ধার করা মাস্টারপ্লানেই বরাদ্দ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম   |   ০১:২৩, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। তারপরও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নে নিজস্ব কোনো মাস্টারপ্লান করা হয়নি। এ শহর শিক্ষানগরী হিসেবে দেশ-বিদেশে বিখ্যাত হলেও অন্যান্য সিটির তুলনায় উন্নয়নে এখনো অনেক পিছিয়ে। নগরীর গোরস্থান ও শ্মশানঘাটগুলোতে লাশ দাফন ও সৎকারের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। তাইতো রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২০০৪ সালের স্ট্রাকচারাল মাস্টার প্লানকে ভিত্তি করেই ‘রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যাতে রাস্তা, নর্দমা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিনোদনসহ শহরকে ঢেলে সাজানো হবে। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই করতে সম্প্রতি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় পরিকল্পনা কমিশন জানায়, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা সমীচীন হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন আমার সংবাদকে বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) মাস্টারপ্লানকে ভিত্তি করে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে, এটা ঠিক।

নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্যই প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে। কারণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ মাস্টারপ্লানের দিকনির্দেশনার সাথে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির বিভিন্ন অঙ্গের সামঞ্জস্য রয়েছে। আরডিএর মাস্টারপ্লান হালনাগাদের জন্য বর্তমানে পৃথক একটি প্রকল্পের আওতায় সমীক্ষা চলছে। তাতে বাড়তি জনবসতির সব তথ্য সঠিকভাবে সংযোজন করা হয়েছে।

আশা করি কোনোক্রমেই ওভারলেপিং হবে না। ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাছাড়া রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে পৃথকভাবে একটি মাস্টারপ্লান প্রণয়নে পাওয়ার চায়নার সাথে সমঝোতা স্মারক চুক্তি সই হয়েছে। আরডিএর মাস্টার প্লানকে আমলে নেয়ার কারণ হিসেবে মেয়র বলেন, বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ পাঁচ বছরে রাজশাহী সিটি উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে গেছে। এই পাঁচ বছরে তেমন কোনো উন্নয়ন কাজ না হওয়ায় মানুষ বাড়লেও বাড়েনি রাস্তা, নর্দমা, ফুটপাথ। এ জন্য প্রকল্পটি তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে পিইসির সিন্ধান্ত অনুযায়ী সব শর্তপূরণ করা হচ্ছে। কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।

মেয়র আরও বলেন, রাজশাহী দীর্ঘদিনের পুরনো শহর। বিভাগীয় ও শিক্ষানগরী হওয়ায় এখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষ। বাড়ছে চাপ। অপরদিকে পদ্মা নদীও পিছু ছাড়ছে না, ভাঙন লেগেই আছে। তাই নদী রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, আবাসনের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, চামড়া শিল্পনগরীর জন্য শিল্পমন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাতে ভালোই সাড়া পাওয়া গেছে। সবমিলে রাজশাহী সিটিকে বদলে দিতে আটটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডিপিপি তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। এসব প্রকল্প শেষ করতে পারলে রাজশাহীর চেহারা পাল্টে যাবে বলে অভিমত প্রকাশ করেন মেয়র লিটন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নামকরণ হলেও দীর্ঘ প্রায় তিন দশকে তেমন উন্নয়ন হয়নি। তারপরও রাজশাহীকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করা সম্ভব হয়েছে। বোয়ালিয়া, রাজপাড়া, শাহমখদুম ও মতিহার থানার প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটারের আওতায় ৩০টি ওয়ার্ড রয়েছে এই সিটিতে। এসব এলাকার উন্নয়নে বর্তমানে চারটি প্রকল্প চলমান।

সেগুলো হচ্ছে- রাজশাহী মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণার্থে নর্দমা নির্মাণ (৩য় পর্যায়), রাজশাহী মহানগরীর রাজশাহী-নওগাঁ প্রধান সড়ক হতে মোহনপুর রাজশাহী-নাটোর সড়ক পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম সংযোগ সড়ক নির্মাণ, রাজশাহী কল্পনা সিনেমা হল থেকে তালাইমারী মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন এবং রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার উন্নয়ন প্রকল্প। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরে তেমন উন্নয়ন কাজ হয়নি।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে প্রায় সাত লাখ মানুষ এই সিটিতে বসবাস করছেন, যা চতুর্থ মহানগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তা, নর্দমা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ফুটপাথ এখনো অপ্রতুল। যানবহনের তুলনায় পর্যাপ্ত রাস্তা নেই।

তাই প্রধান প্রধান সড়কগুলো চার লেনে উন্নীতকরণ ও নগরীতে বিকল্প সড়ক নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে এই সিটির মোট রাস্তা হচ্ছে ৭৫৭ কিলোমিটার, ফুটপাথ ১৩১ কিলোমিটার এবং নর্দমার পরিমাণ ৫৮১ কিলোমিটার। এ অবস্থা থেকে উত্তেরণের জন্য এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী সিটি। তাতে নতুন রাস্তা ৩৫৭ কিলোমিটার, ফুটপাথ প্রায় ৪৩ কিলোমিটার এবং নর্দমা ৩৫৬ কিলোমিটার নির্মাণ ও রক্ষণা-বেক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করা হবে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে। তা যাচাই করতে ১ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বলা হয়, ২০০৪ সালের প্রণীত মাস্টারপ্লানের আলোকে এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা সমীচীন হয়নি। নতুনভাবে মাস্টারপ্লান করে প্রকল্প প্রণয়ন করার প্রয়োজন ছিলো। আরডিএর প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে।

এছাড়া বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে তা বেশি হওয়ায় বাস্তবতার আলোকে যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে সংশোধিত ডিপিপিতে সংযোজন করতে হবে। একই সঙ্গে জিপ গাড়ি একটি, মোটরসাইকেল ১০টি, প্রিন্টারসহ কম্পিউটার ১০টি, শৌচাগার ১৫টি, ফুটওভারব্রিজ ১০টি, লিফট একটি, স্কিড লোডার পাঁচটি, গার্ভেজ ভ্যান পাঁচটি এবং প্রকৃত চাহিদার নিরীক্ষে কাঁচাবাজারের সুযোগ কমিয়ে বিভিন্ন অঙ্গ ও ব্যয় কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার জন্য সভায় নির্দেশ দেয়া হয়।

একই সঙ্গে প্রকল্পের আওতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে প্রতিকৃতি স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদন করে যথাযথ মানসম্মত করে তৈরি করারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে সভায়। এসব আমলে নিয়ে সংশোধিত ডিপিপি মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠালেই অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর