স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন কাল

এক মঞ্চে ছয় নেতার ভাগ্য নির্ধারণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম   |   ০৭:৫৬, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

কৃষক ও শ্রমিক লীগের মতোই দীর্ঘ সাত বছর পর কাল অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলন। অনুষ্ঠেয় ওই সম্মেলনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘদিন পর নতুন নেতৃত্ব পাবে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

এদিকে গত ১১-১২ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও ঘোষণা হয়নি নতুন সভাপতি-সম্পাদকের নাম। তাই আগামীকাল সংগঠনের জাতীয় সম্মেলনের মধ্যদিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতি-সম্পাদকসহ মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের চার নেতার ভাগ্য নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন। সেই সম্মেলনের অংশ হিসেবে জেলা, মহানগর, উপজেলাসহ চারটি সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মূলত এসব সম্মেলনের মধ্যদিয়ে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, বিতর্কিত, জামায়াত-বিএনপিসহ ভিন্নপন্থি নেতাদের দল থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করবেন তিনি। সেজন্য দায়িত্বশীল নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। নেত্রীর কঠোর নির্দেশনা ও বেঁধে দেয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্য কৃষক ও শ্রমিক লীগের সম্মেলন শেষ করেছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। সেই ধারাবাহিকতায় আগামীকাল ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলন। সেজন্য সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারা।

এদিকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের মতোই মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন সংগঠনের শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা। তাদের পদচারণায় মুখর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়। দীর্ঘ সাত বছর পর অনুষ্ঠিত হবে সংগঠনটির সম্মেলন। তাই শেষ মুহূর্তেও দায়িত্বশীল পদে থাকতে নানামুখি তৎপরতা চালাচ্ছেন সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নেতারা। কেউ কেউ ধরনা দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলটির দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে।

তবে শেষ মুহূর্তেও শীর্ষপদে আসতে আলোচনায় রয়েছেন একঝাঁক ক্লিন ইমেজের নেতা। কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন সংগঠনটির ডজন খানেক নেতা। এদের মধ্য থেকেই শীর্ষ দুই পদের নেতা নির্বাচিত হতে পারে। এরা হলেন— বর্তমান সহ-সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ, সহ-সভাপতি মতিউর রহমান মতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মেসবাউল হোসেন সাচ্চু, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আলীম বেপারী, সুব্রত পুরুকায়স্থ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের দপ্তর সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ টুটুল।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন আব্দুল আলীম বেপারী। সংগঠনটির সারা দেশের নেতাকর্মীদের মধ্যে দলের জন্য নিবেদিত, পরিশ্রমী, ত্যাগী ও শেখ হাসিনার আদর্শের ভ্যানগার্ড আব্দুল আলীম বেশ পরিচিত। ২০০১ সাল পরবর্তী বিএনপি-জামায়াতের সময়ে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক এবং ঢাবি বৈধ ছাত্রনেতা হিসেবে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওইসময় বেশ কয়েকবার নির্যাতনের শিকার হন সাবেক এ ছাত্রনেতা।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নির্বাচনি এলাকা নড়াইল-১ ও ২ আসনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত টিমের প্রধান ছিলেন আব্দুল আলীম। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলায় আহত হন তিনি। নিজে আহত হয়েও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যার কারণে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তার সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন। ২০০৭ সালে এক-এগারো সেনাশাসিত সরকারের সময়ে রাজপথে শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। গাজী মেসবাউল হক সাচ্চু ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১/১১ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে ছিলেন সরব। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুলাই ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের যাত্রা শুরু হয়। তবে পদপ্রত্যাশী ওই নেতারা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শেষ ভরসা হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে দীর্ঘ এক যুগ পর গত ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন। দীর্ঘদিন পর সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেনি আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। মূলত আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলন। ওই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সভাপতি-সম্পাদকের সাথে মহানগর উত্তর-দক্ষিণ শাখার সভাপতি-সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়ে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তাই সম্মেলন শেষ হলেও এখনো পদপ্রত্যাশীদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়নি। কে পাচ্ছেন নতুন দায়িত্ব? তা জানতে আরও একদিন অপেক্ষা করতে হবে পদপত্যাশীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের।

এর আগে ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন। দীর্ঘ একযুগ একক নেতৃত্ব থাকায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন সংগঠনের ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাদের দলীয় কার্যক্রম। যা নিয়ে অনেকটাই ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এসব বিতর্ক থেকে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মুক্ত করতে চায় ক্ষমতাসীন দলটি। তাই আগামীকাল অনুষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনের এক মঞ্চে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার মধ্যদিয়ে সব বিতর্ক মুক্ত করা হবে।

সংগঠনের জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষপর্যায়ে এনেছে প্রস্তুতি কমিটি। গঠিত ১৩টি উপ-কমিটির সদস্যরা প্রতিনিয়ত বৈঠক করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে এনেছেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের মূল আয়োজন করা হচ্ছে। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার কারণে মঞ্চ ও গোটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে নানা ধরনের ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মঞ্চ ও সাজ-সজ্জা কমিটি। নৌকার আদলে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন মূল মঞ্চ। ওই মঞ্চে প্রধান অতিথিসহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া বর্ণিল সাজে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও আশপাশে সাজানো হবে। মনিটরের মাধ্যমে আগত সব কাউন্সিলর এবং ডেলিগেটদের দেখানো হবে।

মঞ্চ ও সাজ-সজ্জা কমিটির সদস্য সচিব ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আলীম বেপারী বলেন, নৌকার আদলে দৃষ্টিনন্দন মূল মঞ্চ প্রস্তুত। মঞ্চে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেলসহ উন্নয়ন প্রকল্প তুলে ধরা হবে। গোটা সম্মেলন স্থলে বিশ্বজয়ী নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে যাওয়া উন্নয়নের বাংলাদেশ তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সবসময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করি। দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ করেছি। এখন বিশ্বজয়ী নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে নাছিম ভাইয়ের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক লীগ করি। ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছি। দুঃসময়ে সামনের সারিতে থেকেই লড়াই করেছি। আশা করি, নেত্রী মূল্যায়ন করবেন সে বিশ্বাস আমার আছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সম্মেলন আয়োজনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক নির্মল রঞ্জন গুহ জানান, কেন্দ্রীয় সম্মেলন সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সারাদেশ থেকে আসা ১৯৭৫ জন কাউন্সিলর এবং ১৮ হাজার ডেলিগেট অংশ নেবে। আগত অতিথি থাকবেন প্রায় ১৫ হাজার, সবমিলিয়ে ৩৫ হাজার নেতাকর্মীর অংশগ্রহণ থাকবে বলে জানান তিনি।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের দপ্তর সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ টুটুল আমার সংবাদকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বেচ্ছাসেবক লীগের একটি বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব উপহার দেয়ার জন্য যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা সব কাজ সম্পন্ন করেছি। জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সাথে আমি যুক্ত আছি। নেত্রী চাইলে এই সংগঠনের দায়িত্ব দিলে তা পালন করার জন্য আমি প্রস্তুত আছি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনে নেত্রী বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা মতেই কমিটি গঠন করা হবে। সংগঠনের জন্য নিবেদিত, ত্যাগী, মেধাবী এবং পরীক্ষিতরাই নেতৃত্বে আসবেন। বিতর্কিতদের কমিটিতে রাখা হবে না।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর