেশের কৃষি নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আপনারা দেখেছেন বিভিন্ন সময় কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যেমূল্যর দাবিতে নানাভাবে প্রতিবাদ করেছেন। তাই আগামীতে দেশের কৃষক যেন এসব সমস্যার সম্মুখিন না হয়, সে বিষয়গুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সমন্বয় করতে কৃষকলীগের সকলপর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাজ করবেন।

দশম জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উঠে আসে কৃষকলীগের পদবাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ। এই বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি বলেন, দেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষার জন্য কৃষকলীগের নেতাকর্মীরা রাজনীতি করে। কমিটি দিয়ে পদবাণিজ্য করার জন্য। যা বা যারা পদবাণিজ্যর অভিযোগ করে। তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারবে না। কারণ কৃষকলীগের কোনো নেতার বিরুদ্ধে এ অভিযোগে নেই।

কৃষকলীগের দায়িত্ব দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাকে এমন একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব দিয়েছেন যে সংগঠনটি বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে গঠন করেছেন। নেত্রী যে কারণে আমাকে দায়িত্ব দিয়ে তা পালন করা আমার দায়িত্ব।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর