অস্থিরতায় প্রাথমিক শিক্ষা খাত

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |   ০১:১৩, নভেম্বর ১৬, ২০১৯
ফাইল ছবি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবি এবং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ইস্যুতে দেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা রীতিমতো অস্থির হয়ে উঠেছে। বিষয় দুটি নিয়ে বছরজুড়ে থেমে থেমে আন্দোলন করছেন শিক্ষকরা। সরকারের পক্ষ থেকে এসব সমস্যা নিরসনের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিলেও শেষ পর্যন্ত তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষায় মনোযোগী না হয়ে আন্দোলনের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এতে দিন দিন অস্থিরতা বেড়েই চলেছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য রয়েছে দাবি করে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছেন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা। পৃথকভাবে তারা নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রধান শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে বেতন দিতে সম্মত হয়। কিন্তু শিক্ষকরা তা মানতে নারাজ।

তারা বলছেন, প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে এবং সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন দিতে হবে। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি একটাই। তারা চাইছেন আগামী মুজিব বর্ষের পূর্বে তাদের জাতীয়করণের আওতায় আনা হোক। এ জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন।

জানা যায়, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের দাবিতে ২০১৮ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে টানা ১৮ দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলন করা হয়। একপর্যায়ে ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তালিকা বহির্ভূত প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের তালিকা চাওয়া হয়। তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী সঠিক তথ্য না দেয়ায় ওই বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়ে যায়।

পরে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের দাবিতে একই বছর ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে। পুলিশ ওই কর্মসূচিতে বাধা দেয়। পাঁচজন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১৬ জুন থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলকারী শিক্ষকরা। ওইসময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর এপিএসের আশ্বাসে আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. মামুনুর রশিদ খোকন আমার সংবাদকে বলেন, ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু সে সময় চার হাজার ১৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে রেজিঃ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৪টি, অস্থায়ী রেজিঃ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৮৬টি, নন রেজিঃ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিন হাজার ৩৩২টি ও মাদার স্কুলের নামে সমাপনী ৫০৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগামী মুজিব বর্ষের পূর্বে আমরা এসব বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের আওতায় আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি।

জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে উন্নীতকরণের প্রস্তাব দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের সংগঠন ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোট’।তাদের দাবি, ওই প্রস্তাব বাদ দিয়ে সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে নির্ধারণ করতে হবে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্র্যাব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন শিক্ষক নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোটের সভাপতি শাহীনুর আকতারের সভাপতিত্বে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের দাবিতে দীর্ঘ পাঁচ বছর বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোট বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডে বেতন উন্নীতকরণের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় প্রেরণ করেন; যা সহকারী শিক্ষকদের কাম্য নয়।তিনি আরও বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৮ সেপ্টেম্বর ১২তম গ্রেডে উন্নীতকরণের সুযোগ নেই মর্মে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ৭ নভেম্বর ১৩তম গ্রেডে বেতন উন্নীতকরণে সম্মতি প্রদান করে।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোটের সভাপতি শাহীনুর আকতার জানান, ১৩তম গ্রেডে সকল শিক্ষকদের বেতন কমে যাবে এমনকী ১২তম গ্রেডেও সহকারী শিক্ষকদের একটি টাকাও বাড়বে না। তাছাড়া প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডের রায় কার্যকর হলে ১১তম এবং ১০ম গ্রেডে টাকার অংকে বৈষম্য হবে সাড়ে তিন হাজার টাকা। তিনি বলেন, গ্রেডে বৈষম্য দূর হলেও টাকার অংকে এই বৈষম্য থেকেই যাবে। সুতরাং বেতনবৈষম্য নিরসনে ১১তম গ্রেডের কোনো বিকল্প নেই। সহকারী শিক্ষকদের দাবি অগ্রাহ্য করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে ১৩তম গ্রেডের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল; সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন উন্নীতকরণের প্রস্তাব পুনরায় প্রেরণের জন্য দাবি জানাচ্ছি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ১৩তম গ্রেড মানি না। ১৩তম গ্রেডে বেতন উন্নীত করা সহকারী শিক্ষকদের সাথে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই না। মহাজোট ১১তম গ্রেডে বেতন উন্নীতকরণের দাবিতে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্তৃপক্ষকে যে সময় বেঁধে দিয়েছে তার মধ্যে দাবি আদায় না হলে পরবর্তীতে কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে।

এর আগে প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন দাবি করে আসন্ন সমাপনী পরীক্ষা বর্জন করার ঘোষণা দেয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্য একটি সংগঠন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হবে এমন আশ্বাস পেয়ে এ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে তারা।

বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন বলেছেন, প্রাথমিকের সহকারী ও প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড উন্নীতের মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে আইনগত মতামত নিয়ে। তিনি বলেন, এখন প্রধান শিক্ষকদের দুটি স্কেল বলবৎ আছে ১১ ও ১২তম গ্রেড। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা ১১তম ও প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রধান শিক্ষকরা ১২তম গ্রেডে বেতন পেয়ে থাকেন। ওইটাকে এক করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণবিহীন— এটা আর থাকবে না। সহকারী শিক্ষকদেরও দুটো স্কেল ১৪ ও ১৫তম। প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণবিহীন- এটাকেও এক করে ১৩তম গ্রেড করা হয়েছে। তবে এটি মানা না মানা হচ্ছে পরের বিষয়।

এদিকে, চলমান এই অস্থিরতার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, শিক্ষকরা ক্রমাগত আন্দোলন করছেন। ফলে অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছেন না। যার কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

আনোয়ার হোসেন নামের একজন অভিভাবক বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও তা বেশি কাজে লাগছে না। প্রাথমিকপর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

আফরিন জাহান নামের একজন অভিভাবক বলেন, শিক্ষকদের বেতন নিয়ে সমস্যা চলছে তা দীর্ঘদিনের। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে আন্তরিক হওয়া উচিত। আলী আজগর নামের একজন অভিভাবক বলেন, জাতীয়করণের দাবিতে কিছু বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। সরকার হয় তাদের জাতীয়করণ করুক অথবা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিক। সরকার অনুমোদন দিয়েছে বলেই তারা প্রতিষ্ঠান গড়েছে। এখানে যেসব শিক্ষার্থী রয়েছে তাদের কথা চিন্তা করে হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সরকারকে ভাবা উচিত।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে মোট ৬৩ হাজার ৬০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন তিন লাখ ২২ হাজার ৭৬৬ জন শিক্ষক। আর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে দুই কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৩৮ জন।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর