যুবলীগজুড়ে নেতৃত্বে আসার লড়াই

ত্যাগী ও মেধাবী নেতৃত্ব চায় তৃণমূল
প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম   |   ০১:৩৩, নভেম্বর ২০, ২০১৯

জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম সহযোগী সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে জোর লবিয়িং শুরু করেছেন পদপ্রত্যাশীরা। নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৫৫ বছর বয়স নির্ধারণ নিয়ে অনেকটা দোটানায় রয়েছেন অধিকাংশ প্রার্থী। বয়স নির্ধারণের চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়ায় তারাও লবিয়িং করছেন। তবে বয়স বিবেচনায় না এনে যোগ্য, ত্যাগী ও মেধাবী নেতৃত্ব আনার দাবি করেছেন সংগঠনটির তৃণমূল নেতারা।

গত মাসে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সরকার দলীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। অবৈধ পন্থায় অঢেল সম্পত্তি ও সরকারি দলের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে যুবলীগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীকে অব্যাহতি দেন শেখ হাসিনা।

দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজি-ক্যাডারবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসার অভিযোগে শুদ্ধি অভিযানে আটক ও পদ হারান একাধিক প্রভাবশালী নেতা। লাপাত্তা হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। যারা প্রত্যেকেই গত দশ বছর ধরে যুবলীগের রাজনীতিতে ছিলো নীতিনির্ধারক। ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশের পর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণের বিষয়টি জোরে শোরে আলোচনায় আসে।

যার পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগী, মেধাবী এবং পরীক্ষিত নেতাদের কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বে আনতে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে ত্যাগী, মেধাবী এবং পরীক্ষিত নেতাদের কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বে আনতে তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে দলের সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২৩ অক্টোবর আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে কংগ্রেস ঘিরে ১১টি উপ-কমিটি গঠন করেছে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি। সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত উপ-কমিটিগুলো ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের মূল আয়োজন করা হচ্ছে।

কংগ্রেসে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার কারণে মঞ্চ ও গোটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে নানা ধরনের ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। নির্মাণাধীন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর আদলে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন মূল মঞ্চ। ওই মঞ্চে প্রধান অতিথিসহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া বর্ণিল সাজে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও আশপাশ সাজানো হবে। মনিটরের মাধ্যমে আগত সব কাউন্সিলর এবং ডেলিগেটদের সামনে দেখানো হবে।

এদিকে, জাতীয় কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির হালের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত দশকে যুবলীগের ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিচিতদের ছাড়াই জমে উঠেছে কংগ্রেস। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পৃক্ত এক ডজন পরিচ্ছন্ন নেতা নেতৃত্বে আসার লড়াইয়ে উঠে এসেছেন। যাদের ঘিরে যুবলীগের প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন।

অপকর্মে জড়িত যুবলীগের শীর্ষ কয়েক নেতার দাপটে যারা কোণঠাসা ছিলেন সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর তারাও চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। সবমিলিয়ে সম্মেলন ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে। ধানমন্ডিস্থ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের অফিস ও বাসায় আনাগোনা বেড়েছে।

নিষ্ক্রিয় নেতারাও তৎপর হয়ে উঠেছেন, সকাল-বিকাল কার্যালয় ও নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। প্রার্থীদের শোডাউন, মিছিল, ব্যানার ফেস্টুন আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা ঢাকা। প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের বিশাল আকৃতির ফেস্টুন দেখা মিলছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে।

যুবলীগ সূত্র মতে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা অধিকাংশ যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতা। বিগত সময়ে দলের দুঃসময়ে সক্রিয় ছিলেন। কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন সংগঠনটির ডজন খানেক নেতা।

এর মধ্যে সভাপতি হিসেবে আলোচনায় আছেন— যুবলীগের অন্যতম প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ফারুক হোসেন, মজিবুর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান এবং অ্যাড. বেলাল হোসেন। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন— যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি, সুব্রত পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউজ্জমান বদি, ঢাকা উত্তর মহানগর যুবলীগের সভাপতি মাইনুল হোসেন নিখিল প্রমুখ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন— প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ফারুক হোসেন।

ফারুক হোসেন ১৯৮৬ সাল থেকে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। এর আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ফরিদপুর জেলায় শীর্ষপদে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এক-এগারো সরকারসহ জিয়া, এরশাদের সময়ে টানা চার বছর ছয় মাসসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাত বছরের বেশি কারাভোগ করেছেন। যুবলীগের ষষ্ঠ কংগ্রেসে প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।

এর আগে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ৫ম কংগ্রেস (নানক-আজম কমিটির) কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। একাধিকবার যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৮৩ সালে তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা (ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলা) ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে ফরিদপুরের ইয়াছিন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। স্বৈরশাসক এরশাদ পতন আন্দোলনের সময়ে মার্শাল ল বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্মুখীন হন। পরবর্তীতে এরশাদের পতন হলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার উদ্যোগী হয়ে তাকে কারামুক্ত করেন।

প্রার্থিতা নিয়ে জানতে চাইলে মো. ফারুক হোসেন বলেন, সব সময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করি। দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় ও ফরিদপুরে ছাত্রলীগ করেছি। ১৯৮৬ সাল থেকে যুবলীগ করি, একদিনের জন্যও সংগঠনের বাইরে থাকিনি। আমার সর্বোচ্চ দিয়ে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করি। নেত্রী আমাকে চেনেন এবং জানেন। আশা করি তিনি এবার মূল্যায়ন করবেন।

এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবর রহমান চৌধুরী। তিনিও দুঃসময়ে যুবলীগের হাল ধরেছিলেন। ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত যুবলীগের ১নং যুগ্ম সম্পাদক এবং ১/১১-র সময় দুই বছর যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া আলোচনায় থাকা যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন ২০১৬ সালে যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সহ-দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা যুগ্ম সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি দীর্ঘ সময় ধরে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি এর আগে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি। তাকে সংগঠনটির শীর্ষ পদে চান অনুসারীরা।

মহিউদ্দিন আহমেদ মহি বলেন, যুবলীগের রাজনীতিতে আসলে ব্যক্তিগতভাবে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের সাংগঠনিক নেত্রী সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাই সিদ্ধান্ত নেবেন- কাকে দায়িত্বে আনবেন। তবে যারা দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেন, সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের অতীতের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন পাবেন, সে প্রত্যাশা থাকতে পারে।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত পাল ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত যুবলীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতে তিনি তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মাইনুল হোসেন নিখিল ১৯৯১ সালে যুবলীগের রাজনীতিতে আসেন। তৎকালীন ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়। ২০০১ সালে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ষষ্ঠ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

এদিকে, যুবলীগের এবারের কাউন্সিলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, এটা অনেকটাই নিশ্চিত। অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় অভিযুক্তরাসহ দুর্নীতি ও টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ নেতারা বাদ পড়বেন। নেতৃত্বে আনা হবে ক্লিন ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের। একই সঙ্গে যুবলীগের বাইরে থেকে নেতৃত্ব আসতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। নেতৃত্ব আসতে পারে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ। এছাড়া ৫৫ বছর বয়সের সীমা রেখায় বাদ পড়তে পারেন সংগঠনটির একাধিক যোগ্য নেতা। তাই যুবলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্ব এবং বয়সের ব্যারিকেড তুলে নেয়ার দাবি করেছেন তৃণমূল নেতারা।

লক্ষ্মীপুর জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, যুবলীগে যেমন বিতর্কিত নেতা আছেন, তেমনি পরিচ্ছন্ন নেতাও আছেন। তাই আমরা চাই— যুবলীগের নেতা সংগঠন থেকেই আনা হোক এবং বয়সের কারণে যেন কেউ বাদ না পড়েন। নেত্রী এ দুটি বিষয় বিবেচনায় নেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই যুবলীগের ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ওমর ফারুক চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হন হারুন-অর-রশিদ। তবে চেয়ারম্যান হওয়ার পর ওমর ফারুক চৌধুরীর অনেকটাই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সংগঠনে ওমর ফারুকের কথাই ছিল শেষ কথা। আওয়ামী লীগের একমাত্র সংগঠন, যেখানে কর্মীরা তাদের সংগঠনের প্রধানকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতে হয়।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর