দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের আশঙ্কা

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |   ০৮:০৪, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

দেশের শীর্ষ দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বুয়েটে ৩৮ দিন এবং উপাচার্য অপসারণের দাবিতে জাবিতে গত এক সপ্তাহ ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ সেশনজটের আশঙ্কা করছেন বিশ্ববিদ্যালয় দুটির শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠান দুটির অচলাবস্থা কাটিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সচলের দিকে গুরুত্ব দিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর হত্যার বিচারসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৩৮ দিন ধরে বুয়েটে অচলাবস্থা চলছে। আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চার্জশিটে অভিযুক্তদের স্থায়ী বহিষ্কার, বিভিন্ন হলে র্যাগের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি প্রদান এবং ছাত্ররাজনীতি ও র্যাগের জন্য সুস্পষ্ট শাস্তির বিধান রেখে অর্ডিন্যান্স জারি— এই তিনটি দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, বুয়েটের টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার বিষয়ে গত ২ নভেম্বর বুয়েটের উপাচার্য, ডিএসউব্লিউ ও ডিনদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনটি দাবি জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি দাবি বাস্তবায়ন হলে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণে সম্মত এবং তৃতীয় দাবি বাস্তবায়ন করা হলে টার্ম ফাইনাল পরীক্ষায় বসার শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন তারা। গত ২ নভেম্বরের আলোচনায় বুয়েট প্রশাসন পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি দাবি বাস্তবায়ন করার আশ্বাস দেয়। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেও দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ না দেখায় হতাশা ব্যক্ত করেন শিক্ষার্থীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে বলেও দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।

তারা বলছেন, শিক্ষা কার্যক্রম সচলের বিষয়ে প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, শিগগিরই এই অচলাবস্থা কেটে যাবে। শিক্ষার্থীরাও ক্লাসে ফিরবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বুয়েটে দীর্ঘ সেশনজটে পড়বে বলেও মনে করে তারা। বুয়েটের ডিএসডব্লিউ অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আবরার হত্যার বিচার ইতোমধ্যে পুলিশ চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে। আমাদের কাছে তার একটি কপি দেয়া হবে। সেটি পেলে বুয়েটের গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া হবে। তার ভিত্তিতে যারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাদের স্থায়ীভাবে বুয়েট থেকে বহিষ্কার করা হবে।

অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, বুয়েট প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের একটি দাবি পূরণ অসম্পন্ন ছিলো। আমরা আশা করছি, অপরাধীদের স্থায়ী বহিষ্কার করা হলে সে দাবি বাস্তবায়ন হবে, শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা ফিরবেন। এ বিষয়ে বুয়েট উপাচার্য ও আমাদের (শিক্ষকদের) সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আমরা আশা করি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আবারো বুয়েট ক্যাম্পাস সচল হবে। শিক্ষার্থীদের প্রধান কাজ ক্লাস-পরীক্ষায় মনোনিবেশ করবেন।

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে গত ৫ নভেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ এ আন্দোলন শুরু হয়েছে প্রায় আড়াই মাস আগে। খোঁজ নিয়ে যায় ‘উন্নয়নের নামে বৃক্ষ নিধন’ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে গত আগস্ট মাসে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। পরে ছাত্রলীগকে উপাচার্য দুই কোটি টাকা ‘ঈদ সালামি’ দিয়েছেন এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর তার পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। এরপর চলতি মাসের শুরু থেকে আন্দোলনকারীরা তার অপসারণ দাবিতে শুরু করেন ধর্মঘট। পরে গত ৫ নভেম্বর তারা উপাচার্যের বাসভবন অবরোধ করেন। লাগাতার এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ৬ নভেম্বর ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার নেতৃত্বে শুরু হওয়া একটি মিছিল উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় আট শিক্ষক, চার সাংবাদিক ও কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীসহ ৩৫-৪০ জন আহত হন। এ ঘটনায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ক্যাম্পাস বন্ধের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষে করেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে কবে ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হবে তা নিশ্চিত নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা বলছেন, উপাচার্য ফারজানা ইসলাম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। তার উচিত পদত্যাগ করা। তিনি যতদিন পদত্যাগ করবেন না, ততদিন আন্দোলন চলবে।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, এ অবস্থা না কাটলে জাহাঙ্গীরনগর সেশনজটের ক্যাম্পাসে পরিণত হবে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হওয়া দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

চলমান আন্দোলনের সংহতি সমাবেশে অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখন খুবই দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, হল বন্ধ, ক্লাস বন্ধ, অনেকগুলো পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিলো সেগুলোও বন্ধ। শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরকম একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো এর জন্য কে দায়ী? আমরা সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সবাই জানি এর জন্য দায়ী বর্তমান উপচার্য।

উল্লেখ্য, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জেরে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে গত ৬ অক্টোবর রাতে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এরপর রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের নিচতলা ও দোতলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে আবরারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। এ ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদি হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় গত বুধবার ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এ চার্জশিট মহানগর হাকিম আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর