পরিবেশ অধিদপ্তরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে সেবা সংস্থাগুলো

খোলামেলা উন্নয়ন কাজে বাড়ছে দূষণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম   |   ১২:১৪, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন নির্মাণ, যানজট দূরীকরণে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসসহ মূল সড়ক-অলিগলির খোঁড়াখুঁড়ি করছে সেবা সংস্থাগুলো। এসব উন্নয়ন কাজে যেন ধুলাদূষণ না হয়, সেজন্য সংস্থাগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এ সংস্থার নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আগের মতোই খোলামেলা উন্নয়ন কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন, রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা। ফলে ঢাকার আকাশে ধুলাদূষণের মাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণ।

সরেজমিন দেখা যায়, মেট্রোরেল-এলিভেটেড এক্সপ্রেসের উন্নয়ন কাজ জোরেশোরে চললেও ঠিকমত পানি ছিটানো হচ্ছে না। ফলে ধুলা-বালি আকাশে ওড়ায় পথচারীদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

সম্প্রতি বায়ুদূষণ করায় মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম মেনে ধুলা নিয়ন্ত্রণ না করায় তাদের ওই জরিমানা করা হয়। এছাড়া ঢাকা ওয়াসা পুরো ঢাকাজুড়ে খোলামেলা অবস্থায় ড্রেনের উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে প্রায় তিন শতাধিক স্থানে। দুই সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও খোঁড়াখুঁড়ি করা অন্য সংস্থাগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ডেসা, ডেসকো ও ডিপিডিসি, গ্যাস কোম্পানি তিতাস; টেলিফোন কোম্পানি টিঅ্যান্ডটি। এর বাইরে কিছু বেসরকারি ইন্টারনেট সেবা সংস্থাও রয়েছে।

অন্য সংস্থাকে খোঁড়াখুঁড়ির অনুমতি দেয়ার জন্য দুই সিটিরই ‘সড়ক খনন ও পুনর্নির্মাণ’ শীর্ষক ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল রয়েছে। সেলটি ২০০৩ সালে প্রণীত ‘সড়ক খনন নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্নির্মাণ’ নীতিমালা অনুযায়ী অনুমতি দেয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা বরাবর কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এসব নির্দেশনায় বলা হয়েছে— শীতকালীন শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরে বায়ুদূষণ রোধে যথপোযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যা নির্মল বায়ু-সুস্থ জীবনের পূর্বশর্ত। শীত মৌসুমে ঢাকা শহরে প্রতিবছর বায়ুদূষণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ফলে সৃষ্ট ধূলিকণা ঢাকা মহানগরের বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। মূলত দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ বৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ, যান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বহুগুণে বেড়ে যাওয়ায় বায়ুদূষণের মাত্রাও বাড়ছে।

আবার শুষ্ক মৌসুমের শীতকালে বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে স্বল্প বৃষ্টিপাত, শুষ্ক আবহাওয়া ও নির্মাণকাজ বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়, যা অনেকক্ষেত্রে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হিসাবে দেখা দেয়। শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ভাসমান ধুলাবালি বা বস্তুকণা ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বায়ুদূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। উদ্ভূত সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরের ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর যেসব নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলো হচ্ছে— ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনসহ সেবা সংস্থাগুলোর উন্নয়নকাজ পরিচালনায় ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, নির্মাণ সামগ্রী ঢেকে পরিবহন ও মজুদ করা। যত্রতত্র ফেলে না রাখা এবং ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত বেষ্টনী ব্যবহার করতে হবে।

রাস্তায় পার্শ্ববর্তী ড্রেন বা নর্দমা হতে ময়লা/বর্জ্য উত্তোলন করে ফেলে না রেখে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে হবে। রাস্তার নানাবিধ কাজ যথাসম্ভব রাতে করা ও নির্ধারিত স্থানটি যতদূত সম্ভব ঢেকে রাখা এবং দৈনিক একাধিকবার পানি ছিটাতে হবে। রাস্তায় বিভিন্ন সার্ভিস ফ্যাসিলিটির মধ্যে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংস্থার স্থাপন বা মেরামতে বার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন এবং একই রাস্তা বারবার খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না।

সার্ভিস ফ্যাসিলি স্থাপন বা মেরামত শেষে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাস্তা কার্পেটিং করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। উম্মুক্ত স্থানে আবর্জনা রাখা ও পোড়ানো রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ধুলা যাতে না ওড়ে সেজন্য প্রতিষ্ঠানের আওতায় উন্মুক্ত স্থানে সবুজ আচ্ছাদনের ব্যবস্থা রাখা।

শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন পরিচালিত কার্যক্রমে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির সময় উপর্যুক্ত নির্দেশনাবলি অন্তর্ভুক্ত করে যথাযথভাবে অনুসরণ করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া। অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামত এবং সার্ভিস ফ্যাসিলিটি স্থাপনে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ ও তার শর্তাবলি প্রতিপালন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, ধুলাদূষণ নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। বর্তমানে শহরে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলছে।

পাশাপাশি ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের কাজও ধুলাদূষণের কিছুটা উৎস হিসেবে পরিণত হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো দূষণের জন্য অনেকটা কাজ করে থাকে। এ কারণে আমরা অনেক সমস্যায় পড়ি। আশা করি, যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে, এই কাজগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পর বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় দেখা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, বিশেষত বাসগুলো সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দূষণকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু পরিবহন খাতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রভাব থাকায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে দুটি সংস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমিরিটাস ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা সমন্বয় করা। আমাদের পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কাজ আইনগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

তবে পরিবেশ রক্ষার কাজটি শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের একার নয়। সরকারের অন্য সংস্থাগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখি পরিবেশ অধিদপ্তর অনেক বেশি প্রকল্পনির্ভর। তারা এতদিন উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়ননির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। ফলে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের যে তদারকির ভূমিকা নেয়ার কথা, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। ফলাফল আমরা দেখি, দূষণের বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর জাহিদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, চলতি বছর ঢাকায় উন্নয়ন কাজ বেশি চলছে। ফলে ধুলার পরিবেশ বেশি হয়েছে। মেয়র মহোদয় মোহাম্মদ সাঈদ খোকন অঙ্গীকার করেছিলেন জলাবদ্ধতামুক্ত নগর দেবেন মানুষকে। এজন্য ঢাকা ওয়াসার পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনেজ সংস্কার করা হচ্ছে। শুধু রাস্তার ধুলার কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে না। ঢাকার বাতাসে সীসার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খোন্দকার মো. ফজলুল হক আমার সংবাদকে বলেন, মহামান্য আদালত গত ১৭ নভেম্বর রায় দিয়েছেন সিটি কর্পোরেশন দুই বেলা পানি ছিটাবে।

এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কমিটি গঠিত হলেই তারাই নির্দেশনা দেবেন- বায়ুদূষণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে কি না।

তবে আদালতের রায়ের কপি এখনো পরিবেশ অধিদপ্তর হাতে পায়নি। আশা করছি, চলতি সপ্তাহের ভেতর রায়ের কপি হাতে পেলে নির্ধারিত হবে বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব নাকি সিটি কর্পোরেশনের দায় রয়েছে। কমিটি প্রতি মাসে একবার মিটিংয়ে বসে পর্যালোচনার সুযোগ পাবে সত্যিকার অর্থে কতটুকু বায়ুদূষণ রোধ করা গেলো।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর