আ.লীগের ৪ শরিকে চূড়ান্ত ভাঙন

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম   |   ১২:৪০, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

অনেকটা অস্থিরতা চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে। ১৪ দল নামে পরিচিত হলেও কার্যত জোটের দল সংখ্যা ১২। অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে একাধিক দল। এরপর সময়ে সময়ে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হয়েছে আরও কয়েকটি দল।

গত দুমাসে নতুন করে চূড়ান্ত ভাঙনের শিকার হয়েছে আরও ৪ দল। ভাঙনকবলে রয়েছে আরও দুই দল। মূলত ক্রমাগত আরও ছোট হয়ে পড়ছে ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধকে দায়ী করলেও পেছনে তৃতীয় পক্ষের হাত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটের রাজনীতিতে নীতিভ্রষ্ট হয়েছে দলগুলো। ক্ষমতাসীন হওয়ার সুবাদে গুটি কয়েক নেতা ভাগ্য বদল করাতে পারলেও দলের চেহারা পাল্টাতে পারেননি। বরং যে আদর্শে দলের প্রতিষ্ঠা তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। লেজুড়ভিত্তিক দলে পরিণত করেছে নিজেদের। নেতৃত্বাধীন দলও অনেকক্ষেত্রে ক্রীড়ানক ভূমিকা রাখছে।

ক্ষমতা ভাগাভাগির দৌড়ে কয়েকটি দল বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে পর সম্প্রতি ভাঙনকবলে পড়েছে বেশ কয়েকটি দল। দলগুলোর একটি অংশ চায় পদ ধরে রাখতে, আরেকটি গ্রুপ দীর্ঘ চেষ্টা করেও নেতৃত্বে আসতে না পারায় বিক্ষুব্ধ হয়ে নতুন দল গঠন করছে।

গত মাসে থেকেই ক্ষমতাসীন জোটের ৪টি রাজনৈতিক দল ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহে যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে। গত ১৬ নভেম্বর গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও প্রেসিডিয়ামের যৌথ সভায় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে ডা. শাহদাত হোসেনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শরাফাত আলী হীরাকে।

এ ঘটনার একদিন পর গত সোমবার পাল্টা বৈঠক ডেকে প্রেসিডিয়াম সদস্য শরাফাত আলী হীরাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন ডা. শাহদাত হোসেন ও তার অনুসারীরা। সর্বশেষ ১ ডিসেম্বর গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক শহিদুল্লাহ শিকদারের নেতৃত্বে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আরেকটি অংশ বর্ধিত সভা করে সরকারি চাকরিরত অবস্থায় রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত থাকায় অধ্যাপক শহিদুল্লাহ শিকদারকে বহিষ্কার করেছে। একইসঙ্গে প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুর বাবু ও ডা. শাহদাত হোসেনের নেতৃত্বে পৃথক সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করেছেন।

গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী বলেন, উনাদের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কোনো বৈধতা নেই। পার্টির বর্ধিত সভায় সকলের সম্মতিতে আমাদের কমিটি অনুমোদন হয়েছে।

অন্যদিকে, ডা. শাহদাত হোসেন বলেন, গত ২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর সভাপতিমণ্ডলীর সভায় ব্যারিস্টার আরশ আলী এবং শহিদুল্লাহ শিকদারের নেতৃত্বে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ২ বছরেও তারা সম্মেলন করতে পারেনি। যে কারণে গত ২৯ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় নতুন সম্মেলন প্রস্তুতি কমটি করা হয়েছে এবং এটা বৈধ।

তিনি আরও বলেন, শহিদুল্লাহ সিকদার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হিসেবে কর্মরত। যে কারণে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। তাই তাকে গণতন্ত্রী পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বাতিল করা হয়েছে।

নেতৃত্ব ধরে রাখা এবং নেতৃত্বে আসার দ্বন্দ্বে দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে আরেক শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি। গত ৩০ নভেম্বর যশোরে ‘বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মতাদর্শ রক্ষা সমন্বয় কমিটি’র ব্যানারে জাতীয় সম্মেলন করে ১১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) নামে এ দলের সভাপতি নুরুল আহসান ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইকবাল কবির জাহিদ।

এর আগে মতাদর্শের বিরোধে সিনিয়র নেতা বিমল বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি অংশ পার্টির ১০ম কংগ্রেস বর্জন করেন। এর আগে গত ২-৩ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয় রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির ১০ম কংগ্রেস। ওই কংগ্রেসে মেনন সভাপতি ও ফজলে হোসেন বাদশা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) নামে গঠিত নতুন দলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওয়ার্কার্স পার্টিতে মতাদর্শবিরোধী, সুবিধাবাদী, লেজুড়বৃত্তি চলে আসছে। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে বাম রাজনৈতিক দলের মূল ধারা বা আদর্শ ধরে রাখতে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছি এবং একটি বাম রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি।

এছাড়া বাংলাদেশ গণআজাদী লীগের বর্তমান সভাপতি এসকে সিকদার এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের পুত্র এবং গণআজাদী লীগের প্রধান উপদেষ্টা সৈয়দ সামসুল হক হাসু তর্কবাগীশের নেতৃত্বে দুটি বলয় সৃষ্টি হয়েছে। শিগগিরই দলের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান সৈয়দ সামসুল হক হাসু তর্কবাগীশ। এর মাধ্যমে দলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে বলে মনে করেন তিনি।

গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে সংকটে পড়ে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। ঐ সময় দলটির মহাসচিব পদ থেকে এমএ আউয়ালকে সরিয়ে দেন দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি।

এরপর দলটি দুটি বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে দ্বিখণ্ডিত হয়ে। গত ৯ নভেম্বরে এমপি এমএ আউয়ালের নেতৃত্বে ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি নামে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ভিন্ন নামে হলেও দলটি ১৪ দলীয় জোটের হয়েই রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে চায়।

জানতে চাইলে ইসলামিক গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এমএ আউয়াল বলেন, গত নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার ধরে রাখতে ইসলামি সমমনা ১৫টি দলের সমন্বয়ে একটি জোট গঠন করি এবং নির্বাচনে জোরালো ভূমিকা পালন করি।

সেখান থেকে ৯টি দলের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামিক গণতান্ত্রিক পার্টি আত্মপ্রকাশ করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে ইসলামিক শক্তিকে সক্রিয় করবে ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি।

এছাড়া ভাঙনকবলে রয়েছে সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী দল ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি। দলকে লেজুড়ভিত্তি এবং আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সাম্যবাদী দলে পৃথক একটি বলয় সৃষ্টি হয়েছে।

আদর্শ বাস্তবায়নে পুরোটাই ব্যর্থ গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি। দলটির সভাপতি জাকির হোসেন নিজে ১৪ দলের সভায় যোগদানেই সীমাবদ্ধ কার্যক্রম। যে কারণে দলটির নেতাকর্মীদের একটি বিরাট অংশ সাধারণ সম্পাদক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্ব সক্রিয় হচ্ছে।

জানতে চাইলে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি কারো লেজুড়বৃত্তি করবে না। নেতাকর্মীদের মতামত প্রাধান্য দিয়ে দলকে ঢেলে সাজানো হবে এবং সত্যিকার মজদুরের পার্টি হবে।

জোটের দলগুলোর বিভক্তি নিয়ে হতাশা রয়েছে নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে। তাদের বিভক্তি আগামী দিনের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন একাধিক সিনিয়র নেতা।

তবে ভিন্নমত পোষন করে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এমপি আমার সংবাদকে বলেন, ১৪ দলে থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তারা আলাদা হচ্ছে, এখানে আমাদের কিছু করার নেই।

তিনি আরও বলেন, তাদের ভাঙন ১৪ দলের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। যারা আলাদা হচ্ছে-তারা ১৪ দলীয় আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব মানলে জোটে রাখা হতে পারে।

এর আগে ২০১৬ সালে ভাঙনের শিকার হয় জোটের বড় শরিক দল জাসদ। ২০১৬ সালে জাসদ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতার এমপি। আরেকটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান এমপি। বিভক্ত হলেও দুই অংশই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলে রয়েছেন।

১৯৯৮ সালে বাম ঘরানার দলগুলো নিয়ে গঠিত হয় ১১ দলীয় জোট। ২০০৪ সালের ১১ দলের সঙ্গে ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও জাসদকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ দলীয় জোট আত্মপ্রকাশ করে। ১১ দলীয় জোটে ছিল- কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সিপিবি), গণফোরাম (ড. কামাল), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (খালেকুজ্জামান), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মাহবুব), গণআজাদী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, কমিউনিস্ট কেন্দ্র ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি। ঐ ১১ দলীয় জোটের মধ্যে বর্তমানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে ৭ দল।

আদর্শগত দ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব নিয়ে মতভেদ থাকার বাকিরা বের হয়ে গেছে অনেক আগেই। এরপর জোটে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (বিটিএফ), জাতীয় পার্টি (মঞ্জু)। বর্তমানে আওয়ামী লীগ জোটভুক্ত দলের সংখ্যা ১২।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর