নারায়ণগঞ্জে আ.লীগের প্রতিপক্ষ আ.লীগ

আবদুল্লাহ আল মামুন, নারায়ণগঞ্জ   |   ০৬:৪১, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

নিজেদের পদ-পদবী ও অবস্থান ধরে রাখতে নারায়ণগঞ্জ’র উপজেলা ও থানা কমিটিতে এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে দাড়িয়েছে আওয়ামী লীগ এমন অভিযোগ তৃণমূল ও স্থানীয়দের। এভাবে নিজের বিপক্ষে নিজেরা অবস্থান নিলে সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল হয়ে পরতে পারে দলটি এমন আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। একই সাথে বিএনপি-জামাত এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে এমন গুঞ্জনও চলছে জেলাজুড়ে।

সাম্প্রতিক আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান মুজাহিদুল ইসলাম হেলো সরকার সাংবাদিক সম্মেলন করে জেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে বক্তব্য রাখেন। যাদেরকে সে অনুপ্রবেশকারী বলেছেন, তারা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চু। যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় ভারতে চব্বিশ পরগনায় একটি মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং শিবিরে ট্রেইনার হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে রনাঙ্গনে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিলেন।

যার নাম ভারতে একটি স্মৃতি ফলকে খোদাই করে লেখা রয়েছে আজও। ছাত্র জীবন থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে রাজণীতি করেছেন। ২৭ বছর যাবত তিনি আড়াইহাজার উপজেলা অওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়ীত্ব পালন করে অসছেন।

এরপর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে সর্বসম্মতিক্রমে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। অপরজন হলেন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক কেন্দ্রীয় যুবলীগের তথ্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ইকবাল পারভেজ।

২০০২ সালে জামাত-বিএনপির ক্ষমতায় থাকা কালীন সময়ে আড়াইহাজারে ইকবাল পারবেজের বাড়িসহ প্রায় ২৬টি ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। শুধু তাই নয় তার পরিবারের লোকজনকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। ওই সময় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তাদের বাড়িতে গিয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দেন এবং আবেগ আল্পুত হয়ে পরেন।

ওই সময়ে শেখ হাসিনা এবং ইকবাল পারভেজের মায়ের ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হয় ততকালীন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। সেই সময়ে বর্তমান এমপি বাবু বা হেলো সরকাররা তখন কোথায় ছিলেন? নির্যাতিত এবং গৃহহীন মানুষের পাশে ছিলন না তারা।

খবর পেয়ে পাশ্ববর্তী এলাকার চেয়ারম্যান এগিয়ে আসলেও হেলো সরকার ও বাবুদের কোন খবর পাওয়া যায়নি। কোন্দল শুধু আড়াইহাজারেই সীমাবদ্ধ নেই ছড়িয়ে পরেছে রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থানা কমিটিগুলোতে। একই সাথে দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ সহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনেও রয়েছে ত্রিমুখী কোন্দল। এ অন্ত কোন্দল নিয়ে বেশ কয়েকবার দলের সাধারন সম্পাদক বসেছিলেন সমাধানে।

একাধিকবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেন নি ওবায়দুল কাদের। শুধু তাই নয় কোন্দল মেটাতে আওয়ামী লীগের আপোষহীন তথা দলের সভাপতি শেখ হাসিনাও ডেকেছিলেন গণভবনে। সেখানে সভাপতির সামনেও তর্কে জড়িয়ে পরেন লাগামহীন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। কোন্দলের কারণ অনুসন্ধানে আমার সংবাদ’র কাছে উঠে আসে গোপন তথ্য।

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু তার নিজের একক আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার চলমান রাখতে এবং উপজেলায় অন্য কোনো নেতা যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্যই মুজাহিদুল ইসলাম হেলো সরকারকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে ওই দুই নেতার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করিয়েছেন।

যদিও ওই উপজেলা চেয়ারম্যান মুজাহিদুল ইসলাম হেলো সরকার নির্বাচনকালীন সময় এবং এর আগে ইকবাল পারভেজের সাথে একযোগে কাজ করেছেন। যার হাজারো প্রমান রয়েছে। করেছেন সভা-সমাবেশ, মিছিল মিটিং ও উঠান বৈঠক। সেসময় ইকজবাল পারভেজ ছিল হেলো সরকারের নেতা। শুধু তাই নয় এমপি বাবুর বিরুদ্ধে অনেক বিষধাগার করতেও দেখা গেছে তাকে।

উপজেলায় চেয়াম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, নিজের অবস্থান ও অবৈধভাবে অর্থ লাভের আশায় পাল্টি খেয়ে যোগ দেন এমপি বাবুর দলে। এমপির দলে যোগ দিয়ে এমপির আস্থা অর্জনের জন্য আওয়মী লীগে কোন্দল সৃষ্টি করতে উঠে পরে লেগেছে হেলো সরকার এমন অভিযোগ তৃণমূলের। একসময় নজরুল ইসলাম বাবু জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র সমাজের রাজণীতিতে যোগদেন।

ওই সময় জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও ক্যাডার ছিলেন আড়াইহাজারের লোটন-ঝোটন দুই সহোদর। ওই দুই ভাইয়ের হাত ধরেই সে রাজণীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ছাত্রলীগের নেতা বনে যান। পর্যায়ক্রমে তিনি হয়ে যান বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য।

স্থানীয়দের দাবি, নজরুল ইসলাম বাবু এমপির বিরুদ্ধে চলছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান। এ অনুসন্ধানের তথ্য ইকবাল পারভেজ ও বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চু দুদকের কাছে দিয়েছে বলে এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর অভিযোগ। আর এ কারণেই আড়াইহাজার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করান এমপি নজরুল ইসলাম বাবু।

ওই সংবাদ সম্মেলনের কারনে জেলা ও আড়াইহাজারে নেতাকর্মীরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এ কারনে বিএনপি বা জামাত নয় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে দাড়িয়েছে এখন আওয়ামী লীগ। শুধু তাই নয় এভাবে নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নিলে একসময় বিএনপি-জামাত আবারো সক্রিয় হয়ে উঠবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। তারা এও মনে করছেন নিজেদের প্রতিপক্ষ যখন নিজেরা তখন এ সুযোগটিই কি কাজে লাগাবে বিএনপি-জামাত। এমন প্রশ্নও বাসা বেঁধেছে জেলার রাজনৈতিক মহলের মাঝেও।

তারা আরও মনে করেন, সুদ্ধি অভিযানের বিষয়ে যেমন আপোষহীন দলের সভাপতি তেমনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের অন্ত কোন্দল সমাধানে তাকে হতে হবে আরও কঠোর। কেবল তাহলেই ঘুরে দাঁড়াবে আওয়ামী লীগ আর সুযোগ পাবে না অপশক্তি।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ- (আড়াইহাজার) আসনের সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবুকে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ভাই আমি একটু ব্যস্ত আছি আপনাকে একটু পরে দেব।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসানাত মো. শহিদ বাদল এক বিবৃতিতে জানান, মিজানুর রহমান বাচ্চু ও ইকবাল পারভেজের সাথে উপজেলা চেয়ারম্যান মুজাহিদুল ইসলাম হেলো সরকারের সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল। এদের দ্বারাই সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেছে হেলো সরকার। হেলো সরকার তাদের সম্পর্কে বেশি বেশি প্রশংসা করতেন।

বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চু দীর্ঘ ৩৫ বছর আওয়ামী লীগের রাজণীতির সাথে জড়িত এবং ইকবাল পারভেজের পরিবার সারাজীবন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত।

২০০২ সালে ইকবাল পারভেজের বাড়িতে অগ্নি সংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তিনি অপশক্তির হাতে অনেকবার মিথ্যা মামলায় হয়রানী ও নিগৃহিত হয়েছেন।

তাই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ মনে করেন, এ ধরনের অসত্য, বানোয়াট, কু-রুচিপূর্ন, ভিত্তিহীন বক্তব্য থেকে হেলো সরকারকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হলো।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বাচ্চু বলেন, জনগনের কাছে হেয় করার জন্য আমাদের বিরুদ্ধে এ সংবাদ সম্মেলন করিয়েছে এমপি বাবু। নজরুল ইসলাম বাবু দীর্ঘ ১১ বছরের সকল অপকর্ম যায়েজ করার লক্ষ্যেই এবং আড়াইহাজাবাসীর নজর এড়াতেই হেলো সরকারকে দিয়ে এ ঘৃনিত কাজটি করিয়েছেন তিনি।

এমপি বাবুর বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগের ব্যাখা দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন বা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যালেন কী আমরা নিয়ন্ত্রন করি? তারা তাদের নিজের মত করেই কাজ করছেন। কেনো না তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। অথচ ওই অযুহাত দেখিয়ে আজ জেলা আওয়ামী লীগে বিভক্তি সৃষ্টি করার পায়তারা করছে। এভাবে নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরা অবস্থান নিতে থাকলে সুযোগ নেবে বিএনপি-জামাত। তাই আমি অনুরোধ জানাবো বঙ্গবন্ধু কন্যা এবং আওয়ামী লীগের সুযোগ্য সভাপতি জনণেত্রী শেখ হাসিনাকে এ বিরোধ সমাধানে আরও কঠোর হয়ে কোন্দল মিটিয়ে দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল পারভেজ জানান, আমি জনণেত্রী শেখ হাসিনার একজন একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে দীর্ঘদিন যাবত দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে আসছি। ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে আড়াইহাজারে আমাদের বাড়ি-ঘরসহ প্রায় ২৬টি বসতঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা।

ওই সময় নেত্রী আমার বাড়িতে গিয়ে আমার মাকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এখনও মনে পরলে আতকে উঠি। এতো নির্যাতন, হামলা ও মামলার পরেও আওয়ামী লীগের প্রতি একটুও ভালবাসা কমেনি। আর যতদিন বেঁচে থাকব দলের প্রতি একচুল পরিমানও ভালবাসা কমবে না। কিন্তু হঠাৎ এমপি বাবু ও লোভি হেলো সরকারেরা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। যা খুবই দুঃখ জনক। আমি তাদেরকে অনুরোধ জানাব তারা যাতে আবারো বিএনপি-জামাতকে সুযোগ তৈরি করে না দেন। সেই জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ যাতে আওয়াম লীগকে না করেন।

আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুজাহিদুল ইসলাম হেলো সরকারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

এমআর


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর