তুরিন দোষী না নির্দোষ

প্রমাণ আছে-প্রমাণ নেই
প্রিন্ট সংস্করণ॥শরিফ রুবেল   |   ১২:৫৬, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

যুদ্ধাপরাধী ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের গোপন বৈঠক সংক্রান্ত অভিযোগের যথার্থ প্রমাণ মেলা ও গত ১ জানুয়ারি ঢাকার প্রথম যুগ্ম জজ আদালতে বাড়ি দখলের অভিযোগে তার ছোটভাই শাহনওয়াজ আহমেদ শিশিরের করা মামলা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে গায়েব করে ফেলায় তুরিনের ভাই আইন মন্ত্রণালয়ে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।

মূলত এ দুই কারণেই গত ১১ নভেম্বর শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে আইন মন্ত্রণালয় তাকে অপসারণ করে।

আইন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এমনিতেই বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধীদের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়নি। তার উপর এমন একজন অপরাধীর সাথে গোপনে আঁতাতের বিষয়ে মোটেও মেনে নিতে পারেননি বলেই তুরিন আফরোজ কোনো ছাড় পাননি।

এছাড়া এমন একজন স্পর্শকাতর ব্যক্তির সাথে গোপনে দেখা করা এবং সর্বশেষ তার মায়ের সাথে অসদাচরণ করে সারা দেশে সমালোচিত হওয়া এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে রাখতে সরকার বিব্রত বোধ করেছে বলেই তাকে অপসারণ করা হয়েছে।

এদিকে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই আইন মন্ত্রণালয় তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিল, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তার নিজের মাকে বাসা থেকে বের করে দেয়া থেকে শুরু করে বেশ কিছু বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়ায় মন্ত্রণালয়ের তদন্তে সে দোষী হওয়ায় তাকে অত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেয়নি।

তবে সাবেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সাবেক তিনজন বিচারপতির তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

ফলে আপিল বিভাগের তিন বিচারপতি ও মন্ত্রণালয়ের তদন্ত সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী হওয়ায় তুরিন আফরোজকে অপসারণ নিয়ে একপ্রকার ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তুরিন আফরোজের দোষী ও নির্দোষ নিয়ে মন্ত্রণালয় এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মধ্যে যে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, সেটা আইনিভাবে মূল্যায়ন করতে গেলে এখানে বেসরকারিভাবে করা কোনো তদন্ত আমলে নেয়ার সুযোগ নেই।

মন্ত্রণালয় যেটা ঘোষণা করবে, সেটাই একটা আইন— এটাকে প্রভাবিত করা যাবে না। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাই সঠিক।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির করা তদন্তের বিষয়ে কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘আমাদের কমিশন যেটা বলেছে— দুইটা বিষয়, একটা হলো— তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটা আমাদের তদন্তে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আর মামলার আসামির সাথে বৈঠকের বিষয়ে আইন অনুযায়ী সে বসতে পারে, কিন্তু বলা হয়েছে— ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো কাজ তিনি করেন তবে প্রধানকে জানিয়ে যাবেন। আসলে আমাদের তদন্তটা আমাদের নিজস্ব, আমাদের নির্মূল কমিটির যিনি লিডার তিনি বলেছেন, তুরিন আফরোজ এমন কোনো অপরাধ করেননি যে, তাকে অব্যাহতি দেয়া যায়।

আর সরকার কি তদন্ত করেছে সেটা সরকার বলতে পারবে। মন্ত্রণালয় যে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করেছে, আমরাও সেগুলোর ভিত্তিতেই তদন্ত করেছি। এদের যেটা আছে, আমাদের কাছেও সেটা আছে, বরং তাদের চেয়ে আরো বেশি আমাদের কাছে আছে।

আমাদের কমিশন অভিযুক্তকে সমন করেছিল এবং কমিশনের সামনে অভিযুক্ত বক্তব্যও রেখেছে এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কিন্তু অভিযুক্তের কোনো বক্তব্য শোনেনি, তারা তাদের নিজের মতোই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আমরা মনে করি, সরকারি তদন্তের চেয়ে আমাদেরটা বহুগুণ শক্তিশালী। আমাদের তদন্তের কাছে সরকারের তদন্ত দাঁড়াতে পারবে না।

তুরিন আফরোজকে নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর সরকার যে তদন্ত করেছে সেটা বিভাগীয় তদন্ত আর আমাদের তদন্ত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তিন জন সাবেক বিচারপতির, যেটার গুরুত্ব অধিকতর। আমাদের তদন্তের ব্যাপারে আমরা সন্তষ্ট। সরকারের তদন্তে কী হয়েছে সেটা সরকার বলতে পারে, তবে আমাদের তদন্তে যেটা প্রমাণিত হয়েছে— তিনি এমন কোনো অপরাধ করেননি যার জন্য তাকে অপসারণ করতে হবে।

এখানে আমাদের তদন্তের দ্বারা আমাদের সংগঠন পরিচালিত হবে, সরকারের তদন্তের উপর ভিত্তি করে তো আমরা চলবো না। আমরা তো সরকারের কোনো অঙ্গ সংগঠন না।’

তুরিন আফরোজের ছোটভাই শাহনওয়াজ আহমেদ শিশির বলেন, ‘তুরিন আফরোজকে প্রসিকিউশন থেকে অপসারণ করা হলেও এখনো তার বেপোরোয়া মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো আমাদের বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখানো হয়।’

তিন বিচারপতির করা তদন্তের উপর প্রশ্ন রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেছেন, ‘তারা যে তদন্ত করেছে সেটা কি পাবলিক জেনেছে? যদি তারা সঠিক তদন্ত করেই থাকেন, তাহলে সেটা সাংবাদিকদের সামনে উন্মোচন করেন না কেন? কোনটা দেখে আমরা বিশ্বাস করবো? তারা কি আদো তদন্ত করেছে নাকি না করেই তুরিন আফরোজের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। আপনাদের সাংবাদিকদের বলা উচিত ছিলো যে, আপনারা তদন্ত করেছেন ভালো কথা, কিন্তু সেটা প্রকাশ করেন; আমরা দেখি কোন জজ বা কে সেই তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে।

তিনজন বিচারপতি কী তদন্ত করলেন সেটা পাবলিক করলেন না সিক্রেট করলেন। যদি পাবলিক করেন তাহলে সেটা সাংবাদিক কেন জানবে না? কোথায় সে তদন্ত রিপোর্ট? সুতরাং যে তদন্ত রিপোর্ট জনসম্মুখে আসেনি, সেটার রেফারেন্স দিয়ে কোনো কথা বলা যায় না। আর সমালোচনাও করা যায় না। সেটা কাউন্টারও করা যায় না। তদন্ত রিপোর্ট হলো সেটা আলোর মুখই দেখলো না, সেই তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই। তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে কি-না সেটা আইন মন্ত্রণালয় ভালো জানে।’

ডেপুটি অ্যার্টনি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘এখানে আইনিভাবে যদি মূল্যায়ন করতে হয়, তবে তুরিন আফরোজকে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় যে তদন্তটা করেছে, সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এখানে বেসরকারিভাবে কোনো তদন্ত হলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর সরকারও ওটার স্বীকৃতি দেয়নি। তাই ওটা আমলে নেয়া যাবে না। মন্ত্রণালয় যে তদন্তটা করেছে, সেটা অফিস আদেশ, ওটাই সঠিক।’

তুরিন আফরোজের অপসারণে শাহরিয়ার কবিরের তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে, এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে আইন সচিব মো. গোলাম সারওয়ার আমার সংবাদকে বলেন, ‘তুরিন আফরোজকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সেটা আমিও শুনেছি, কিন্তু আমি এ বিষয়ে পুরোপুরি অবগত নই বলে এখন কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে এ ব্যাপারে কিছু বলতে হলে রেকর্ড দেখে বলতে হবে। রেকর্ড দেখা পরই আপনাকে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর