আজব দেশ লাইবেরিয়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো. জোবায়ের আলী জুয়েল   |   ০১:৫৭, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

আফ্রিকা মহাদেশের প্রাচীনতম স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র লাইবেরিয়া। দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, পূর্বে আইভোরি কোষ্ট এবং উত্তরে গিনি দ্বারা বেষ্টিত। দেশটির পশ্চিম উপকূলে আছে বিস্তৃত ও সুদীর্ঘ সাগর সৈকত। সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ হলো নিম্বা, উচ্চতা ১,৭৫২ মিটার (৫,৭৪৮ ফুট)। প্রধান প্রধান নদীগুলো হলো- ম্যানা, মোরো, সেন্টপল, সেন্টজন, সেস, দৌওব এবং ক্যাভেল্লা।

এখানে নিরক্ষয়ী জলবায়ু বিদ্যমান। সারা বছর এখানে প্রচণ্ড গরম। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৪০০ মিলি মিটার (১৫.৭ ইঞ্চি)। তাপমাত্রা জানুয়ারিতে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস সর্ব নিম্ন তাপমাত্রা এবং জুলাইতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশটির আয়তন ১ লাখ ১১ হাজার ৩৭০ বর্গ কিলোমিটার (৪২ হাজার ৯৮৯ বর্গমাইল) এবং জনসংখ্যা ৪৯ লাখ।

ইংরেজি হলো সরকারি ভাষা। এছাড়া ২০টির বেশি উপজাতীয় ভাষা প্রচলিত আছে। এদের মধ্যে স্থানীয় উপজাতি তথা কেপিলি, বাসা, গিও, ক্রু, গোলা, কিসি, ভাই এবং বেল্লা হলো শতকরা ৯৫ জন। ১৮৪৭ সালের ২৬ জুলাই লাইবেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে এবং একটি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৮০ সালের ১২ই এপ্রিল মাষ্টার সার্জেন্ট স্যামুয়েল ডো-এর নেতৃত্বে সংগঠিত এক অভ্যূত্থানে প্রেসিডেন্ট টলবার্ট নিহত হন।

সার্জেন্ট স্যামুয়েল পরবর্তীতে রাষ্ট্র প্রধান ও সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রিন্স জনসনের বিদ্রোহী গ্রুপের হাতে প্রেসিডেন্ট ডো নিহত হন। এদিকে চালর্স টেলর নিজেকে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। ১৯৯৭ সালে এখানে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন চালর্স টেলর।

এখানে শতকরা ৭০ জন স্থানীয় ধর্ম, ২০ জন মুসলমান এবং ১০ জন খ্রিষ্টান রয়েছে। দেশটির সরকার পরিচালিত কয়েকটি পাবলিক স্কুল এবং বিদেশি মিশন পরিচালিত কয়েকটি মিশনারি স্কুল রয়েছে। লাইবেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। এটি রাজধানী মনরোভিয়াতে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৮৬২ সালে খোলা হয়েছিল। বর্তমানে এখানে ৬টি কলেজ রয়েছে।

একটি মেডিক্যাল স্কুল এবং দেশের একমাত্র আইন স্কুলটি হলো লুই আর্থার গ্রিমেন্স স্কুল অব ল’। বনাঞ্চলে চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার একর। প্রধান প্রধান শহর হলো- টোটোটা, বেল, ইয়েলা, হারপারা ও মনরোভিয়া। লাইবেরিয়া একটি স্বাধীন দেশ। যাদের রয়েছে হীরার খনি, রয়েছে লৌহ মণ্ডিত পাহাড়ের পর পাহাড়। তারা নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করে কী এক করুণ পরিণতির সৃষ্টি করেছে। লাইবেরিয়া এখনও কুসংস্কার ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। লাইবেরিয়ার কালো মানুষগুলো কোনো ফল খায় না। সাপ, ব্যাঙ, পশু-পাখি সবই তারা খায়।

লাইবেরিয়ার প্রায় মেয়েরাই বিয়ে করে না। কিন্তু সবারই সন্তান আছে। পুরুষদের মধ্যে অধিকাংশই কোনো কাজ করে না। মাদকের নেশায় তারা সবসময় বুঁদ হয়ে থাকে। শিক্ষার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। সভ্যতা ও কুসংস্কারের পার্থক্য এরা বোঝেনা। গোটা লাইবেরিয়া জুড়ে লাখ লাখ গাছে কোটি কোটি আম, পেঁপে, আনারস, কলা ধরে পেকে থাকলেও কেউ তা’ কোনদিন স্পর্শ করেও দেখে না।

হাজার বছরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আটলান্টিক সাগরের তীরবর্তী নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কালো মানুষগুলোর বিশ্বাস ফল হলো পশু-পাখির খাদ্য, এগুলো মানুষের জন্য নয়। অন্য দেশের মানুষও এখানে পেকে পড়ে থাকা ফলগুলো ছুঁতেও ভয় পায়। কারণ তাদের বিশ্বাসে আঘাত দিলে ওরা যে কোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের উপর চড়াও হতে পারে। তারা কখন যে হিংস্র রূপ ধারণ করতে পারে তা’ কেউ জানে না।

লাইবেরিয়ার মানুষ তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় বনের সিংহ, বাঘ, গণ্ডার, হাতি, শেয়াল, বানর, বিড়াল, গরু, জেব্রা, জিরাফ, হায়েনা, গাধা, মহিষ, ঘোড়া, হরিণ, কুকুর, ইঁদুর, গিরিগিটি, সাপ, কুমির, ঈগল, পেঁচা, কাক, কবুতর, শালিকসহ সব রকমের জন্তুরই মাংস ভক্ষণ করে। এমন কি মৃত জীব-জন্তুর শুঁটকী পর্যন্ত খায় তারা। অন্য পশু-পাখি খেলেও শুধু ধবধবে সাদা বক তারা খায় না। লাইবেরিয়ার অধিকাংশ আদিম মানুষের বিশ্বাস সাদা বকের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার আত্মা বিরাজমান। তাই এটা খুবই পবিত্র। সুতরাং এটা কোনো ক্রমেই খাওয়া যাবে না।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিকের মানুষ গুবরে পোকার শুঁটকী কাঁচা চিবিয়ে খায়। লাইবেরিয়া দেশটির ৪৯ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ হতদরিদ্র অবস্থায় এক বেলা খেতে পায়। খাবারটির নাম কাসাভা। তাদের প্রধান খাদ্য হলো এই কাসাভা। মাঝখানটা মোটা কিছুটা আমাদের দেশের মিষ্টি আলুর আকৃতি। এই কাসাভা তারা পিষে গুঁড়া করে সেদ্ধ করে খায় অথবা আগুনে পুড়িয়েও খায়।

অপরিসীম শক্তি এদেশের লোকের দেহে। এছাড়াও খাবারের তালিকায় ভুট্টার রুটি বা বণ্য পশু-পাখির মাংস ও ঝলসিয়ে খায় তারা। না খেয়ে থাকলেও তারা কখনো বিশ্বাস ভঙ্গ করে নিষিদ্ধ খাবার ফল বা বক খাবে না। এদেশে পানির চেয়ে মদের দাম সস্তা। ১৪ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে দেশটির সব অবকাঠামো ও স্থাপনা ধ্বংস হলেও লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়ার একমাত্র মদের কারখানাটি এখনো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটির শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশি এলাকা ঘনজঙ্গলে ঢাকা উঁচু-নিচু পাহাড়ি ভূমি। পুরো দেশে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। এখানে জাতিসংঘের সব কন্টিনজেন্টে জেনারেটরের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।

ছোট মাঝারি হোটেল-রেষ্টুরেন্ট ও দোকানগুলোতে কিছুটা সময় ছোট জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। রেষ্টুরেন্টে মিউজিক ভিডিও চলে অনবরত। চাষাবাদযোগ্য জমাগুলোতে তেমন কোনো কৃষিদ্রব্য বা ফসল এখানে উৎপাদন কর হয় না, বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের সৈন্যরা এখানে তৈরি করে দিচ্ছে দূর্গম সব পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তা ঘাট ও কালর্ভাট। কী করে মাটিতে ধান চাষ করতে হয় তাও শিখিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের সৈন্যরা।

এখানে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, আলু, মরিচ, তেল, লবণসহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ঘানা, আইভোরি কোষ্ট, গিনি, সিয়েরা লিওন ও অন্যান্য দেশ থেকে। এদেশের অধিকাংশই যুবকই মদ ও নারীর নেশায় বুঁদ হয়ে সর্বদাই বসে বসে অলস সময় কাটায়। মোবাইল ফোনের কড কানে দিয়ে গান শোনে আর কোমরও দেহ সর্বাঙ্গ দুলিয়ে নাচে। কাজ-কর্ম নেই, বিয়ে, সংসার, ধর্ম, শিক্ষা, কৃষি, সভ্যতা কিছুই নেই এদের।

এ নিয়ে এরা কেউ চিন্তিত ও মাথা ঘামায় না। দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষই জটিল এইচ.আই.ভি- এইড্স রোগে আক্রান্ত। এখানে বিয়ে না করেও ৯৫ ভাগ নারী সন্তান ধারণ করে। এখানে সন্তান লালন-পালন বন জঙ্গল থেকে লতা-গুল্ম কুড়ানো, কাসাভা থেকে খাদ্য তৈরি, পশু-পাখির মাংস ঝলসানোর জন্য জঙ্গলে আগুন দিয়ে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা সংগ্রহ, হাট বাজার করাসহ প্রায় সব ধরণের নিত্য কাজ কর্ম মেয়েরাই করে থাকে। এখানকার মাতৃতান্ত্রিক পরিবারগুলোতে সব শিশুই মায়ের নামে পরিচিত হয়।

এখানকার বিভিন্ন নৃতাত্তিক আদি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ গোত্রের মানুষই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না। এখানে বেশির ভাগ মানুষই অন্ধকার যুগের বাসিন্দা। চলতে ফিরতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বহু গির্জাও চার্চ চোখে পড়লেও কাউকে সেখানে দেখা যায় না। এখানকার মানুষের মধ্যে নেই কোনো সামাজিকতার ছাপ। অল্প সংখ্যক মুসলমানের বাস এখানে। এখানকার মুষ্টিমেয় মুসলমানরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে এবং তারা তুলনামূলকভাবে সামাজিক। এখানকার লোকদের সমাজে পর্দা ও লজ্জাবোধ নেই বললেই চলে।

এরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অগণিত লোকদের সামনেই মূত্র ত্যাগ করে। নিজেকে আড়াল করার প্রয়োজন বোধ করে না। এক সময় তারা বৃদ্ধ মানুষদের অপ্রয়োজনীয় মনে করে আগুনে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলতো। এখন অবশ্য তারা এটি আর করে না। এদের ধর্মীয় বিশ্বাস না থাকলেও সৃষ্টিকর্তা যে একজন আছেন এ বিশ্বাস তাদের রয়েছে। তারা সবাই বিশ্বাস করে আত্মা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা বা বিধাতার অংশ বা আত্মীয়।

তাই এখানে কোনো মানুষ মারা গেলে এরা কাঁদে না। সবাই নেচে গেয়ে আনন্দ ফূর্তি করে মৃত ব্যক্তির লাশ সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে সম্মিলিতভাবে চারদিক দিয়ে গোল হয়ে মৃত ব্যক্তির নিকটজন ও আত্মীয়-স্বজনরা গান গেয়ে নাচতে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত মৃতদেহ থেকে পচনের দূর্গন্ধ না বের হবে তখন পর্যন্ত এই নাচ-গান অব্যাহত থাকবে।

লাশ পচার গন্ধ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের সবার মনে বিশ্বাস জন্মাবে সৃষ্টিকর্তা তার অংশ বা আত্মাকে গ্রহণ করে নিয়েছে, তাই লাশ এখন আর তাদের আয়ত্তে নয়। এরপর তারা মৃত ব্যক্তিটিকে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক, লাইবেরিয়ায় যে হীরার খনি রয়েছে তার থেকে হীরা উত্তোলন করে আমেরিকানরা।

লোহার যে বিশাল পাহাড় রয়েছে, সেই পাহাড় থেকে লোহা কেটে নিচ্ছে ভারতীয়রা। শত শত একর জমি মাত্র পাঁচ সেন্টে এক একর হিসেবে লিজ নিয়ে রাবার বাগান তৈরি করছেন ভীন দেশীয় জাপানিরা। দেশটির মাটি উর্বর হলেও কোনো কোনো জায়গায় অধিক বর্ষণের কারণে স্থানে স্থানে বিশাল জলাভূমি দেখা যায়, কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, কাসাভা, কফি, আখ ও কমলা প্রভৃতি।

পশু সম্পদের মধ্যে রয়েছে শুকর, ভেড়া ও অন্যান্য গবাদিপশু। এখানকার লোকের গড় আয়ু পুরুষ ৫৮ বছর ও নারী ৬৪ বছর। লাইবেরিয়া অবৈধভাবে খাবারের জন্য শিকার করা প্রজাতির মধ্যে পিগমি হিপ্পস অন্যতম। বিপন্ন প্রজাতিগুলো লাইবেরিয়া বুশমেট হিসেবে মানুষের সেবার জন্য শিকার করা হয়। বুশমেট প্রায়শই প্রতিবেশী দেশ সিয়েরা লিওন এবং আইভোরি কোষ্টে রপ্তানি করা হয়।

বুশমেট লাইবেরিয়ায় ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় এবং এটি একটি সুস্বাদ খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রোটিনের পছন্দসই উৎস হিসেবে রাজধানী মনরোভিয়ার বাসিন্দাদের মধ্যে মাছের চেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই বুশমেট।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, ৯৯% লাইবেরিয়ান রান্না ও উত্তাপের জন্য কাঠ কয়লা এবং জ্বালানী কাঠ পোড়ায়। ফলস্বরূপ সমগ্র লাইবেরিয়ায় ব্যাপকভাবে বন উজাড় হতে চলেছে। লাইবেরিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপতি জর্জ এম ওয়ে। ২০০৩ সালে লাইবেরিয়ায় দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের অবসান হয়।

লেখক : কলামিস্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর