পর্দার আড়ালেও খালেদার মুক্তি!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |   ১২:৩৮, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না— বিএনপির এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার সামনে মুক্তির জন্য তিনটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, প্যারোল উল্লেখ করে আবেদন। দ্বিতীয়ত, সরকারি নির্বাহী আদেশ এবং তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তবে খালেদা জিয়া আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জামিন ছাড়া অন্য কিছুতে রাজি নন। হঠাৎ করে আবারো খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গ নিয়ে ঘরে-বাইরে আলোচনা শুরু হলে তার জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে আবারো প্রশ্ন চলে আসে। আসলে তিনি কোন প্রক্রিয়ায় জামিন পেতে পারেন?

খালেদা জিয়ার পরিবার সূত্রের দাবি, সরকারের কাছে মাথানত করে তিনি কোনো শর্তে জামিন নেবেন না। তবে দলের বড় একটি অংশ খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় জীবনাশঙ্কা থেকে যে কোনোভাবেই মুক্তিতে রাজি হয়েছেন। তারেক ও খালেদা জিয়ার পরামর্শে এখনো আদালতের উপর আস্থা রাখতে চাচ্ছে দলটি।

তবে দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্য, খালেদা জিয়ার মুক্তিতে এবার সরকারকে কঠিনভাবে নাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত আসছে দল থেকে। রাজনৈতিক কঠিন পদক্ষেপে যাওয়ার আগে পর্দার আড়ালে ক্ষমতাসীন দলকে বার্তা দিয়েছে বিএনপি। হরতাল-অবরোধের মতো দেশ অচলের কর্মসূচিতে যাওয়ার আগেই সরকারের নির্বাহী আদেশে হলেও যেন মুক্তি পান খালেদা জিয়া। সরকারের কাছে বিএনপির হাইকমান্ড এমনই আবেদন-আবদার করেছে।

দলটির নীতি নীতিনির্ধারণী সূত্রের ভাষ্য, দেশের চলমান অস্থিশীলতা, পেঁয়াজ কাণ্ডসহ, নানান চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ না করায় সাধারণ জনতা কিছুটা সরকারের উপর ক্ষিপ্ত। এছাড়া দলের ভেতরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কারণে স্বয়ং নিজ দলের ভেতরেও দ্বন্দ্ব চলছে। এমন পরিস্থিতি দেশকে শান্ত রাখতে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে সরকার নরম হবে। প্যারোল নিয়ে দ্বিমত থাকলেও শেষ সময়ে এসে সরকারের নির্বাহী আদেশ কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে মুক্তি পেলে এতে বিএনপিতেও দ্বিমত থাকছে না। দল-জোটের সবাই প্যারোল ব্যতীত অন্য দুই প্রক্রিয়ায় মুক্তিতে একমত।

ধারণা করা হচ্ছে, উপরের নির্দেশে রাজনৈতিকভাবেই হবে অসুস্থ খালেদা জিয়ার মুক্তি। আর তা হতে পারে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আগেই। এ নিয়ে বিএনপিসহ জোট শরিক দলগুলো তৎপর হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ায় ঐক্যফ্রন্টের উপর বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের বছর পার হলেও বন্দি খালেদা জিয়াকে দেখতে যাননি ড. কামাল হোসেন। এবার এরও অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে আজ বা আগামীকাল সময় চেয়ে আইজি প্রিজনের কাছে চিঠি দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। চিঠিতে দেখা করতে ইচ্ছুক পাঁচ ঐক্যফ্রন্ট নেতার নামও দেয়া হয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের দপ্তর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু আমার সংবাদকে বলেন, আইজি প্রিজন্স বরাবর একটি চিঠি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এআইজি প্রিজন্স সুরাইয়া আক্তারের কাছে দেয়া হয়েছে। আমরা কি সোমবার নাকি মঙ্গলবার দেখা করতে পারবো তা জানা যাবে (সোমবার) ১১টার আগেই। আমি কাল সকালে জেল সুপারের কাছে যাবো এরপর নিশ্চিত হবো। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন হয়তো আজ সম্ভব হবে না। তবে আগামীকাল আমাদের ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সাক্ষাৎ হবে তা চূড়ান্তভাবে ধারণা করছি। প্রথম পর্বে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া ও জেএসডি সহ-সভাপতি তানিয়া রব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া আমার সংবাদকে মুঠোফোনে বলেন, আমাদের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন খুবই অসুস্থ। তাই তিনি যেতে পারছেন না। আমাদের আবেদন করা হয়েছে আগামিকাল (আজ) বা পরের দিন সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছি। আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে, যখনই সময় পাই; আমরা তখনি যাবো।

যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার নানাভাবে— বলছে খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন, আবার আমরা তার অসুস্থতার কথাও শুনি। আসলে কোনটা সত্য আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে যাবো। নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে কথা বা কিছু জানতে চাওয়া হবে কি-না, জানতে চাইলে রেজা কিবরিয়া বলেন, দেখেন আমরা অসুস্থ একজন মানুষকে দেখতে যাবো। সেখানে কোনো অ্যাজেন্ডা বা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ থাকবে না। আমরা শুধু তার শারীরিক খোঁজখবর নেবো।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে গত শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে আবেদন করা হচ্ছে। আদালত তার স্বাস্থ্যগত কারণে অন্তত বেগম জিয়াকে জামিন দেবেন, আদালতের কাছে আমরা সুবিচার আশা করি। এরপর গতকাল আবেদনের প্রেক্ষিতে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি আগামী ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে হবে বলে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার করা আপিলের শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান এই দিন ধার্য করেন।

এদিন আদালতে খালেদার পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং দুদকের পক্ষে অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান শুনানি করেন। এসসময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সিরকার, অ্যাভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ফজলুর রহমান, এজে মোহাম্মদ আলী, মীর নাসির, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বদরুদ্দোজা বাদল ও ব্যারিস্টার এ কে এম এহসানুর রহমানসহ প্রমুখ।

বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক এবং খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, আমরা আশা করছি এবার খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন।

এ বিষয়ে বিএনপির জিএম সিরাজ বলেন, খালেদা জিয়া রাজনৈতিক বন্দি। তার জামিনের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া তার মুক্তি হবে না। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কাছে সবিনয়ে অনুরোধ— খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। খালেদা জিয়াকে জামিনের ব্যবস্থা করে দিন।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর