গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার রায়

জেএমবির শক্তি প্রদর্শনের আশঙ্কা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা   |   ০১:৩৯, নভেম্বর ২০, ২০১৯

বহুল আলোচিত গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা মামলার রায়ে আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে বলে সরকারপক্ষের আইনজীবী আশা করছেন। এই মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের সবাই কারাগারে বন্দি রয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, যাদের চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তারা এই ঘটনায় জড়িত ছিলো না। যারা বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন, তারাই প্রকৃতপক্ষে ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। আর মামলার সাক্ষীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সমাধান করা হয়নি।

তবে সরকারপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, একজন সার্ক্ষীর সাক্ষ্যকে অন্য সাক্ষী সমর্থন করে সাক্ষী দিয়েছেন। এদিকে চাঞ্চল্যকর নারকীয় এই জঙ্গি হামলা মামলার রায়ের দিন আগামী ২৭ নভেম্বর ঘোষণা করেছেন আদালত। এই রায়কে ঘিরে জঙ্গিদের নাশকতাসহ আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন মহল। গত রোববার আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপন ও শুনানি শেষে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ দিন ধার্য করেন।

আর এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায়কে সামনে রেখে দেশের অপরাধ বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ বলছেন, জঙ্গিরা এ ধরনের বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বেই বিভিন্ন সময়ে তাদের শক্তি প্রদর্শন করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। বাংলাদেশেও তারা শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করতে পারে।

এর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জঙ্গিরা প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে তাদের নেতাদের ছিনিয়ে নিয়েছিল। আর ২৭ নভেম্বরের রায় নিয়ে তারা তৎপরতা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারপক্ষের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. গোলাম ছারোয়ার খান (জাকির) আমার সংবাদকে জানান, চাঞ্চল্যকর এই জঙ্গি হামলা ২০১৬ সালের ১ জুলাই মধ্য রাতে ঘটে। একইদিন গুলশান থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ২৮১/১৮ নম্বর মামলা করা হয়।

মামলার ধারা হচ্ছে, ৬/২-৭.৮.৯.১০.১১.১২.১৩। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে মোট আটজনকে অভিযুক্ত করেন। তাদের মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছিল। আর দুজনকে পলাতক দেখানো হয়েছিল। এরপর পরে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাছাড়া, মামলায় মোট ২১১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১১৩ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। এই মামলায় আটজন আসামির মধ্যে চারজন আসামির পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। আটজন আসামির যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন আইনজীবীরা।
এরপর ফের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি খণ্ডন করেন। এরপর বিচারক রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেন।

এর আগে গত ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করা হয়। ওইদিনই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন শুনানি শুরু করেন। যুক্তি উপস্থাপন শুনানি গত ১৭ নভেম্বর শেষ হয়। ওইদিন সকালেই কারাগার থেকে চাঞ্চল্যকর এই মামলার আট আসামিকে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের জিআর শাখায় মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর ৮ আগস্ট এই আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আদালত। একই বছরের ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আটজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। অভিযোগপত্রের ২১ জন আসামির মধ্যে ১৩ জন বিভিন্ন সময়ে মারা যায়। পরে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

এর আগে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বলেছেন, হলি আর্টিজানে হামলার সাথে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কোনো চক্রের সম্পর্ক নেই। সরকারকে বিপদে ফেলতে স্থানীয় জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন আমার সংবাদকে জানান, মামলার তদন্তে মোট আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন প্রথম গ্রেপ্তার হন। আর পরে অন্য মামলায় গ্রেপ্তারকৃতরা এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন তাদের দোষ স্বীকার করেছেন। আর তদন্তে সাক্ষীদের আলামত নেই।

তিনি আরও বলেন, আসামিদের মধ্যে চারজন আসামির পক্ষে শুনানি করেছে। আর অন্য একজনের পক্ষে অপর এক আইনজীবী ছিলেন। আর একজন আসামি তিনি নিজেই আদালতে বক্তব্য প্রদান করেছেন। আগামী ২৭ নভেম্বর এই মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন।

সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. গোলাম ছারোয়ার খান (জাকির) জানান, অভিযোগপত্রের আটজন আসামি হলেন— হামলার মূল সমন্বয়ক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা ওরফে র্যাশ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, নব্য জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক শাখার প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ। তাদের সবাই বর্তমানে কারাগারে।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গুলশানের হালি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার ঘটনাস্থলে নিহত আসামিরা হলেন— রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। আর বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় নিহত আট আসামির হলেন— তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ার জাহান মানিক, তানভীর কাদেরী, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও জানান, মামলার সাক্ষীদের মধ্যে একজন সাক্ষী অপরজনের সাক্ষ্যকে সমর্থক করে সাক্ষী দিয়েছেন। এছাড়া, এক বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া তাদের শনাক্ত করেছেন। আর তারা সাক্ষী দিয়ে বলেছেন, তাদের বাড়িতে আসামিরা ভাড়া ছিলেন। চাঞ্চল্যকর এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর একজন কোরিয়ান নাগরিক গোপনে ভিডিও ধারণ করেছিল। ওই ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হাসনাত করিমের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

অভিযোগ ওঠে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় ওই বছরের ৩ আগস্ট হাসনাত করিমকে ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৪ আগস্ট প্রথম দফায় তার আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরবর্তীতে ১৩ আগস্ট গুলশান হামলার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে ওই হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিটে নাম আসেনি।

এ ব্যাপারে দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ আমার সংবাদকে বলেন, জঙ্গিরা যখন বিচারের সম্মুখীন হয়, তখন তাদের মুক্ত করতে তার সহযোগীরা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। তাই এই ঘটনায় তারা প্রতিহত বা হামলা করার চেষ্টা করতে পারে।

এর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জঙ্গি হামলা চালিয়ে তারা তাদের কয়েকজন নেতাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। আর এ ধরনের ঘটনায় মূলত তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করে থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশের জঙ্গিরা তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তাদের সেই শক্তি-সামর্থ্য এখন আর আগের মতো নেই। তারপরও আমাদের সতর্ক থাকবে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ সময় তাদের গুলিতে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হন। এই ঘটনার দিন ভোরে গুলশানের হলি আর্টিজানে সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ নিহত হন পাঁচজন। এছাড়া ‘জঙ্গি আস্তানায়’ বিভিন্ন সময়ে অভিযানে নিহত হন আটজন। এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। সেই মামলার রায়ের দিন ২৭ নভেম্বর ধার্য করেছেন আদালত।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর