বয়স নির্ধারণ নিয়ে যুবলীগে ধোঁয়াশা

৫৫ করার প্রস্তাব উঠছে কংগ্রেসে
প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম   |   ১২:৪৪, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে সরকারি দলের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস। ক্যাসিনো ঝড়ে বিপর্যস্ত সংগঠনটিতে কংগ্রেস ঘিরে উৎসাহের চেয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বেশি ভর করেছে। উদ্বেগের অন্যতম কারণ যুবলীগের রাজনীতিতে বয়স নির্ধারণ। সম্প্রতি যুবলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে ৫৫ বছর পর্যন্ত বিবেচনায় রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

তবে ৫৫ বয়সের ব্যারিকেটের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যে কারণে বয়স নির্ধারণ নিয়ে যুবলীগে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। অনিশ্চয়তায় পড়েছে সংগঠনটির শতাধিক নেতার ভাগ্য। সে কারণে এবারের কংগ্রেসে বয়সের ব্যারিকেটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জোর দাবি উঠেছে। গত অক্টোবর মাস থেকে দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজি-ক্যাডারবাজি, ক্যাসিনোসহ অবৈধ পন্থায় অঢেল সম্পত্তি ও সরকারি দলের ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানে নামে সরকার।

শুদ্ধি অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তরের প্রভাবশালী নেতাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে। অভিযানে আটক হয়েছেন যুবলীগনেতা জিকে শামীম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমান, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া প্রমুখ।লাপাত্তা হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। যারা প্রত্যেকেই গত দশ বছর ধরে যুবলীগের রাজনীতিতে ছিলো নীতিনির্ধারক। আটক এবং গ্রেপ্তারকৃতদের অধিকাংশ যুবলীগের রাজনীতিতে ছিলেন অনুপ্রবেশকারী।

এসব অপকর্মের মূলহোতা হিসেবে উঠে আসে যুবলীগের বিদায়ী চেয়ারম্যান ৭০ বছর বয়সি মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীর নাম। গত দশকে তার একক নির্দেশনায় চলে আসছে সংগঠনটি। যুবলীগের ৭০ বছর বয়সি নেতার নেতৃত্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে গত ২০ অক্টোবর যুবলীগের আগামী নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৫ বছর পর্যন্ত বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি।

আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই সময় তার বয়স ছিলো মাত্র ৩২ বছর। তখন যুবলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৪০ বছরের একটি বয়সসীমার বিধান ছিলো। তবে ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির দ্বিতীয় জাতীয় কংগ্রেসে ওই বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপর যুবলীগের নেতৃত্ব আসা সকলের বয়স ৫০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। একমাত্র মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীই ৭০ বছর বয়সি হয়ে যুবলীগের দায়িত্বে ছিলেন। তাকে ঘিরে বিতর্কের কারণে যুবলীগের বয়স নির্ধারণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে ৫৫ বছর পর্যন্ত করার বিষয়টি আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিলো। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে, বয়স নির্ধারণের বিষয়ে হাইকমান্ডের কড়াকড়ি নির্দেশনা বিবেচনায় এনে গঠনতন্ত্র সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে যুবলীগের। সপ্তম কংগ্রেমে যুবলীগের রাজনীতিতে বয়স সীমা ৫৫ করার প্রস্তাব পাঠানো হবে। তবে প্রস্তাবনাটি এবারের কংগ্রেসে বাস্তবায়ন হবে কি না— নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্র আরও জানান, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণের গুঞ্জন উঠেছিল।

কিন্তু চূড়ান্ত বিবেচনায় সেটি কার্যকর করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। যুবলীগের বিষয়েও এমনটি হবে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে দুবাই সফরে আছেন। ফিরে তিনি ২১ নভেম্বর সশস্ত্রবাহিনী দিবসে যোগদান এবং ২২ নভেম্বর কলকাতা সফল করবেন। পরদিন ২৩ নভেম্বর যুবলীগের কংগ্রেস। তাই বয়স নির্ধারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কংগ্রেস থেকেই আসতে পারে। শুদ্ধি অভিযানে যুবলীগের রাঘব-বোয়ালদের পতনের পর নতুন আশায় বুক বেধেছেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিতরা।

প্রধানমন্ত্রী সাহসি এবং দলীয় সংস্কার উদ্যোগে মূল্যায়িত হবে এমন আশা পোষণ করছেন। কিন্তু বয়স নির্ধারণের জটিল অঙ্কে ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছেন তারা। ৫৫ বছর বয়স নির্ধারণ করলে যুবলীগের অন্তত শতাধিক নেতা বাদ পড়বেন। প্রেসিডিয়ামের অন্যতম ৮০ ভাগ সদস্যই বাদ পড়বেন। যারা যুবলীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের বাদ দিয়ে সঠিক নেতৃত্ব নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া যুবলীগের বাইরে থেকে নেতা নির্বাচন হলে প্রভাবশালী সংগঠনটি আরও বেকায়দায় পড়বে বলে মনে করেন তারা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনটির নেতৃত্বে এক শ্রেণির লুটেরাদের কবলে পড়েছে, সেখান থেকে বের করে পরিচ্ছন্ন সংগঠনে রূপ দিতে দলের ভিতর থেকেই নেতা নির্বাচনের বিকল্প নেই, তারা জানান।

এদিকে, বয়সের কারণে বাদ পড়তে পারেন, এমন দুই ডজনের মতো নেতা ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাতে বয়স নির্ধারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু জানাননি এবং কাউকে প্রার্থী হতেও নিষেধ করেননি বলে দাবি করেন।

জানতে চাইলে যুবলীগের অন্যতম প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ফারুক হোসেন বলেন, যতটুকু জানি বয়স নিয়ে আলোচনা হয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানাই এবং নেত্রী সেটি রাখবেন বলে বিশ্বাস করি। যুবলীগের এ নেতা আরও বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকে যুবলীগ করি।

এর আগে ছাত্রলীগ করেছি। স্বৈরাচার এরশাদের সময়ে ২১ বছর বয়সে মার্শাল ল কোর্টে আমাকে ১৪ বছর সাজা দিয়েছিল, নেত্রী আমাকে বের করেছেন। যুবলীগের রাজনীতিতে একদিন অনুপস্থিত ছিলাম না। যেহেতু নেত্রী যুবলীগকে সংস্কার বা বিতর্কমুক্ত করতে চান, তাই এবার বয়সের ব্যারিকেট না রাখার অনুরোধ জানাবো। যুবলীগে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করতে সংগঠন থেকেই নেতা নির্বাচন করতে হবে।

ঢাকা উত্তর মহানগর যুবলীগের সভাপতি মাইনুল হোসেন নিখিল বলেন, বয়স নিয়ে পরিষ্কার কোনো নির্দেশনা পাইনি। দীর্ঘ সময় বিতর্কমুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিতে চেষ্টা করেছি। বয়সের কারণে ত্যাগী এবং যোগ্য কেউ যেন বাদ না পড়ে, নেত্রী নিশ্চয় সেটা বিবেচনায় নেবেন।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব মো. হারুনুর রশিদ আমার সংবাদকে বলেন, ৫৫ বছর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আমাদের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, তবে আমরা ৫৫ বছর বয়স সামনে রেখেই কাজ করছি। গঠনতন্ত্র সংশোধন করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে, সেখানে বয়স ৫৫ করার কথা থাকবে। কংগ্রেসে সেটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এই কংগ্রেসে ৫৫ বাস্তবায়ন হবে কি না— সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না।

১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই যুবলীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান ও হারুনুর রশীদ সাধারণ সম্পাদক হন।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন