রোহিঙ্গাদের এনআইডি জালিয়াতি

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক   |   ০১:০১, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় ঢোকানো এবং জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কক্সবাজার-বান্দরবানের একাধিক নির্বাচনকর্মীকে নজরদারিতে রেখেছে তদন্ত সংস্থা। এসব কর্মী রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রামের জালিয়াত চক্রের মাধ্যমে এনআইডি তৈরি করে দিতেন বলে জানা গেছে।

গত আগস্ট মাসে এক রোহিঙ্গা নারী ভুয়া এনআইডি নিয়ে চট্টগ্রামে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর জালিয়াত চক্রের খোঁজে নামে নির্বাচন কমিশন। আটকে দেয় রোহিঙ্গা সন্দেহে অর্ধশত এনআইডি বিতরণ। এনআইডি জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীনকে দুই সহযোগী আটক ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করে পুলিশে দেন ইসি কর্মকর্তারা।

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলাটির তদন্তে নেমে নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এই জালিয়াতিতে নির্বাচন কমিশনের অন্তত ৩০ জন কর্মচারী-কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পায়।

ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী চারজন ও প্রকল্পের অধীনে কর্মরত সাত কর্মচারীসহ ১৩ জন। যাদের মধ্যে পাঁচজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন।গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কক্সবাজার ও বান্দরবানের নির্বাচন অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।

নাম প্রকাশ না করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাদের নজরে থাকা কক্সবাজার, বান্দরবানের নির্বাচনকর্মীরা নিজেরাই রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজ তৈরি করে সার্ভারে প্রবেশ করিয়ে এনআইডি সংগ্রহ করে দিতেন। পাশাপাশি তারা চট্টগ্রাম ও ঢাকায় কর্মরতদের মাধ্যমেও ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্তি ও এনআইডি সংগ্রহ করে দিতেন মোটা অর্থের বিনিময়ে।

তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী এলাকায় রোহিঙ্গাদের বেশি বসবাস। কিন্তু দুই জেলায় স্থায়ী বাসিন্দা কম হওয়ায় নির্বাচনকর্মীরা রোহিঙ্গাদের সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার জালিয়াতচক্রের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। চট্টগ্রামে এক ভবনে অনেক থানা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থাকায় সার্ভারের সংখ্যাও বেশি। বিভিন্ন সার্ভার ব্যবহার করে তারা রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ও এনআইডি সংগ্রহ করে দিত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া জানান, গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দিতে ২০ জনের অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে। এসব আমরা যাচাই-বাছাই করছি।

তিনি বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বান্দরবান, কক্সবাজারসহ অনেক জেলার নির্বাচনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম পেয়েছি। কিন্তু নাম এলেই যে তারা জড়িত হবে তা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেজন্য আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করছি। যাদের বিষয়ে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হচ্ছি তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনছি।

এদিকে জড়িতদের ধরতে ইসির অনুমতিও পেয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। এরপরই নির্বাচন কমিশনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের তিন কর্মচারী আবুল খায়ের ভূইয়া, আনোয়ার হোসেন ও নাজিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি আনোয়ার ও নাজিম আদালতেও জবানবন্দি দিয়েছেন।

তাদের জবানবন্দিতে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ও বর্তমানে পাবনা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ শেখসহ আরও কয়েকজন এ জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন বলেও তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।

গ্রেপ্তার হওয়ারা জানিয়েছেন, নাজিম ছিলেন লতিফ শেখের অফিস সহায়ক। লতিফের জ্ঞাতসারেই নাজিম এনআইডি জালিয়াতির কাজ করতেন। নাজিম কোনো কাজে আটকে গেলে সহায়তা নিতেন আব্দুল লতিফ শেখের। আর লতিফ শেখ ঢাকার এক নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমেও এ কাজ করে দিতেন।

জানা যায়, মূলত কর্মচারীরা এনআইডি প্রকল্পে কর্মরতদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দিতেন। আর ঢাকায় কর্মরত প্রকল্প কর্মচারীরা কার্ড তৈরি করে পাঠিয়ে দিতেন।

এদের অনেক সময় নির্বাচন কর্মকর্তার সরাসরি সহযোগিতা করতেন। এদিকে প্রকল্পের অধীনে কর্মচারীদের পাশাপাশি ১০ জনের বেশি কর্মকর্তাও তদন্ত সংস্থার নজরদারিতে আছেন বলে জানা গেছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর