সৌদির গৃহকর্তাদের অট্টালিকায় অবরুদ্ধ গৃহকর্মীদের দীর্ঘশ্বাস

ফ্লাইটেই সীমাবদ্ধ সরকার বাকি সব সৌদির নিয়ন্ত্রণে

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু   |   ০১:১১, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির গরমিল দীর্ঘদিনের। নেপালের গৃহকর্মীদের বেতন যেখানে এক হাজার ৬০০ রিয়াল (সৌদি মুদ্রা), ফিলিপাইন এক হাজার ৮০০ বা দুই হাজার রিয়াল এবং এর কমে কোনো কর্মীকেই সৌদি আরবে পাঠাচ্ছেও না তারা, সেখানে বাংলাদেশের নারীকর্মীরা পান মাত্র ৮০০ রিয়াল (১৭ হাজার ৬০০ টাকা)।

যদিও অর্থনৈতিক কারণকেই অভিবাসনের প্রধান চালিকাশক্তি মনে করে বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ব্যবসায়িক ক্ষতি ইত্যাদি থেকে মুক্তি এবং সচ্ছল জীবনের স্বপ্নস্বাদ পূরণই তাদের অভিবাসনের মূল কারণ। অথচ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এমন গরমিলের মধ্যেও সৌদি আরবে পাড়ি জমানো বাঙালি নারী গৃহকর্মীরাই আজ নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি নিয়ে। লাশ হয়েও ফিরছেন কেউ কেউ। দেশটির গৃহকর্তাদের অট্টালিকায় অবরুদ্ধ বাঙালি গৃহকর্মীদের দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার শব্দও পৌঁছায় না দেশে।

কেবল নির্যাতনের শিকার হয়েই দূতাবাসে এলে অথবা ভুক্তভোগী নারীদের স্বজনরা কোনো অভিযোগ করলেই শুধু সরকার এ সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারে। এর বাইরে নারী গৃহকর্মীদের সৌদি আরবগামী ফ্লাইটে তুলে দেয়ার পর শেষ পর্যন্ত তারা দেশটির কোথায় এবং কী কাজে যুক্ত হন, সে বিষয়ে বাংলাদেশের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নারীকর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি এককভাবে সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেই জানায় সংশ্লিষ্টরা।

অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একেবারেই অশিক্ষিত ও অদক্ষ নারীদের সৌদি আরবে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে গিয়ে নিজেদের করণীয় ও নিরাপত্তাসহ অন্য বিষয়গুলো তারা বুঝতেই পারছেন না। সেখানে সেফহোম বাড়ানো দরকার। নারী শ্রমিকদের ফোন ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে না, এই বিষয়েও পদক্ষেপ দরকার।

ফোন রাখতে না দিলে নারী শ্রমিক পাঠানো হবে না— এ ধরনের বার্তাও পৌঁছানো দরকার। প্রতি মাসে একবার হলেও নারী শ্রমিকদের কথা শোনা উচিত। এতে প্রবাসীদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাদের বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের খোঁজখবর নেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ধরনের কোনো কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।

এছাড়া এজেন্সিগুলো ওই দেশে গিয়ে ভালো কর্মসংস্থানদাতাদের সঙ্গে কথা বলে ভিসা সংগ্রহ করছে না। ভিসা সংগ্রহ হচ্ছে মূলত ওই দেশে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে। যারা কোনো বিচার-বিবেচনা না করেই ভিসা সংগ্রহ করছে এবং সেগুলো প্রস্তুত করছে আমাদের দেশীয় এজেন্সিগুলো। এই এজেন্সিগুলোর অনেকেই মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে মিশে আছে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দূর না করলে এ ধরনের নির্যাতনের হাত থেকে নারী শ্রমিকদের বাঁচানো কঠিন হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। যে নারী নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে তারা কোন কোন এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েছিলেন এবং ওই এজেন্সিগুলো যাদের থেকে ভিসা সংগ্রহ করেছিল তাদেরকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু অন্যায় দমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হয়ে ওইসব এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপ করে দেয়া দরকার, যারা নারী শ্রমিকদের খোঁজখবর রাখবে। সরকার যথেষ্ট ভালো উদ্যোগ নিচ্ছে, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। যারা নির্যাতিত হয়ে ফেরত আসছেন, সরকার তাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টাও করছে। কিন্তু সৌদি আরবেও সরকারের সেবা বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের নিয়মিত খোঁজখবরও রাখতে হবে। কোনো শ্রমিক সমস্যায় পড়লে দ্রুত পদক্ষেপও নিতে হবে। কিন্তু এসবের কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি আদৌ।

এদিকে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর শুরু থেকেই সৌদি আরব বলে আসছে, কাজ করার মতো শারীরিক ও মানসিকভাবে সামর্থ্য থাকার পাশাপাশি আরবি ভাষা, সেখানকার রীতিনীতি ও জীবনাচার সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকতে হবে। অথচ এ বিষয়গুলোতে কখনোই জোর দেয়নি বিএমইটি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই।

বরং প্রশিক্ষণের নামে যেনতেনভাবে নারীদের পাঠানো হচ্ছে। সৌদি আরবে কর্মী পাঠানোর নিবন্ধন রয়েছে প্রায় ৭০০ রিক্রুটিং এজেন্সির (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান)। অভিযোগ রয়েছে, কতিপয় এজেন্সি নিয়ম না মেনে সৌদিতে বিদ্যমান মধ্যস্থভোগীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে নারীদের সৌদি আরবে পাঠায়। পাঠানোর আগে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে না।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস- বায়রার মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, এককভাবে কাউকে দায়ী করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব না। সংশ্লিষ্ট সবকটি সংস্থার সমন্বয়েই এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব। এছাড়া রিক্রটিং এজেন্সি এককভাবে কাউকে প্রশিক্ষণ দেয় না। এটা বিএমইটির দায়িত্ব। তাদের ক্লিয়ারেন্স এবং ম্যানপাওয়ার ছাড়া রিক্রটিং এজেন্সিগুলোর কিছু করার নেই। এছাড়া পুরো বিষয়টিতে সবার সমন্বিত মনিটরিংয়ের প্রয়োজন। মনিটরিং না থাকলে এ সমস্যা আরও প্রকট হবে।

তবে আমাদের দেশের মোট মাইগ্রেশনের ৮০ শতাংশ সৌদিতে। সেখানে একে অপরকে দোষারোপ করে এই মাইগ্রেশন প্রক্রিয়ায় আঘাত করা যাবে না। তাহলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় চরমভাবে প্রভাব পড়বে। যে কারণে যেসব সমস্যার কারণে নারীকর্মীরা দেশে ফেরত আসছে, সবার সমন্বয়ে সেসব সমস্যার সমাধান জরুরি। কোনোভাবেই এ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।

পুরুষ শ্রমিক নেয়ার ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক প্রেরণের শর্তে সৌদি আরব সাত বছরের নিষেধাজ্ঞা উঠানোর পর ২০০৩ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দেশটির মোট অভিবাসীর ৫ শতাংশই ছিল নারী। কিন্তু ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট শ্রমিকের ১৮ শতাংশে দাঁড়ায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা। বাড়ে নির্যাতনও। সৌদি আরবে নারীকর্মীদের বর্তমান এ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ঢাকায় একটি প্রতিবেদনও পাঠায়।
২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি থেকে লাশ হয়ে ফিরেছে ১৩১ নারী। তাদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ৯৮ জন, খুন হয়েছেন পাঁচজন।

তবে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ওই চার বছরে নিহতের সংখ্যা ১৫২। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি থেকে ফিরে আসা নারীকর্মীদের সবাই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। তার মধ্যে মুন্সিগঞ্জের ডালিয়া বেগম ও পঞ্চগড়ের সুমি সবচেয় বেশি আলোচিত। ১৪ মাসের প্রবাসজীবনে শারীরিক-মানসিকসহ নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে ডালিয়াকে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ডালিয়া। কিন্তু হাত-পা ভেঙে দুই মাস রিয়াদের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে চার মাস সেফ হোমে (নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র) কাটিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে দেশে ফেরেন বলে জানান তিনি।

সৌদি আরবে নারীকর্মীদের সমস্যা নিয়ে ২০১৬ সালের মার্চেও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। দূতাবাস এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অনেকটাই গৌণ। পুরোটাই একপেশে এবং সৌদি আরব আরোপিত।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা অন্যান্য দেশের চুক্তির মতো বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তিতে গৃহকর্ম বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে গৃহকর্মী ও গৃহকর্তা (সৌদি আরবের) উভয়ের কাজ নিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত ভাষাজ্ঞান না থাকায় গৃহকর্মীরা গৃহকর্তার চড়া মেজাজ ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন। প্রতিবেদনে নির্যাতনের শিকার হওয়া ৪২ জন নারীর কথাও উল্লেখ ছিল, যাদের একজন গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।

তথ্যমতে, সমপ্রতি সৌদি শ্রম প্রতিমন্ত্রী আবদুল মজিদ আল রাশুদির সঙ্গে আলোচনা করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ। সৌদি আরবে পৌঁছার পর নারীকর্মীদের নির্ধারিত কাজের জায়গা থেকে অন্য গন্তব্যে পাঠানোর ঘটনাও ঘটছে। এতে তাদের সম্পর্কে দূতাবাস কিছু জানতে পারে না। এ বিষয়গুলো যাতে না ঘটে, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে সৌদি প্রতিমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান রাষ্ট্রদূত। নারীকর্মীদের চলমান এ সমস্যা নিয়ে ২৬ ও ২৭ নভেম্বর দুই দেশের যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক হবে বলে জানা গেছে। বৈঠকে নারীকর্মীদের সমস্যা সুরাহার অনুরোধসহ বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানা যায়।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করার দাবি উঠে। ১২ নভেম্বর সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে তিনজন সাংসদ এই দাবি জানান। সেদিন সংসদে জাতীয় পার্টির সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, মা-বোনদের আমরা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারা ওইখান থেকে যৌন নির্যাতনসহ নানা রকম অন্যায়-অত্যাচারের শিকার হয়ে অবশেষে লাশ হয়ে ফিরে আসেন। মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

নারী গৃহকর্মী পাঠাতে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয় ২০১৫ সালে। এরপর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৮ নারী সৌদি আরবে গেছেন। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য বলছে, এ বছরের প্রথম মাসে দেশটি থেকে সরকারের মধ্যস্থতায় ফেরত এসেছেন আট হাজার ৬৩৭ জন। দূতাবাস সূত্র বলছে, এর বাইরে আরও প্রায় দেড় হাজার নারী গৃহকর্মী গত ১০ মাসে নানাভাবে দেশে ফিরেছেন।

শুরু থেকেই ধর্ষণ, নির্যাতন ও মারধরের অভিযোগ করে আসছেন নারীকর্মীরা। এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকার যথেষ্ট উদ্যোগী না হওয়ায় সমস্যা দিনে দিনে জটিল হয়েছে বলে মনে করেন অভিবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও। তাদের মতে, সৌদি পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় নারীকর্মীরা সমস্যায় পড়ছেন।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর