বাংলাদেশের সোনায় মোড়ানো দিন

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাজিবুল ইসলাম   |   ০১:০২, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

জমকালো আয়োজনের মধ্যে দিয়ে গত রোববার পর্দা উঠেছে এসএ গেমসের ১৩তম আসরের। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু ও শহরের পার্শ্ববর্তী পোখরাতেও এই গেমস অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

গতকাল তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের নামের পাশে চার স্বর্ণসহ ২৮ পদক। দলগত অবস্থান পাঁচে। পেছনে থাকা দুই দেশের মধ্যে মালদ্বীপের ঘরে একটি স্বর্ণ পদক, ভুটানের সর্বসাকুল্যে তিনটি ব্রোঞ্জ।

দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের তৃতীয় দিন শেষে স্বাগতিক নেপাল ২৩ স্বর্ণ নিয়ে সবার ওপরে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের স্বর্ণ ১২টি। তারপর দুই দেশ শ্রীলংকা ৫ ও পাকিস্তানের ৪ স্বর্ণ পদক।

বাংলাদেশের দখলে চার স্বর্ণ : নেপালের কাঠমান্ডুতে চলমান এসএ গেমসে বাংলাদেশকে প্রথম স্বর্ণ উপহার দিয়েছেন দিপু চাকমা। গত সোমবার তায়কোয়ান্দো ডিসিপ্লিনে ছেলেদের একক পুমসায় ঊর্ধ্ব-২৯ শ্রেণিতে ভারতের প্রতিযোগীকে হারিয়ে সোনার হাসি হাসেন রাঙ্গামাটির দিপু।

সেই সঙ্গে স্বর্ণের তালিকায়ও নাম উঠে বাংলাদেশের। স্বর্ণ জেতার পথে দিপু চাকমার স্কোর ছিলো ১৬.২৪। তিনি পরাজিত করেন শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের প্রতিযোগীদের।

এমন অর্জনের পর প্রতিক্রিয়ায় দিপু বলেন, ‘আমি এখনো ঘোরের মধ্যে আছি। বিশ্বাস করতে পারছি না যে, স্বর্ণ জিতেছি। অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’ গতকাল আসরের তৃতীয় দিন সকালে কারাতে ডিসিপ্লিনের কুমি ইভেন্টে সেরার মুকুট জিতে নিয়েছেন আল আমিন। পুরুষ এককে অনূর্ধ্ব-৬০ কেজি ওজন শ্রেণিতে স্বর্ণ জিতেছেন আল আমিন। এই অ্যাথলেট ফাইনালে পাকিস্তানের জাফরকে ৭-৩ পয়েন্টে হারিয়েছেন।

দারুণ প্রাপ্তির পর প্রতিক্রিয়ায় আল-আমিন বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে যেহেতু দ্বিতীয় স্বর্ণ পদক এনে দিতে পেরেছি, তাই আমি খুব গর্বিত। নিজের চেষ্টা দিয়ে বাংলাদেশকে আমি কিছু এনে দিতে পেরেছি। বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা সবার উপরে তুলতে পেরে আমি ভীষণ গর্বিত অনুভব করছি।’

কাঠমান্ডুতে এশিয়ান গেমসে দেশের তৃতীয় স্বর্ণ জিতেছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড় মারজানা আক্তার পিয়া। এসএ গেমসে দেশের পক্ষে তৃতীয় সোনার পদক আসে মেয়েদের কারাতে ইভেন্টে। মেয়েদের অনূর্ধ্ব-৫৫ কেজি কুমি ইভেন্টে সোনা জিতেছেন মারজানা।

সোনা জয়ের লড়াইয়ে ফাইনালে পাকিস্তানের কায়সার সানাকে ৪-৩ পয়েন্টে হারিয়েছেন মারজানা। তার আগে ২-১ পয়েন্টে নেপালের মানিশ চৌধুরীকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশকে প্রথম পদক এনে দিয়েছিলেন হুমায়রা আক্তার অন্তরা। তবে সেটি ছিলো ব্রোঞ্জ। কারাতের একক ইভেন্টে তৃতীয় হয়ে ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি। গতকাল অন্তরা জিতলেন স্বর্ণপদক। কারাতে ৬১ কেজি কুমিতে স্বর্ণ জেতেন অন্তরা। নেপালের অনু গুরুংকে ৫-২ পয়েন্টে হারান তিনি।

লাল-সবুজদের তিন রুপা : এসএ গেমসের ১৩তম আসরে বাংলাদেশকে প্রথম পদক উপহার দিলেন হোমায়রা আক্তার অন্তরা। গত সোমবার কারাতে ডিসিপ্লিনে মেয়েদের একক কাতায় পাঁচজন প্রতিযোগীর মধ্যে তৃতীয় হয়ে বাংলাদেশকে এই সম্মান এনে দিলেন তিনি।

হোমায়রা বলেন, ‘বাংলাদেশকে প্রথম পদক উপহার দেয়ায় ভালো লাগছে, তবে সর্বোচ্চ সম্মাননা এনে দিতে পারলে বেশি ভালো লাগতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আরও বেশি কিছু আশা করছিলাম। তবে আমার মূল লক্ষ্য কুমিটে। সমপ্রতি উইলস লিটিল ফ্লাওয়ার উচ্চবিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন অন্তরা। ইভেন্টটিতে সোনা জিতেছে পাকিস্তান, রুপা নেপাল।

অন্যদিকে, আশানুরূপ ফলাফল দেখাতে পারেননি দেশের অন্যতম কারাতে খেলোয়াড় মোহাম্মদ হাসান খান। মোস্তফা কামালের পর বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় রুপা জিতেছেন মাউনজেরা বন্যা। সোমবার কারাতে ডিসিপ্লিনে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-৪৫ কেজি ওজন শ্রেণির ব্যক্তিগত কুমিতে তিনি রুপা জিতেন। আর সোনা জিতেছেন নেপালের কুসুম খাদকা।

ফাইনালে বন্যা ৩-২ ব্যবধানে হেরে যান খাদকার কাছে। এর আগে ছেলেদের কারাতের ব্যক্তিগত কুমিতে অনূর্ধ্ব-৫৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে বাংলাদেশকে প্রথম রুপা এনে দেন মোস্তফা কামাল। দুর্দান্ত লড়াই করেও শেষ মুহূর্তে হেরে যাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন বন্যা। এসএ গেমসে ২০১০ সালে স্বর্ণজয়ী বন্যার বোন বিপাশা আক্তারকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদেন তিনি।

কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘খুবই খারাপ লাগছে। যদিও কাউকে বলিনি, কিন্তু আমি সোনার জন্যই খেলেছি। কিভাবে লড়াই করেছি দেখেছেন। ম্যাটে কী হয়েছে সেটাও দেখেছেন। এবার পারিনি। ইনশাআল্লাহ সামনে আরো শক্তভাবে ফিরে আসব।’ বন্যা চারবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন।

তিনি ২০১১, ২০১৫, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-৪৫ ও অনূর্ধ্ব-৫০ কেজিতে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ জিতেন। এবারই প্রথম এসেছিলেন এসএ গেমসে খেলতে। চেয়েছিলেন সোনা জিতে নিজের অভিষেক রাঙাতে। সেটার খুব কাছাকাছিও গিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাগতিকদের দাপট আর সুবিধা নেয়ার কারণে সেটা হয়নি।

নেপালে সালমাদের দাপট, জামাল ভূঁইয়াদের হার : এসএ গেমসে জয়ে স্বর্ণ জয়ের মিশন শুরু করলো বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। গত ২ ডিসেম্বর নিজেদের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে সাত উইকেটে হারিয়ে শুভ সূচনা করেছে তারা।

গতকাল হিমালয় কন্যা নেপালের পোখারায় টস জিতে আগে ব্যাট করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ছয় উইকেটে ১২২ রান করেন লঙ্কানরা। তাদের হয়ে ওপেনার উমেষা থিমাসিনি ৪৯ বলে ৫ চার ও ৪ ছক্কায় করেন সর্বোচ্চ ৫৬ রান।

ওয়ানডাউনে নামা দলপতি হার্শিথা মাধবী ৩০ বলে করেন ৩৩ রান। এছাড়া আর কারো ব্যাট থেকে সেরকম রান আসেনি। বল হাতে বাংলাদেশের হয়ে দারুণ পারফর্ম করেন নাহিদা আক্তার। চার ওভারে ৩২ রান খরচায় তুলে নেন চার উইকেট। তাকে সমর্থন জোগানো দলীয় অধিনায়ক সালমা খাতুন উইকেট না পেলেও শ্রীলঙ্কা ব্যাটারদের চেপে ধরেন। ৪ ওভারে দেন মাত্র ১৩ রান।

পরে ব্যাট হাতে দলকে জয়ের পথ দেখিয়েছেন আয়েশা রহমান, ফারজানা হক ও সানজিদা ইসলাম। ফলে ১৮.৩ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। ওপেনার আয়েশা ৩৫ বলে ২ চার ও এক ছক্কায় ২৯ রান করে বিদায় নেন।

তবে জয় নিয়ে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়েন ফারজানা-সানজিদা। ১৮ বলে ২৩ রান করে অপরাজিত থাকেন ফারজানা। অপর প্রান্তে ৪৫ বলে আট বাউন্ডারিতে হার না মানা সর্বোচ্চ ৫১ রান করেন সানজিদা। তাদের ব্যাটে আরামসে জয়ের বন্দরে নোঙর করে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে গত মাসে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের আগে ভুটানের বিপক্ষে দুটি প্রীতিম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ। দুটি ম্যাচেই জিতেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। কিন্তু এসএ গেমসের শুরুতেই সেই ভুটানের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু করলো বাংলাদেশ। ২ ডিসেম্বর নিজেদের মাটিতে গত দুই ম্যাচে ৪-১ ও ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল জেমি ডের দল।

এবার জেমি ডে অনূর্ধ্ব-২৩ দল নিয়ে গেছেন নেপালে। কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে গতকাল ১৩তম আসরে জীবন-জামাল-সাদরা ১-০ গোলে হেরেছে। ফলে, পরাজয় দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে ছেলেদের ফুটবলে যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ। ম্যাচের ৬৫তম মিনিটে ভুটানের ফরোয়ার্ড চেনচো গাইয়েলতসেন বাংলাদেশের জালে বল জড়ান।

১৯৯৯ সালে প্রথম এবং ২০১০ সালে দ্বিতীয় ও সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। এবার ভারত অংশগ্রহণ না করায় আরেকবার সোনা জয়ের স্বপ্ন দেখছে লাল-সবুজরা।

কিন্তু, গতবার ব্রোঞ্জ জেতা দলটির শুরু হলো পরাজয় দিয়ে। রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতির এই প্রতিযোগিতায় আজ মালদ্বীপের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর