চুয়াডাঙ্গার পুতুল মেয়ে রুপা-মিম

প্রিন্ট সংস্করণ॥ইসলাম রকিব, চুয়াডাঙ্গা   |   ০১:২১, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

সোনা-মুনা, সোনা-দানা, সোনা-সোহাগা— এ ধরনের অনেক রূপকথায় গল্পের মতো আমরা মেয়েদের নাম শুনেছি। এবার শুনবো ও জানবো চুয়াডাঙ্গার মেয়ে দু-বোন রুপা আর মিম-এর কথা। বয়সে যুবতী হলেও স্বভাব ও আচরণে তারা শিশু। দিনভর তাদের সময় কাটে স্কুল, বাড়িতে খেলাধুলা ও গ্রামের দোকানে টিভি দেখে।

গ্রামের সবাই জানে পুতুল মেয়ে, রুপা-মিম কথা বলে তোতা পাখির মতো। অচেনা মানুষ দেখলে লজ্জা পায় ওরা। গ্রামবাসী ও এলাকাবাসীর দাবি— রুপা-মিমের মতো কম উচ্চতার সহোদর বোন পৃথিবীর কোথাও নেই। বাবা-মা তাদের পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে তাদের দেখতে আসেন। উপজেলা প্রশাসন ও সমাজ সেবার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার আঠারোখাদা গ্রামে পুতুল মেয়ে রুপা ও মিমের বাড়ি। বাবা আব্দুর রশিদ একজন কৃষক ও মা ফাতেমা খাতুন গৃহিণী। তাদের সংসারে তিন সন্তান। রুপা বড় ও মিম ছোট মেয়ে। রুপার বয়স ৩০ বছর, মিমের বয়স ২০ বছর হলেও তাদের আচার আচরণ শিশুর মতো। তাদের একমাত্র ভাই নূর আলম জিকু মেজ। তিনি স্বাভাবিক। দুই বোন গ্রামের একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। প্রথম শ্রেণিতে পড়াশুনা করেন। সেখানে পড়াশুনা, খেলাধুলা ও অন্য সহপাঠীদের সাথে আড্ডা দেয় তারা। তাদের একমাত্র ভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন।

গ্রামের এখলাস হোসেন জানান, পত্র-পত্রিকার খবর পড়ে যতদুর মনে হয়েছে রুপা ও মিমের মতো খাটো নারী বিশ্বে কোথাও নেই। বাবা আবদুর রশিদ বলেন, রুপার উচ্চতা ৩৪ ইঞ্চি ও মিমের উচ্চতা ৩৩ ইঞ্চি। আমি মনে করি এত কম উচ্চতার সহোদর পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তাই তাদের নাম গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে লেখাতে চান তিনি। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চান।

স্বাভাবিক উচ্চতার একজন মানুষের সাথে রুপা-মিম দাঁড়িয়ে থাকলে সহজে বোঝা যায় পার্থক্য। তাদের মা ফাতেমা খাতুন জানান, রুপা ও মিম জন্মের সময় খুব ছোট ছিলো। তারা বেঁচে থাকবে— এ বিশ্বাস ছিলো না কারোর মাঝে। কারণ তাদের জন্মের আগে বেশ কয়েকটি সন্তান মারা গেছে। দেশ-বিদেশে নিয়ে তাদের উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ব্যাপারে চিকিৎসা কাজে আসেনি।

জানা যায়, রুপা খুব অভিমানী। কেউ কিছু বললে সহজে রেগে যায়। অভিমানে খেলনা ও ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট করে। অপরিচিত মানুষ দেখলে খুব লজ্জা পায়। বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে দোকানে যায় খাবার কিনতে। বাড়িতে রুপার জন্য রয়েছে আলাদা খেলার উপকরণ। তা নিয়ে খেলায় ব্যস্ত থাকে। মোবাইল ফোনে তার গান শোনার নেশা রয়েছে। শিল্পি মমতাজের গান তার পছন্দ। মিম খুব শান্ত প্রকৃতির। বাড়ি আর গ্রামের ছোট-বড় সবার সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটে তার। ওর আছে নানা পদের খেলনা। গ্রামের দোকানে নির্দিষ্ট কিছু সময় গিয়ে টিভি দেখে। খিদে পেলে ছুটে আসে মায়ের কাছে। মা দুই বোনকে নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দেন।

প্রতিবেশীরা জানান, রুপাকে স্কুলে ভর্তি করা হলে অন্য শিশু শিক্ষার্থীরা দেখতে হামলে পড়তো। ফলে বিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ায় সমস্যা হতো। ফলে রুপার স্কুলের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। মিমের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। বুদ্ধিতে পটু থাকলেও ওদের আচার ব্যবহার ছোট শিশুদের মতো।
বর্তমানে রুপা আর মিম গ্রামের একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি হয়েছেন প্রথম শ্রেণিতে। তারা নিয়মিত স্কুলে যান। সেখানে পড়াশুনা ও খেলাধুলা করে তাদের সময় কাটে। স্কুল ভ্যানে করে তারা বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন।

আলমডাঙ্গা উপজেলার বাড়াদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ পারভেজ জানান, আঠারোখাদা গ্রামে দুটি প্রতিবন্ধী মেয়ে আছে। তারা তোতা পাখির মতো কথা বলে। অনেকে সহযোগিতার কথা বললেও কেউ সহযোগিতা করেনি।

সমাজ সেবা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক সানোয়ার হোসেন বলেন, রুপা ও মিমকে জাতীয় প্রতিবন্ধীর কার্ড দেয়া হয়েছে। তারা খুব ছোট, উচ্চতায় স্বাভাবিক নয়। রুপাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়া হয়। মিমকে দ্রুত ভাতার আওতায় আনা হবে।

আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিটন আলি জানান, রুপা ও মিমের আচরণ শিশুর মতো। শিশু দুটির কল্যাণের জন্য কাজ করবো। পরিবার যে ধরনের সহযোগিতা চাইবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হবে। সহোদার বোন হিসাবে ছোট হলেও তাদের নাম গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর