ডিজির দুর্নীতিকে ঘিরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে স্থবিরতা

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ   |   ০১:৩৬, নভেম্বর ২০, ২০১৯

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজালের দুর্নীতিকে ঘিরে অফিসগুলোতে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। কর্মকর্তাদের প্রমোশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ ঝুলে রয়েছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে স্বাক্ষর করছেন না ফাইলে।এতে বেশি সমস্যায় পড়ছে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত কর্মকর্তারা। অফিসে অনেক কাজ জমা থাকলেও বিভিন্ন কারণেই তারা কাজ করতে পারছেন না। রুটিন অনুযায়ী অফিসে আসা-যাওয়া আর সাথে কিছু রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া আর কিছুই করছেন না।

অন্যদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অফিস ঘুরে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে এ পদে আর দেখতে চান না। তারা মনে করেন, তাকে এই পদ থেকে দ্রুত না সরালে কাজের গতি ফিরে আসবে না। এর আগেও রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে এক জরুরি সভায় ২৫ জন পরিচালকের মধ্যে ২৩ জনই মহাপরিচালকের পদত্যাগের পক্ষে দাবি তুলেছিলেন।

গতকাল দুপুরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক পরিচালক আমার সংবাদকে বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা চলছে। অনেক প্রমোশন ও বিভিন্ন ফাইল স্বাক্ষরের জন্য আটকে আছে। বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম মসজিদের অনেক উন্নয়নমূলক কাজ আটকে আছে। উনার টেবিলে গেলেও তিনি ফাইল স্বাক্ষর করেন না। এছাড়াও গত ৬ মাস যাবত মার্কেটের হস্তান্তর কার্যক্রম আটকে আছে বৈঠক না হওয়ার কারণে। ৬ মাসে সরকারের লস হয়েছে এক কোটি টাকার মতো। এমন অনেক কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে বলে এ কর্মকর্তা জানান।

একইভাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আরেক কর্মকর্তা জানান, অফিসে এখন শুধু কানাঘুষা চলে। স্বাভাবিক কার্যক্রমের গতি নেই বললেই চলে। এছাড়াও আমাদের মতো যারা ছোট কর্মকর্তা আছে তারা খুব আতঙ্কে আছে কখন কি হয়ে যায়? কখন কাকে সাসপেন্ড করে দেয়। কখন কাকে বদলি দিয়ে দেয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অফিস কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন মিলে এক সাথে বসে ডিজির দুর্নীতি নিয়ে কথা বলছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন এসব বিষয় নিয়ে কথা না বলাই ভালো। কখন আবার কোন বিপদে পড়ে যাই। গত ৬ মাস যাবতই বর্তমান ডিজির দুর্নীতি ও অপসারণ আলোচনা তুঙ্গে। তবে সম্প্রতি দুর্নীতি করা টাকার মধ্য থেকে ৮২ কোটি টাকা ফিরত দিলে আলোচনা আরও বড় হয়ে সামনে আসে। কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন প্রজেক্টের টাকা তার অ্যাকাউন্টে গেল কিভাবে? তার দুর্নীতির কারণেই বঙ্গবন্ধুর গড়া প্রতিষ্ঠান আজ মানুষের সমালোচনার মুখে পড়েছে।

জানা যায়, বায়তুল মোকাররম মসজিদের একটি পিলার ভাঙার পর সে ব্যবসায়ীর পক্ষ নেয়ার মধ্য দিয়েই আলোচনায় আসেন ইফা ডিজি। এ ঘটনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদারকে গত ৩০ মে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল। ওই বরখাস্তের আদেশ বাতিল করতে গত ৩ জুন ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন মহীউদ্দিন।

এ ঘটনার পর গত ১০ জুন মহাপরিচালককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। দুর্নীতির অভিযোগে কেন সাময়িক বরখাস্ত করা হবে না এবং তার নিয়োগ কেন বাতিল করা হবে না সাত কার্যদিবসের মধ্যে তার জবাব দিতে বলা হয় নোটিসে। পাশাপাশি মুহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদারকে সাময়িক বরখাস্ত করার আদেশও বাতিল করা হয়।

জানা যায়, সামীম মোহাম্মদ আফজাল জুডিশিয়াল সার্ভিসে ১৯৮৩ সালে যোগদান করেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ নানা বিষয়ে অনিয়ম করেছেন তিনি। ২০০৯ সালের পর থেকে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দৈনিক ভিত্তিতে ৬০০ থেকে ৭০০ কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। যাদের পরবর্তী সময়ে নিয়মিতকরণ করা হয়।

তবে এখনো ২০০ থেকে ৩০০ কর্মচারী দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োজিত আছেন। এছাড়া একাধিকবার কর্মকর্তা নিয়োগেও মহাপরিচালক অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি, নিয়োগে আত্মীয়করণ, কেনাকাটায় অনিয়মসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আবার যারা তার কথা শুনতেন না তাদের সাময়িক বরখাস্ত করারও অভিযোগ রয়েছে সামীম মোহাম্মদ আফজালের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করে ইফার একজন পরিচালক বলেন, ‘মহাপরিচালক অনৈতিক অনেক কাজ করেছেন। যে কারণে পরিচালকরা তাকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে আত্মীয়করণসহ নানা অভিযোগ আছে। এমনকি নানা কারণে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু তারপরও তিনি পদত্যাগ করেননি। বঙ্গবন্ধুর গড়া প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি ছিনিমিনি খেলছেন। তার খুঁটির জোর কোথায় সেটাও জানতে চান কর্মকর্তারা। সাথে সাথে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান দেবেন বলেও তারা আশা করেন।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর