খালেদার স্বাস্থ্যগত অবস্থা দাখিলের নির্দেশ

প্রতিবেদন কীভাবে যাচ্ছে জানে না মেডিকেল বোর্ড!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |   ১২:৩৭, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সবশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা জানাতে মেডিকেল বোর্ডকে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। গত ২৮ নভেম্বর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানিকালে আদালত এমন নির্দেশনা দেন।

আগামী ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এই রিপোর্ট দাখিল করতে বলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সে সময় রয়েছে আর মাত্র তিনদিন। কিন্তু সেই প্রতিবেদনে মেডিকেল বোর্ডের কী করণীয়, তাদের স্বাক্ষর থাকবে কিনা এখনো তারা জানেন না। গতকাল খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড প্রধান অধ্যাপক ডা. জিলন মিয়া সরকারের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা যায়।

তিনি বলেছেন, কতজনের স্বাক্ষর যাবে এটা আমি জানি না। আদালতের এগুলো বুঝি না। জনসভার কথাও বুঝি না। আপনারা প্রশাসনকে ধরেন, ওনারা ভালো বলতে পারবেন। আমরা শুধু রোগী দেখি। বোর্ডের অন্য সদস্য রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক বদরুন্নেছা বেগম, কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানজিমা পারভীন এবং অর্থোপেডিক বিভাগের ডা. চৌধুরী ইকবাল মাহমুদকে নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো বসেছে কিনা এমন সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তবে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় দীর্ঘদিন যে ডাক্তাররা দেখেছেন তারা প্রতিদিনই রিপোর্ট দিয়েছেন। তার ওপর ভিত্তি করেই আদালতের নির্দেশে রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে মেডিকেল বোর্ড প্রধানের স্বাক্ষর থাকবে বলে ধারণা করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বোর্ডের নির্ভরযোগ্য সূত্র।

তবে এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, ডাক্তারের স্বাক্ষরসহ বোর্ড রিপোর্ট আসতে হবে। শুধু ভাইস চ্যান্সেলর ও ডাইরেক্টর রিপোর্ট দিয়ে দিলে হবে না, এটাতে সব ডাক্তারের স্বাক্ষর লাগবে। আদালত বলেছে, বোর্ডের সকল রিপোর্ট কল করেছি। এদিকে খালেদা জিয়ার সবশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালেদা জিয়া এখনো ভালো নেই।

স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। জয়েন্টে ব্যথার কারণে তার হাড় বাঁকা হয়ে গেছে। হুইল চেয়ারেই চলছেন তিনি। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না দীর্ঘ সময়। এখন হুইল চেয়ারে করেই ওয়াশ রুমে ও বিছানায় নিতে হয়। আর এগুলোর সহযোগিতা করছেন খালেদার গৃহকর্মী ফাতেমা।
এ বিষয়ে জিলন মিয়ার সঙ্গে আলাপকালে তিনি আরও বলেন, ‘কালকেও ওনাকে দেখেছি। উনি ভালো আছেনতো। উনি আগের মতোই আছেন।

জয়েন্টের জন্য একটু ব্যথা। ওনার সাথে একটা মেয়ে থাকে না ওই মেয়েটা হেল্প করছেন। একা উনি নিজের মতো চলতে পারেন না। এছাড়া সবই ভালো। ডায়াবেটিসও খুব সুন্দর ৭ পয়েন্ট ফোর-ফাইভ। ইনসুলেন্সও অর্ধেক কমিয়ে দিছি। সবদিক থেকেই ভালো আছেন। এখন শুধু চলতে ফিরতে একটু কষ্ট আর কি। এ কষ্টটা ২৮ বছর থেকে। এটা তো ওনার নতুন না।’

এরপরও বিএনপি মেডিকেল বোর্ড সত্য প্রকাশ করবে কিনা সন্দেহ প্রকাশ করছে— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার দিন তো দিনেই লেখা আছে। আমাদের সবকিছু সত্য আছে। একটু ভুল নেই। আমরা অনেস্টলি সব করছি। আমাদের মেডিকেল বোর্ড সবকিছু লিখিতো রাখেতো। আমাদের লিখিত জিনিসগুলোই উনারা ফাইল করে জানাবেন। যতটুকু সম্ভব আমরা চিকিৎসা করতেছি। আমরা রোগী দেখতেছি সবই সত্য। সবমিলিয়ে মানুষতো সত্য। রোগীও একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আমাদের তো সব দেয়া আছে।

গত সাতমাস যারা ওনাকে দেখেছেন তারা সবাই সেগুলো দেবেন। ফাইল দেখে লিস্ট করে দিয়ে দেবেন। আমাদের ফাইলে ওনার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সব আছে। জয়েন্টের সমস্যা নিয়েতো একই রিপোর্ট। ব্যথাও খুব বেশি না। বাঁকাত্যারা হয়ে গেছেতো। যার জন্য নড়াচড়া করতে একটু কষ্ট হচ্ছে আর কী। সবাই জানে। স্যারেরাও জানেন।’ বিদেশে নেয়া ছাড়া খালেদা জিয়ার সঠিক চিকিৎসা হবে না এমন অভিযোগও রয়েছে বিএনপির

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিলন মিয়া বলেন, ‘চিকিৎসা তো যেটা উনি করছেন, ওটা লন্ডন থেকে নিয়ে আসছেন ওটাই পাইতেছেন। ম্যাডামেরতো লন্ডনের চিকিৎসাই চলতেছে। যে ওষুধটা খেতে চাচ্ছেন। ওষুধটা এখন একটু বাড়ানোর নিয়ম। সেটা বেশি বাড়ানো যায় নাই। তিনি সইতে পারেন না। ওনার বমি হয়। খাওয়ার পরিমাণ একটু কম আরকি আগের থেকে কম খান। নতুন চিকিৎসা নিতে বলছেন সেটা এখনো শুরু করা যায়নি। উনি নিতে রাজি না। ওটার সাইট ইফেক্ট পড়ে কিনা। এ বয়সে এটার ভালো দিক যেমন আছে খারাপ দিকওতো আছে।’

খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) পা সোজা করতে পারছেন না। হাঁটতে তো পারেনই না, হুইল চেয়ার ছাড়া তিনি চলতেই পারেন না। তাকে হুইল চেয়ারে করেই ওয়াশ রুমে, শাওয়ার নিতে অথবা বিছানায় নিতে হয়। এমন অবস্থায় যদি মেডিকেল বোর্ড সত্য বলেন তাহলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, কারাগারে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা হচ্ছে না। কারাগারে রেখে সরকার খালেদা জিয়াকে অচল করে দিতে চাচ্ছে। জেল কোডের নিয়মও এই সরকার মানছে না।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে সুস্থ মানুষ গেলেন, এখন জেলখানার মধ্যে আছেন। তাকে সুস্থ করা যাচ্ছে না। দিনদিন তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। এই বিষয়ের ওপর হাইকোর্ট কোনো নজরই দেননি। এ মামলাটির কোনো ইভিডেন্স নেই। এগুলো আমরা আপিল হিয়ারিংয়ের সময় বলবো। এখন খবর হচ্ছে, খালেদা জিয়া বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। খালেদা জিয়া ক্রিপেল হয়ে গেছেন। বোর্ড ইতোমধ্যেই তাকে পরীক্ষা করেছে। বোর্ড বলেছে তার অ্যাডভান্স চিকিৎসা দরকার। কতগুলো ওষুধের কথা বলেছেন, এই সমস্ত ওষুধ এ দেশে বসে পুশ করা যায় না। এগুলো বাইরের ওষুধ। সেগুলো বাইরেই অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট দরকার।

বোর্ডের রিপোর্ট অফিসিয়ালিভাবে এখনো সংগ্রহ করতে পারিনি। ভাইস চ্যান্সেলর বলেছেন আদেশ ছাড়া আমাদের রিপোর্ট দেয়া যাবে না। খালেদা জিয়ার মাধ্যমে আমরা যে রিপোর্টটা পেয়েছি তা আদালতকে জানিয়েছি। আমাদের তথ্যর ওপর ভিত্তি করে আদালত এখন বোর্ডের রিপোর্টটা কল করেছেন। সকল ডাক্তারের স্বাক্ষরসহ বোর্ড রিপোর্ট আসতে হবে।

শুধু ভাইস চ্যান্সেলর ও ডাইরেক্টর রিপোর্ট দিয়ে দিলে হবে না এটাতে সব ডাক্তারের স্বাক্ষর লাগবে। আদালত বলেছে বোর্ডের সব রিপোর্ট কল করেছি। আগামী ৫ তারিখ দেখি কী রিপোর্ট আসে। আগামী ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট আসতে বলেছে। সেদিন আবার বেইল পিটিশনের শুনানি হবে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ। মারাত্মকভাবে অসুস্থ। তার যে সমস্যাগুলো রয়েছে এটি দ্রুত সমাধান না হলে তিনি আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন। আমাদের মনে হচ্ছে, সরকার খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা না দিয়ে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খালেদা জিয়া এত বেশি অসুস্থ এখন হাঁটতে পারেন না। হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হচ্ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

এরপরও কেউ যদি দাবি করে খালেদা জিয়া ভালো আছেন, সুস্থ আছেন, তাহলে অত্যন্ত মিথ্যাচার। এখন তার বয়স ৭৫। এই বয়সে তার যে শারীরিক অবস্থা তা একজন চিকিৎসক হিসেবে আমাদের কাছে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় একটি অঘটন ঘটে যেতে পারে। পরিণতি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এখন খালেদা জিয়ার শারীরিক যে অবস্থা এই সময়ে প্রতিদিন একবার করে দেখা করতে দেয়া উচিত।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর