আতঙ্কে নবীন শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা

গেস্টরুমবিরোধী স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে ডাকসু সদস্যের বাধা
প্রিন্ট সংস্করণ॥মোতাহার হোসেন, ঢাবি   |   ০১:৫৪, নভেম্বর ২০, ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গণরুম-গেস্টরুম ও সন্ত্রাসবিরোধী’ স্থিরচিত্র প্রদর্শনী করেছে ‘বৈধ সিট আমার অধিকার’ মঞ্চ নামে একটি ছাত্র সংগঠন। জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসিক হলগুলোতে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব। এই দখলদারিত্বের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার জন্য প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো যুগ যুগ ধরে সিট দখল ও সিট বাণিজ্য করে আসছে যা ১ম বর্ষ থেকে বৈধ সিট পাওয়ার পথে সব থেকে বড় অন্তরায়। যার ফলে গণরুম-গেস্টরুম নির্যাতন থেকে নবীন শিক্ষার্থীদের মুক্ত করাই এ সংগঠনটির লক্ষ্য বলে জানা গেছে।

তবে, নবীন শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির বিষয়ে ধারণা রেখে হলে উঠে— সে জন্য সংগঠনটি ‘খ’ ইউনিটের ভাইভাকে সামনে রেখে তারা এই আয়োজন করেছে।

জানা যায়, ‘গণরুম-গেস্টরুম ও সন্ত্রাসবিরোধী’ চার দিনব্যাপী স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর গতকাল মঙ্গলবার ছিল শেষ দিন। ১ম বর্ষ থেকেই প্রশাসন কর্তৃক বৈধ সিট বরাদ্দ এবং গেস্টরুম নামক টর্চারসেল বাতিলসহ ছয় দফা দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংগঠনটি স্থিরচিত্র প্রদর্শনী করে। গতকাল সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবির) কলাভবনের সামনে স্থিরচিত্র প্রদর্শনী শুরু হলে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শেষ হয়। ‘বৈধ সিট আমার অধিকার’ মঞ্চের মুখপাত্র আরমানুল হক ও উমামা ফাতেমা।

মঞ্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— ১ম বর্ষ থেকেই প্রশাসন কর্তৃক বৈধ সিট বরাদ্দ করা, গেস্টরুম নামক টর্চারসেল বাতিল,
সিট বরাদ্দে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, অবৈধভাবে সিট দখলকারীদের অবিলম্বে হল ত্যাগ, পলিটিক্যাল গণরুম বাতিল। চার দিনব্যাপী ‘গণরুম-গেস্টরুম ও সন্ত্রাসবিরোধী’ স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষিকা শ্যামলী বড়ুয়া, ডাকসুর ভিপি নূরুল হক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অণিক রায়, ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদ জামিল, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন প্রমুখ।

এ বিষয়ে আরমানুল হক বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে গেস্টরুম-গণরুম ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছি। তার ধারাবাহিকতায় আমরা এই স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য, নবীন যারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে তারা যেন হলের দখলদারিত্বের বিষয়টি লক্ষ্য রেখে হলে উঠে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা ভর্তি হোক কিন্তু প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের পেছনে যে অনেক কিছু আছে তা যেন তারা জেনে ভর্তি হয়। তারা যেন পলিটিক্যালি হলে না উঠে। তারা যেন বৈধভাবে হলে উঠে। তবে আয়োজনের চতুর্থ দিনে দুপুর ১টার দিকে স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বাধা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য তানভির হাসান সৈকত।

সংগঠনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ডাকসু সদস্য তানভীর হাসান সৈকত দুপুর ১টার দিকে কলাভবনের সামনে অনুষ্ঠেয় স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বাধা দেন এবং উক্ত স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে ছাত্রলীগবিরোধী কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এসময় তানভীর হাসান সৈকত সংগঠনের আহ্বায়ক আরমানুল হককে দেখে নেয়ার হুমকি দেন এবং শিবির বলে অপপ্রচার চালান।

এ বিষয়ে সংগঠনের আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেন, দুপুর ১টার দিকে তানভির হাসান সৈকত এখানে এসে বাধা দেয়। সে এসে আমাদের বলে, আমরা যে প্রদর্শনী করছি তা নাকি ছাত্রলীগবিরোধী। তখন আমরা বলেছি হলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ থাকায় যত নিপীড়ন-নির্যাতন হয় সব তো ছাত্রলীগই করছে। কিন্তু এ কথার প্রেক্ষিতে তখন তিনি আমাকে শিবির ট্যাগ দেন। অথচ আমি ছাত্র ফেডারেশন করি। আমি ছাত্র ফেডারেশনের অর্থ সম্পাদক। আমি শিবিরের রাজনীতিকে ঘৃণা করি। এসময় উনি আমাকে দেখে নেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত ডাকসু সদস্য তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি যদি কারো সমালোচনা করতে হয় তাহলে ভালো খারাপ দুটোই করতে হয়। আমি দেখলাম তারা সব ছাত্রলীগবিরোধী চিত্র প্রদর্শনী করছে। ছাত্রলীগের ভালো কাজগুলোও তো আছে। তবে আমি তাদের কোনো হুমকি ধমকি দেইনি। আমি তাদের বড় ভাই হিসেবে ছোট ভাইয়ের মতো বুঝিয়েছি। তিনি আরও বলেন, এখানে যারা এগুলো দেখছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন। এই নবীনরা এগুলো দেখার কারণে তারা আতঙ্কে রয়েছেন। তারা এগুলো দেখার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হবে।’

এদিকে স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর কারণে আতঙ্কে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষার ভাইভা দিতে আসা নবীন শিক্ষার্থীরাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা অভিভাবকরা। তারা জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্টরুম-গণরুমে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম হয় তা অনেকেই ঠিকমতো জানতেন না। এই স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির বিষয়ে তারা জেনেছেন। যার কারণে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন এবং অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভর্তির বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন।

এ বিষয়ে নোয়াখালী থেকে ভাইভা দিতে আসা নবীন শিক্ষার্থী আলামিন বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির সাথে খবরের কাগজ ও টিভির মাধ্যমে আগের থেকে কিছুটা পরিচিত ছিলাম। কিন্তু এখানে এসে এসব স্থিরচিত্র দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির বিষয়ে আরও স্পষ্ট হলাম। আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এমন জায়গায় এগুলো থাকা উচিত না। আমি এতটা ভাবিনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসব কাজ হয়।

স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘নবীন শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে। তাদের কীভাবে আমরা সাদরে গ্রহণ করতে পারি। তাদের স্বপ্নকে কীভাবে আরও উপরে তুলতে পারি, তাদের যে সমস্যাগুলো রয়েছে তা সমাধান করতে পারি, আমরা ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি এ আহ্বান জানাই।

তবে, প্রত্যেক সংগঠন যার যার আদর্শ দিয়ে এগিয়ে যাবে। তবে অন্য সংগঠনকে নেতিবাচক করে কোনো সংগঠন তার অবস্থান জোরালো করতে পারে না। নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি কোনো শুভ বার্তা দেয় না। আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তারা সবাই সমাজ সম্পর্কে সচেতন। সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো তাদের যথেষ্ট মেধা রয়েছে।’

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর