দাম পেয়ে ক্ষতি পোষাচ্ছেন আলুচাষিরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, (সিরাজদিখান) মুন্সীগঞ্জ   |   ০১:০৩, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

যেখানে পরপর চার বছর ধরে আলুতে লোকসান খাচ্ছেন মুন্সীগঞ্জের আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা, সেখানে এ বছরের শেষ সময়ে এসে আলুর ভালো দাম পাওয়ায় অনেকটাই ক্ষতি পোষাচ্ছে তাদের। মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম কম থাকলেও এখন আলুর দাম অনেকটাই ভালো।

তাই আলু বিক্রি করে খুশি আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে আগাম আলুর চাষ ও উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে দাম চড়া বলে চাষি ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

গত ২৯-৩০ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জ বড় বাজার, মুন্সীরহাট, মুক্তারপুর, রিকাবীবাজার, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ এলাকার বৌ-বাজার, সিরাজদিখান, টঙ্গিবাড়ী ও শ্রীনগর বাজারসহ ১৫টি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, এস্টারিকস উচ্চ ফলনশীল জাতের আলু খুচরা বাজারে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা ৫০ কেজি বস্তা হিসাবে দাঁড়ায় ১৫শ টাকা।

গত বছর এই সময়ে ৬৫০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। গত বছরের এই সময় আলুর দাম আরও পড়ে যায়। অনেক কৃষক হিমাগারে ভাড়া না দিতে পেরে আলু নিতে আসেননি।

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নূর কোল্ড স্টোরেজ, শরীফ কোল্ড স্টোরেজ, সোবাহান কোল্ড স্টোরেজ, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার দেওয়ান কোল্ড স্টোরেজ, এলাইড কোল্ড স্টোরেজ, নিপ্পন কোল্ড স্টোর ও মুন্সীগঞ্জ আইস ফ্যাক্টরি অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, আলু নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা।

আলু বস্তা ভর্তি করে ট্রাক, ছোট গাড়িতে ও ট্রলারে উঠানো হচ্ছে। আলু ব্যবসায়ীরা তাদের আলু স্থানীয় বাজারে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রির জন্য দরদাম করছেন। কোল্ড স্টোরের শ্রমিকরা পচা আলু বাছাই করে ভালো আলু বিক্রির জন্য বস্তা ভর্তি করছেন, কেউ কেউ বস্তার ওজন দিচ্ছেন।

মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষিবিভাগ বলছে, এ জেলায় ডায়মন্ড, কার্ডিনাল ও এস্টারিকস জাতসহ দশ প্রজাতির আলুর চাষ হয়। ২০১৭ সালে মুন্সীগঞ্জে আলুর চাষ হয়েছিল ৩৯ হাজার ৩শ হেক্টর, ২০১৮ সালে ৩৮ হাজার ৮শ হেক্টর, ২০১৯ সালে ৩৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। যা গত দুবারের তুলনায় কম।

এ বছর আলু উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮৫ মেট্রিক টন। মৌসুমের শুরুতে আলুর বাজারে মন্দাভাব ছিল। কারণ, দাম পড়ে যাওয়ায় গত বছরের আলুও হিমাগারে রয়ে গিয়েছিল। দাম না পেয়ে আলু চাষিরা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।

টঙ্গিবাড়ীর নূর কোল্ড স্টোরের ব্যবস্থাপক আব্দুস সাত্তার বলেন, চার বছর আলুর চাষ করে কৃষকরা লাভের মুখ দেখেননি। অনেক কৃষক আলু ছেড়ে অন্য ফসল চাষ করেছেন। বছরের এই সময়টাতে আলুর দাম অনেক কমে যায়। সেই শঙ্কার কারণে বছরের প্রথম সময়টাতে অনেকে তাদের আলু বিক্রি করে দেয়।

এছাড়াও কয়েকবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ায় অন্য সবজি নষ্ট হয়েছে। তাই বাজারে আলুর চাহিদা বেশি। এ কারণে গত এক মাস ধরে আলুর দাম বেড়েছে।

মুন্সীগঞ্জ আইস ফ্যাক্টরি অ্যান্ড কোল্ড স্টোরের ব্যবস্থাপক খাইরুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, কুরবানির ঈদের পর কোল্ড স্টোর থেকে আলু বের হতে শুরু করেছে।

গত বছর যে আলু প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ৫শ থেকে সাড়ে ৫শ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সে আলু এখন সাড়ে ৮শ থেকে ৯শ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ফলে হিমাগারের ভাড়া দেয়ার পরও কৃষকের লাভ থাকছে। এলাইড কোল্ড স্টোরের এক কর্মকর্তা জানান, আমাদের এখান থেকে ভোলার চর ফ্যাশন, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা খুচরা বাজারে বিক্রির জন্য আলু কিনে নিয়ে যায়।

এদিকে বাজারে আলুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও বেশ লাভ পাচ্ছেন। হিমাগার থেকে আলু বের করে এনে বাজারে তুলছেন।

সদর উপজেলার যোগনীঘাট এলাকার চাষি শহিদুল বলেন, ২.৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছি। গত বছর এ জমিতে আলুচাষ করে ১১ লাখ টাকার ক্ষতি গুনতে হয়েছে। এবার আলুর দাম চড়া। বিক্রি হচ্ছে বেশ। আশা করছি আগের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবো।

দক্ষিণ ইসলামপুর এলাকার মো. গিয়াস উদ্দিন সরকার। এবার আলুর বাজারের অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করতেই মুচকি হাসি দিয়ে গিয়াস উদ্দিন বললেন, গেলো চার বছর আলু চাষ করে অনেক লোকসান গুনেছি। এবার দুই একর জমির আলু বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা লাভ করেছি।

টঙ্গিবাড়ীর আলু ব্যবসায়ী আব্দুর রব বলেন, মৌসুমের শুরুতে ৭০০ টাকা দরে ১০ হাজার বস্তা আলু কিনেছিলেন। পুরোটাই হিমাগারে রাখেন। দাম বেড়ে যাওয়ায় গত ১৫ দিন আলু বিক্রি করেছেন। খরচ ও হিমাগারের ভাড়া বাদ দিলেও তার প্রতি বস্তায় ১৮০ থেকে ২০০ টাকা করে লাভ থাকছে।

জেলা কৃষি কর্মকর্তা উত্তম কুমার সরকার জানান, আলুর দামটা ভালো হওয়া খুব দরকার ছিল। গত কয়েক বছরের লোকসানের কারণে অনেক চাষি আলু চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল।

তিনি বলেন, আলু মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্য। তাই আলু চাষকে ধরে রাখতে কৃষকদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। এস্টারিকস, ক্যারেজ, রেডিরোসেটা জাতের আলু চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

এ জাতের আলুগুলো শিল্প ও রেস্টুরেন্টগুলোতে অধিক ব্যবহার হবে। ফলে আলুর ভালো দাম পাবে কৃষক। এছাড়াও কৃষকদের আলুর পাশা-পাশি আখ, ভুট্টা, তিল, লাউ, কুমড়া চাষের জন্য বলা হচ্ছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর