পেঁয়াজের সংঘবদ্ধ চক্র দেশজুড়ে

প্রিন্ট সংস্করণ॥শাহ আলম খান   |   ১২:৫৩, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজির বিষয়টি এখন শুধু কথার কথা নয়, দায়িত্বশীল মহলের কর্তাব্যক্তিরাও তা ফুঁ দিয়েও উড়াতে পারছেন না। ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর অজুহাতে হঠাৎ পণ্যটির দাম ১০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় উঠে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা না পেয়ে ভোক্তা-সাধারণের মতো তারাও এ সত্যটি উপলব্ধি করছেন। পেঁয়াজে কোনো একটা গোলমালের আঁচ পেয়েছেন তারা।ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। রিটে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আরজিতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদি করা হয়েছে। এছাড়া এর প্রতিক্রিয়া লেগেছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। তারা এ ইস্যুতে সরকারের ব্যর্থতা দাবি করে সিন্ডিকেট চক্রের হোতাদের চিহ্নিত ও আইনের আওতায় আনার দাবিতে দেশব্যাপী প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে পেঁয়াজ নিয়ে দেশজুড়ে নানা অপতৎপরতার তথ্য মিলেছে আমার সংবাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে। গত কয়েক মাস ধরেই দেশে পণ্যটির অস্থিরতা চলে আসছিল। তবে বড় সংকটের শুরু অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে। ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পরপরই এর উৎপত্তি। এ খবরেই সক্রিয় হয়ে উঠে সারা দেশে পেঁয়াজ কারসাজির কুশীলবরা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভোগ্যপণ্যের সর্ববৃহৎ মার্কেট চট্টগ্রামের চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ আমদানিকারক, আড়তদার ও পাইকাররাই মূলত পণ্যটির লাগামহীন দাম বাড়ানোর পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। এদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে ঢাকার শ্যামবাজার, হিলি, ভোমরা, সোনামসজিদ, ফরিদপুর, পাবনাসহ দেশের কৃষিপণ্যের বড় আড়তদার ও প্রচলিত আমদানিকারকরা। এরা যার যার অবস্থানে থেকে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। গুদামে মজুদ থাকলেও বাজারে পেঁয়াজ সরবরাহ করেছে কম। আবার যে দামে কেনা হয়েছে বাজারে ছাড়া হয়েছে তার দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে। মূল্যবৃদ্ধির রথ যখন ঊর্ধ্বাকাশ থেকে নামতেই চাইছে না, তখন দামের এই উত্তাপে নতুন করে ঘি ঢেলেছে বড় লটে পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দেয়া বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।

পেঁয়াজ আমদানি করে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সরকারি উদ্যোগে সহায়তা দেয়ার কথা ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের। এজন্য এস আলম, মেঘনা, সিটি গ্রুপসহ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মিসর, চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক ও উজবেকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ৪১টি অনুমতিপত্র দেয়া হয়। যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৬৬ হাজার ১৬২ টন পেঁয়াজ দেশে আনার কথা। কিন্তু অনুমতিপত্র মেলার মাসাধিক পার হয়ে গেলেও ওইসব পেঁয়াজ আসেনি দেশে। গতকাল পর্যন্ত মাত্র সাড়ে সাত হাজার টন পেঁয়াজ দেশে এসেছে। যা ১৭ কোটি ভোক্তার মাত্র একদিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ঘোষণা দিয়েও সময়মতো পেঁয়াজ আনতে গড়িমসির রহস্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে হাজার প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ টন। দেশে উৎপাদনের পর ১০ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। অন্যদিকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় লটে পেঁয়াজ আমদানির খবর পেয়ে দাম হারানোর ভয়ে সারাবছর যারা পেঁয়াজের আমদানি করে থাকেন, তারাও নতুন করে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা কমিয়ে দিয়েছেন।

এভাবে বড় লটে পেঁয়াজ আমদানির চালান দ্রুত না আসা এবং নিয়মিত আমদানিকারকরা এ খবরে নিষ্ক্রিয় থাকাসহ সুযোগ-সন্ধানী অন্য ব্যবসায়ীরা গুদামে মজুদ পেঁয়াজ বাজারে ছাড়া কমিয়ে দেয়ায় দেশে পেঁয়াজ নিয়ে এই লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। যার প্রভাবে দুদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা থেকে লাফিয়ে ২৫০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এভাবে আমদানি, মজুদ ও বাজারজাতের বিভিন্নস্তরে দেশজুড়ে ব্যবসায়ীদের বহুমাত্রিক কারসাজিতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ে নেয়া হয়েছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দেশি পেঁয়াজের কেজি ১৪০ টাকায় উঠেছিল। সেটাই ছিল এযাবৎকালের সর্বোচ্চ দর।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারের হাত অনেক লম্বা। কারসাজি করে কেউ পার পাবে না। পেঁয়াজের এই অযৌক্তিক দামের পেছনে কী কাজ করেছে কিংবা স্পর্শকাতর এই পণ্যটিকে ব্যবহার করে সুবিধাভোগী কোনো গোষ্ঠী নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে যারা অযৌক্তিক দাম হাঁকিয়েছে বিভিন্ন অভিযানে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ স্থানীয় প্রশাসন খাতুনগঞ্জসহ সারা দেশে পণ্যটির আমদানিকারক, পাইকার ও আড়তদারদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। কিন্তু ওইসব বৈঠক থেকে কোনো সুরাহা আসেনি। উল্টো বৈঠকের পরপরই দেশজুড়ে পণ্যটির দামে আরও অস্থিরতা চলতে থাকে। উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত সরকার মেঘনা, সিটি, এস আলম গ্রুপসহ আরও বড় কয়েকটি কর্পোরেট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চায়।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক হওয়ার পর এসব শিল্প গ্রুপকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য বলা হয়। এতে তারা সম্মতিও দেয়। পাশাপাশি সরকারও তাদের পেঁয়াজ আমদানির পথ সহজ করতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ অগ্রাধিকার এলসি ও ঋণ সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজে আসেনি। শেষ দফায় বড় শিল্প গ্রুপগুলোও পেঁয়াজ আমদানিতে গড়িমসি দেখানোর কারণে সরকারের ভরসার জায়গাটি নড়বড় করে দেয়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আমদানিকারক, পাইকার ও আড়তদারের মতো এসব শিল্পগ্রুপও সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে। তারা অপেক্ষায় থেকেছে যাতে পেঁয়াজের দাম আরও বাড়ে। যাতে তাদের আমদানি করা পেঁয়াজ বর্তমান বাজারদরের চেয়ে আরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারে। এজন্যই তারা পেঁয়াজ আমদানিতে গড়িমসি ভাব দেখিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত দেড় মাসে চীন, মিসরসহ বিকল্প বাজার থেকে ৬৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির এলসি খোলা হলেও দেশে পেঁয়াজ এসেছে মাত্র সাত হাজার টন। প্রায় ঢাকঢোল পিটিয়ে ৫৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দেয় শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। এ লক্ষ্যে তারা ১১টি আমদানি অনুমতিপত্র নিয়েছে।

অথচ এসবের বিপরীতে কোনো পেঁয়াজ এখনো বন্দরে এসে পৌঁছায়নি। এখন পর্যন্ত মিসর থেকে তিন হাজার ৩০৬ টন, চীন থেকে ৮৭৬ টন, মিয়ানমার থেকে এক হাজার ২২৮ টন, তুরস্ক থেকে ৮৬ টন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১১২ টন এবং পাকিস্তান থেকে ১৩৯ টন পেঁয়াজ বন্দরে এসেছে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি হয়েছে এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে কারা করেছে এই কারসাজি সেটিও সরকার ও আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর অজানা নয়।

তিনি বলেন, সাধারণ ভোক্তার কারসাজির সুযোগ নেই। তারা বড়জোর এক কেজির জায়গায় পাঁচ কেজি কিনে রাখতে পারে। তাহলে পণ্যটির বিষয়ে তাদেরই ইন্টারেস্ট আছে, যাদের এর সঙ্গে অতিমুনাফা ভোগের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা আছে। সেখানে নিয়মিত বড় মাপের আমদানিকারক, আড়তদার, পাইকারদের সংশ্লিষ্টতা তো থাকতেই পারে। আবার যারা বড় লটে পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দিল, কিন্তু সময়মতো কেন এতদিন পরও তা দেশে আসল না। সেক্ষেত্রে কোথায় গড়িমসি রয়েছে বা কোথায় কার্পণ্য আছে তা খতিয়ে দেখার বিষয় আছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারির দুর্বলতা থাকলেও তার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফরউদ্দিন বলেন, সারা দেশে বাজারপর্যায়ে যেসব আমদানিকারক, আড়তদার ও পাইকার পণ্যটির অযৌক্তিক দাম বাড়িয়েছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও জানান, সমপ্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে টেকনাফ স্থলবন্দর, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ পরিবহনে কয়েকদিনের জন্য সমস্যা হয়েছিল। এখন তা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি করা পেঁয়াজের চালানও একটার পর একটা আসতে শুরু করবে। আগামীকাল মিসর থেকে কার্গো বিমানযোগে আমদানিকৃত পেঁয়াজের প্রথম চালান ঢাকায় পৌঁছাবে।

এস আলম গ্রুপ যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করছে, এটি তার প্রথম চালান। পর্যায়ক্রমে অন্য আমদানিকারকদের আমদানিকৃত পেঁয়াজ কার্গো উড়োজাহাজযোগে ঢাকায় পৌঁছবে। এছাড়া সমুদ্রপথেও আমদানিকৃত পেঁয়াজ বাংলাদেশের পথে রয়েছে। শিগগিরই সংকট কেটে উঠবে। দামও কমবে। ইতোমধ্যে দাম কমতে শুরু করেছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর