টিসিবির ট্রাকে রিলিফের দৃশ্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী   |   ১২:৫৬, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
ছবি দেখলে মনে হতে পারে রোহিঙ্গারা ত্রাণসামগ্রী নিতে লড়াই করছে কিন্তু না, তারা টিসিবির ট্রাক থেকে ৪৫ টাকা দরে এক কেজি পেঁয়াজ নেয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছেন। গতকাল সচিবালয়ের সামনে থেকে তোলা -এম খোকন সিকদার

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের পাশের রাস্তায় হঠাৎই চোখে পড়লো অসংখ্য মানুষের ভিড়। একটি ট্রাক ঘিরে তৈরি হয়েছে মানুষের জটলা। সবারই হাত উপরের দিকে উঠানো। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে এসেছে মানুষের দীর্ঘ সারি। কাছে গিয়ে জানা গেল, এটা সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির ন্যায্য মূল্যের পেঁয়াজের ট্রাক। ট্রাকের উপরে বসা দুই-তিনজন একটু পরপরই একটা করে প্যাকেট নিচে দিচ্ছে। আর সেটা যেন কেড়ে নেয়ার জন্য অসংখ্য হাত এগিয়ে যাচ্ছে।

দেখে মনে হয়, এটা যেন কোনো রিলিফ বিতরণের দৃশ্য। সচরাচর কোনো ভয়াবহ দুর্যোগ বা মহামারির সময়ই খাবারের জন্য এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়। কিন্তু এবার টাকা দিয়ে পেঁয়াজ কেনার ক্ষেত্রেও এমন দৃশ্য তৈরি হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে টিসিবির পেঁয়াজের ট্রাক ঘিরে। একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায়। সেখানেও চোখে পড়ে কয়েকশ মানুষের জটলা। তারা সবাই পেঁয়াজ কিনতে টিসিবির ট্রাক ঘিরে ছিলেন।

তাদের কয়েকজন জানালেন, তারা সকাল ৮টা থেকেই এখানে এসে অপেক্ষা করছেন। এ জন্য অন্য কাজ ফেলেই পেঁয়াজ কেনার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কারণ লাইনে আগে না থাকলে পেঁয়াজ পাওয়া যায় না। এই আকালের বাজারে ২৫০ টাকা কেজি পেঁয়াজ কেনার সামর্থ্য নেই অনেকেরই। তাই শুধু নিম্নবিত্ত নয়, অনেক মধ্যবিত্ত লোকও টিসিবির ট্রাক থেকে পেঁয়াজ কিনছেন।

গত দেড় মাস ধরেই পেঁয়াজ নিয়ে চলছে হা-হুতাশ। ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ যখন ২৫০ টাকায় কিনতে হয়, তখন এমন হাহাকার হওয়াই স্বাভাবিক। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর থেকেই দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। এক মাসের ব্যবধানে সেটা গিয়ে পৌঁছে ১৫০ টাকায়। কিন্তু গত পাঁচদিন ধরে সেই পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা ছুঁয়েছে। এ অবস্থায় একমাত্র সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির পক্ষ থেকেই ৪৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। আর সে কারণেই টিসিবির পেঁয়াজের ট্রাক ঘিরে মানুষের এত ভিড়।

জানা গেছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে টিসিবি ঢাকায় ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। প্রথমে রাজধানীর ১০টি স্থানে খোলা ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি করে। কিন্তু ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়। ফলে টিসিবির কম দামে বিক্রি করা পেঁয়াজের চাহিদাও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় টিসিবি ১০টি থেকে বাড়িয়ে রাজধানীর ৩৫টি স্থানে খোলা ট্রাকে করে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। যা এখনো বহাল আছে।

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ট্রাকে এক মেট্রিক টন বা এক হাজার কেজি করে পেঁয়াজ প্রতিদিন বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে ৩৫টি ট্রাকে প্রতিদিন ঢাকায় ৩৫ মেট্রিকটন পেঁয়াজের চাহিদা মেটাচ্ছে সরকারের এই বিপণন সংস্থাটি। তারা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম রাখছে ৪৫ টাকা। আর একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারেন।

গতকাল রোববার দুপুরে খামারবাড়িতে কথা হয় পেঁয়াজ কিনতে আসা আক্তার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই দুর্মূল্যের বাজারেও যে সরকার ৪৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ দিচ্ছে— এটা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। তবে টিসিবির এই পেঁয়াজের মান ততটা ভালো নয়। আর এর মধ্যে অনেক পচা ও নষ্ট পেঁয়াজও থাকে। এখানে দেখে বাছাই করে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সানি আহমেদ নামে আরেকজন ক্রেতা বলেন, এখানেও দুই নম্বরি শুরু হয়ে গেছে। আশপাশের অনেক টোকাই অযথাই এসে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা ৯০ টাকা দিয়ে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনে নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে খরিদ্দার খুঁজছে বিক্রি করার জন্য। দীর্ঘ লাইন দেখে অনেকেই তাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা কেজি দিয়ে পেঁয়াজ নিয়ে যাচ্ছে। নগদ লাভের আশায় অনেকেই এখন টিসিবির ট্রাক ঘিরে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ূন কবির বলেন, টিসিবি সরাসরি ও ডিলারদের মাধ্যমে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে জনগণকে সেবা দেয়ার। শতশত লোকের মাঝে দু-একজন এমন করলে ট্রাকে বসে যারা বিক্রি করছেন, তাদের পক্ষে ধরা কঠিন। তারপরও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর