১৩তম গ্রেডে কমবে না শিক্ষকদের বেতন

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |   ০১:৪৯, নভেম্বর ২০, ২০১৯

বেতন বৈষম্য নিরসনের জন্য গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিদ্যমান গ্রেডব্যবস্থা নিয়ে ‘অসন্তুষ্ট’ প্রধান ও সহকারী শিক্ষকরা দশম ও এগারোতম গ্রেডে বেতন দাবি করছেন। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারপ্রধান শিক্ষকদের এগারো ও সহকারী শিক্ষকদের তেরোতম গ্রেডে বেতন দিতে সম্মত হন।

কিন্তু এই গ্রেডে বেতন দিলে বেতন কমে যাবে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা। তবে প্রস্তাবিত গ্রেডে শিক্ষকদের বেতন কমবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গ্রেড ঠিক রেখে কীভাবে বেতন বাড়ানো যায় তাও ভেবে দেখবে মন্ত্রণালয়টি। ফলে ১৩তম গ্রেডে শিক্ষকদের বেতন কমবে না বরং বাড়বে।

জানা যায়, গ্রেড বৈষম্য নিরসনের দাবিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্রমাগত আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারপ্রধান শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে বেতন দিতে সম্মত হন। কিন্তু শিক্ষকরা তা না মেনে আন্দোলনে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। একই সাথে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ চালিয়ে যায়। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সাথে বৈঠক করেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদ নামের একটি সংগঠনের নেতারা।

তারা সচিবকে জানায়, সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করা হলে টাকার পরিমাণে বেতন কমে যাবে। এর জবাবে অর্থ সচিব বেতন যাতে না কমে সেই ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। একই সাথে শিক্ষকদের অন্যান্য দাবিগুলো ধাপে ধাপে পূরণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক শিক্ষক আমার সংবাদকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেন, আমরা আশ্বাস পেয়েছি বেতন কমবে না। বাড়নো চেষ্টা করা হবে। তবে এখনই আমরা সন্তুষ্ট হতে পারছি না।

জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে উন্নীতকরণের প্রস্তাব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র প্রত্যাখ্যানের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সাথে শিক্ষকদের এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ের অর্থবিভাগে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহবায়ক মো. আনিসুর রহমান, সদস্য সচিব মো. শামসুদ্দিন মাসুদ, প্রধান মুখপাত্র মো. বদরুল আলম, প্রধান উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইসলাম তোতা, মুখপাত্র এনএ সিদ্দিকি রবিউল, প্রধান সমন্বয়ক আতিকুল ইসলাম, সদস্য বেগম বাঁধন খান ববি উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে শিক্ষক নেতারা অর্থ সচিবের কাছে শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা ও ১৩তম গ্রেডে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কমে যাওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেন। পরে অর্থ সচিব তাদের দাবি মেনে নেন এবং ১৩তম গ্রেড রেখেই শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দেন। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে বাকি দাবিগুলো মেনে নেয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

অর্থ সচিবের এমন আশ্বাসের পর শিক্ষক নেতারা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেনের সাথে বৈঠক করেন এবং অর্থ সচিবের সাথে বৈঠকের বিষয়টি অবগত করেন। এসময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন শিক্ষকদের দাবিগুলো সহজে বাস্তবায়নের জন্য ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন। আর ওই কমিটিই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগযোগ করে বেতন বৈষম্য নিরসনে কাজ করবে। এমন আশ্বাসের পর শিক্ষক নেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে।

বিষয়টি জানতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেনকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মো. আনিসুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, শিক্ষকদেও একটি প্রতিনিদি দল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সাথে বৈঠক করেছি। বৈঠকে সহকারি শিক্ষকদের বেতন না কমার আশ্বাস দিয়েছেন সচিব মহোদয়। ওই গ্রেডে রেখেই বেতন বৃদ্ধি করা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়টি আমরা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও জানিয়েছি।

বৈঠকে উপস্থিত অন্য একজন শিক্ষক বলেন, অর্থ সচিবের এমন আশ্বাসের পর শিক্ষকদের দাবিগুলো সহজে বাস্তবায়নের জন্য ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব। ওই কমিটিই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি মীমাংসা করবে।

তবে অর্থসচিবের আশ্বাসে আস্বস্ত হতে পারছেন না সাধারণ শিক্ষকরা। তারা বলছেন, আমাদের চাওয়া ১১তম গ্রেড, ১৩তম নয়। তাই এখনই আমরা বিষয়টি মেনে নিচ্ছি এটা ভাবার কারণ নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক অনলাইন সমিতির সভাপতি কাজী আবু নাসের আজাদ বলেন, প্রথম কথা হলো আমরা ১৩তম গ্রেড চাইনি, আমরা চেয়েছি ১১তম গ্রেড। এখন যদি ১৩তম গ্রেড চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে আমাদের সবার কম বেশি বেতন কমে যাবে যদি ফিগজেশানে নিম্ন ধাপ ধরা হয়। আমরা শুনেছি অর্থ সচিব মহোদয় বলেছেন ফিগজেশানে উচ্চ ধাপ দেয়া হবে। কিন্তু এভাবে বললে তো হবে না। প্রজ্ঞাপন জারি করে বলতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ৬৩ হাজার ৬০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ২২ হাজার ৭৬৬ জন শিক্ষক। আর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৩৮ জন।

জানা যায়, বর্তমানে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষক বেতন পান ১২তম গ্রেডে (১১৩০০ টাকা বেতন স্কেল) এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পান ১১তম গ্রেডে (১২৫০০ টাকা বেতন স্কেল)। আর প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষক ১৫তম গ্রেডে (৯৭০০ টাকা বেতন স্কেল) এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ১৪তম গ্রেডে (১০২০০ টাকা বেতন স্কেল) বেতন পান।

১৩তম গ্রেডে যেভাবে বেতন কমবে
সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে দিলে তা কীভাবে কমবে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন শিক্ষকরা। ২০০৬ সালে ১৯ এপ্রিল সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ২০১৪ সালে প্রথম টাইস্কেল প্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে ১৩ গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ১৩তম গ্রেডে বর্তমানে আমার মূল বেতন ১৭১০০ টাকা অর্থাৎ আমার সার্ভিস বেনিফিট দাঁড়াচ্ছে (১৭১০০-১১০০০) ৬১০০ টাকা।

প্রস্তাবিত ১৩তম গ্রেড ক্রসপেন্ডিংসহ কার্যকর হলে ১১৩০০ টাকা প্রারম্ভিক বেতন গ্রেডে আমার মোট বেতন দাঁড়াবে (১১৩০০+৬১০০) =১৭৪০০ টাকা। ১৩তম গ্রেডে ১৭৪০০ টাকার কোন ধাপ না থাকায় নিয়মানুযায়ী নিম্নতম ধাপে বেতন নির্ধারিত হবার কারণে আমার মূল বেতন নির্ধারিত হবে ১৬৭৪০ টাকা অর্থাৎ মূল বেতন কমে যাবে ১৭১০০-১৬৭৪০= ৩৬০ টাকা। এর সাথে বাড়ি ভাড়া কমবে ১৪৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাসে আমার বেতন-ভাতা কমবে ৫০৪ টাকা।

এই হিসাবে প্রতি প্রতিবছর আমার আয় কমবে ৬০৪৮ টাকা এবং উৎসব ভাতা ৭২০ এবং নববর্ষ ভাতা কমবে ৭২ টাকা। সর্বসাকুল্যে প্রতিবছর আমার মোট আয় কমে যাবে ৬৮৪০ টাকা। তিনি বলেন, দুঃখজনক ব্যাপার হলো সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম গ্রেডে নির্ধারিত হলে মূল বেতন ৩৬০ টাকা কমে যাবার ক্ষতি সম্পূর্ণ চাকরিকালে পূরণ হবে না।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর