সাড়ে ছয় লাখ পরীক্ষার্থীর ভাগ্য অনিশ্চিত

তদন্ত প্রতিবেদন ঝুলছে মন্ত্রণালয়ে
প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম   |   ১১:৩৯, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন তৃতীয় শ্রেণির সমাজকর্মী (ইউনিয়ন) পদের পরীক্ষায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা স্থগিত করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। পরবর্তীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রতিষ্ঠান ও প্রতিবন্ধিতা) মোহাম্মদ ইসমাইলকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির দেড়মাস হলেও বিন্দুমাত্র অগ্রগতি হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষক ও চেয়ারম্যান সীতেশ চন্দ্র বাছার, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নুরুল কবির (নিয়োগ কমিটির সভাপতি) এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাফায়েত হোসেন তালুকদার (নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব)। এই তিনজনের যোগসাজশে অনিয়মের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। তবে পরীক্ষা স্থগিত করায় অনিয়ম বন্ধ হয়েছে। এছাড়া যাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে তিনি এই তিন কর্মকর্তাকে ছাড়া দেবেন। তদন্ত কমিটির প্রধানের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে প্রতিবেদক কথা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের সত্যতা পেয়েছেন।

তদন্তের অগ্রগতি সামনের দিকে অগ্রসর না হলেও এ ব্যাপারে অভিযুক্ত তিনজনের পক্ষে সাফাই গাইলেন ইসমাইল। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মাসি অনুষদের ডিন এস এম আবদুর রহমান পরীক্ষায় অনিয়ম হতে পারে তা আশঙ্কা করেছেন। সত্যিকার অর্থে আশঙ্কার কিছু ছিলো না। কারণ, ইচ্ছা করলেই কোনো কর্মকর্তা অপটিক্যাল মার্ক রিডার (ওএমআর) রিডিংয়ের সময় নম্বর টেম্পারিং করে নির্দিষ্টসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে পাস নম্বর দেয়ার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে সঠিক তদন্ত করতে গেলে ডিনের ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইচ্ছা নেই, একজন শিক্ষক অপমানিত হোন। এরপরও যতটুকু ছাড় দিয়ে সম্ভব প্রতিবেদন দেয়া হবে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষা কবে নাগাত শুরু হবে, সেটি বলতে পারবো না। কারণ বর্তমানে এই পরীক্ষা সরকার নেবে।

মোহাম্মদ ইসমাইল আরও বলেন, ডিন এস এম আবদুর রহমান পরীক্ষার কোনো দায়িত্বে ছিলেন না। তিনি আমার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন। আমি নাকি তাকে হাইকোর্টের বারান্দায় উঠাতে চেয়েছিলাম। যা সম্পন্ন মিথ্যা অভিযোগ। তবে ডিনের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ডিনের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হোন বলে জানান তদন্ত কমিটির প্রধান।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ৯ জুলাই হাউস প্যারেন্টস কাম টিচার, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, ফিল্ড সুপারভাইজার, সমাজকর্মী (ইউনিয়ন), অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুদ্রাক্ষরিক, গাড়িচালক ও অফিস সহায়ক পদে বিজ্ঞপ্তি দেয় সমাজসেবা অধিদপ্তর। এর মধ্যে সমাজকর্মী বাদে বাকি পদগুলোতে নিয়োগে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডিপার্টমেন্ট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)। আর গত সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ৪৬৩টি সমাজকর্মী পদে লিখিত পরীক্ষা নেয়ার জন্য ফার্মাসি বিভাগের চেয়ারম্যান সীতেশ চন্দ্র বাছারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় সমাজসেবা অধিদপ্তর। পরে তিনিই প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো।

সূত্র জানায়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন তৃতীয় শ্রেণির সমাজকর্মী (ইউনিয়ন) পদের পরীক্ষা স্থগিতে বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন দুজন কর্মকর্তা ও একজন শিক্ষক। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি কোনো ব্যবস্থা নেবে বলে মনে হয় না। কারণ তদন্ত কমিটির প্রধান যখন তদন্ত ছাড়াই বলে দেন- অভিযোগ ভিত্তিহীন, ওএমআর কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। তখন এই তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এটিই স্বাভাবিক।

জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী বাইরের এ ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি অনুষদের একাডেমিক সভায় উত্থাপন করার কথা। কিন্তু ফার্মাসি বিভাগের একমাত্র শিক্ষক ও চেয়ারম্যান সীতেশ চন্দ্র বাছার এককভাবে এই পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানান ফার্মাসি অনুষদের ডিন এস এম আবদুর রহমান। তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের পরীক্ষা আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চিঠি দেন। তিনি এটাও জানান, দুর্বল ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে তার দায় ফার্মাসি অনুষদ নেবে না।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, এই নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁস, মেধাতালিকায় পছন্দের প্রার্থীদের নাম রাখা ও চাকরি নিশ্চিত করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল একটি চক্র। এর সঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ছাপা, সারা দেশে কেন্দ্র, শিক্ষক নির্ধারণসহ সব প্রস্তুতি নেয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠায় স্থগিত হয়ে যায়।

গত ২২ সেপ্টেম্বর সমাজকল্যাণমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়ে এস এম আবদুর রহমান বলেন, এই পরীক্ষার সঙ্গে তার অনুষদ কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না। এর দুই দিন পর ২৪ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা স্থগিত করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। অথচ এর আগেই ওএমআর শিট তৈরি ও প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়। পরে তা ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতেও পাঠানো হয়েছিল। ঢাকা ছাড়া সাতটি বিভাগীয় শহরে এই পরীক্ষা নেয়ার জন্য তিন কোটি ৮৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, পরে তা স্থগিত রাখা হয়েছে।

ডিন এস এম আবদুর রহমান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা নিতে হলে আগে অনুষদের একাডেমিক সভায় জানাতে হয়। সবার সম্মতি থাকলে একটি পরিচালনা কমিটি করার বিধান রয়েছে। অথচ এই নিয়োগে তার কিছুই করা হয়নি। কে, কবে এবং কীভাবে এই নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার কিছুই তিনি জানতেন না। অথচ এই পরীক্ষায় ছয় লাখ ৬২ হাজার ২৭০ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। তাদের অনেকেই পরীক্ষার আগে চাকরির জন্য ফার্মাসি অনুষদে যোগাযোগ করেছেন। এর মধ্যে পরীক্ষার পর ওএমআর রিডিংয়ের সময় নম্বর টেম্পারিং করে নির্দিষ্টসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে পাস নম্বর দেয়াসহ নানা রকম দুর্নীতির বিষয়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বিষয়টি তিনি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানান।

তবে ফার্মাসি অনুষদের চেয়ারম্যান সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, ফার্মাসি অনুষদের অধীনে আরও তিনটি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেই এই পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাদের প্রত্যেকের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে তিনি বিষয়টি একাডেমিক সভায় উপস্থাপন করেননি। মূলত এ কারণে এমন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জুয়েনা আজিজ আমার সংবাদকে বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির সমাজকর্মী (ইউনিয়ন) পদের পরীক্ষা স্থগিতের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন না। এটি তার দায়িত্বের মধ্যে নেই বলে জানান। পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনা ঘটতে পারে এ ব্যাপারে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজি মোহাম্মদ নুরুল কবিরের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএআই


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর