স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান   |   ০২:৪৩, নভেম্বর ২১, ২০১৯

দেশের চিকিৎসা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নেই কোনো যুগোপযোগী আইন। এ খাতে ভর করছে নৈরাজ্য। এ সমস্যা দূর করতে সরকার ২০১৬ সালে রোগী সুরক্ষা আইন নামে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তিন বছর পর সেটি স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন নামে সংশোধিক খসড়া আইনটি মন্ত্রিপরিষদে জমা পড়েছে গত অক্টোবরে। আইনটি পাস হলে দেশের চিকিৎসা খাতে প্রায় চার দশক পর নতুন কোনো নিয়ম চালু হতে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। সেই আইনের অসঙ্গতিগুলো কাটিয়ে নতুন এই আইন তৈরি করা হয়েছে। এতে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ে উপকৃত হবে। চিকিৎসাখাতে অস্থিরতাও কেটে যাবে।

তবে ইতোমধ্যে নতুন এই আইনের খসড়া নিয়ে ভিন্নচিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। আইনের খসড়া নিয়ে রোগী, চিকিৎসক ও আইনটি তৈরিতে সংশ্লিষ্টরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ বলছে, নতুন আইনের খসড়ায় চিকিৎসকদের ছাড় দেয়া হয়েছে। ভুল চিকিৎসায় মারা গেলে চিকিৎসকে আর দায় নিতে হবে না।

অথচ রোগী সুরক্ষা আইনের খসড়ায় বলা ছিল, অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা করা যাবে। কিন্তু বর্তমান খসড়ায় এই অংশটুকু বাদ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে নতুন খসড়া আইনকে অযৌক্তিক উল্লেখ্য করে চিকিৎসকরা এই আইন সংশোধনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

তার বলছেন, এই আইনে রোগী-চিকিৎসককে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রহসন করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিদেশি বিনিয়োগে হাসপাতাল স্থাপন, পরিচালনা ও বিদেশি চিকিৎসকদের নিয়োগের সমালোচনা করেন তারা। তবে আইনটি খসড়া তৈরিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ আইন চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করেই করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়ার আলোচিত ধারাগুলোতে বলা আছে, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো চিকিৎসক অফিস সময়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা দিতে পারবেন না। অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে এক লাখ টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। এমনকি ছুটির দিনে চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলের জেলার বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে বা ব্যক্তিগত চেম্বারে টাকার বিনিময়ে সেবা দিতেও সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

এছাড়া প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রোগীদের চিকিৎসকের ফি সম্পর্কে জানাতে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি তালিকা চেম্বারের সামনে টাঙানো ও ওই ফি’র রশিদ রোগীকে দিতে বাধ্য থাকবেন। সেবাগ্রহীতা বা তার অভিভাবককে ওই রসিদের অনুলিপি প্রদান করতে হবে। চেম্বারে রোগ পরীক্ষার ন্যূনতম চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকতে হবে।

অনুমোদিত ডিগ্রি ছাড়া অন্য কোনো ডিগ্রির বিবরণ সাইনবোর্ড বা নামফলক কিংবা ভিজিটিং কার্ডে উল্লেখ করা যাবে না। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ও ভিজিটিং কার্ডে বিএমডিসির নিবন্ধন নম্বর লেখা থাকতে হবে। মহিলা রোগীর পরীক্ষার জন্য মহিলা নার্স বা সহায়ক থাকতে হবে। তবে জটিল পরিস্থিতিতে যৌক্তিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই শর্ত শিথিলযোগ্য। এক্ষেত্রে আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে এক লাখ টাকা জরিমানা।

একই সঙ্গে আদালত সংশ্লিষ্ট বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মালিককে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হবে। রোগী ও রোগীর স্বজনদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। প্রয়োজনে রোগীকে বিকল্প চিকিৎসা দিতে হবে এবং তা রোগীর স্বজনদের জানাতে হবে। চিকিৎসাকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধের পার্শ্বপ্রদ্ধয়া, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং অস্ত্রোপচারের জটিলতা রোগীর স্বজনদের জানাতে হবে। চিকিৎসা ব্যয় অর্থাৎ কোন খাতে কত ব্যয় হবে তা রোগীর স্বজনদের জানাতে হবে। চিকিৎসা দেয়ার অনুমতি নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি সহিংস কাজ করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সে ক্ষেত্রে সেবাদানকারী ও প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট করা, ধ্বংসের মতো অপরাধের শাস্তি তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। সন্দেহজনক মৃত্যু, আত্মহত্যা, বিষ প্রয়োগে হত্যা, বেআইনি গর্ভপাত, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিসহ এ ধরনের ঘটনা প্রমাণিত হলে চিকিৎসক বা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান পুলিশকে অবহিত করতে বাধ্য থাকবে। বিদেশি ডাক্তার সরকারের পূর্বানুমতি নিয়ে নিয়োগ দেয়া যাবে। বিদেশি আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থায়নে হাসপাতাল স্থাপন করা যাবে। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত সব বিধিবিধান মানতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের সমালোচনা করে গতকাল মঙ্গলবার এক বৈঠকে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেন, ডাক্তারের নিরাপত্তা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে, তিনি যেন কোনো ধরনের হামলার শিকার না হন। এ ছাড়া আর কিছু উল্লেখ নেই। সাধারণত হামলার শিকার হলে ফৌজদারি মামলা করলে বিচার পাবে। এ জন্য আলাদা কোনো আইনের দরকার ছিল না।

সাংবাদিক গোলাম মর্তুজা বলেন, এই আইনের কারণে ডাক্তার ও সাধারণ মানুষ প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে। এরকম আইন করার সময় রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে নজর রেখে আমলারা কিংবা অ-ডাক্তাররা আইনটি করে ফেলে। এ আইন বাতিল করে চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট আইন করতে হবে।

ডা. শামীম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগে দেশে হাসপাতাল শুভকর নয়। দেশের মধ্যে খুলনা ও চট্টগ্রামে কীভাবে বিদেশি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়? বিদেশি চিকিৎসকরা কীভাবে এখানে এসে চিকিৎসা প্রদান করে? আবার সরাসরি অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশের বাইরে রোগী কোন নিয়ম অনুসারে যায়? এসব জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই এই আইনে।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ও বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব আমার সংবাদকে বলেন, সেবার জন্য রোগী ও তার স্বজনরা চিকিৎসকের কাছে যায়। চিকিৎসকও রোগী সুস্থ হোক এ জন্য চিকিৎসা প্রদান করেন। কোনো চিকিৎসক চায় না তার অবহেলায় রোগী মারা যাক। এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ছাড়াও কোনো চিকিৎসক ক্রিমিনাল নন। তাকে ক্রিমিনাল আইনে বিচার করা যেতে পারে না।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাবেক সভাপতি (স্বাচিপ) ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের যে খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে জমা দিয়েছে, সেখানে আমাদের বিভিন্ন সময়ের দাবি-দাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। এখনো নতুন আইনের খসড়া হাতে পাইনি। হাতে পেলে সেটা দেখে বিস্তারিত বলা যাবে।

তিনি বলেন, কোনো চিকিৎসক চাইবেন না তার অবহেলায় রোগী মারা যাক। সেখানে খসড়ায় এ ধারাটি তুলে দেয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, চিকিৎসকদের সুরক্ষা দিতে হবে। আইনে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। তবে ফি নির্ধারণ বিষয়ে আমরা একমত নই। এটা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ধারণ করতে হবে।

স্বাস্থ্যসচিব (সেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, নতুন আইন তৈরি করা একটি কঠিন বিষয়। বহুদিনে তৈরি হয় একটি আইন। স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়াটি তৈরির সময় চিকিৎসকদের প্রতিনিধিদের পরামর্শেই করা হয়েছে। আইনের খসড়া এখন আমার হাতে নেই। না দেখে এখন বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের মধ্যে কাদের পরামর্শ নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সারা দেশের সব চিকিৎসকের সঙ্গে তো কথা বলা সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন সংগঠনের পরামর্শ নেয়া হয়েছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর