বিএনপি নেতাদের মুখে আন্দোলনের কথা!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |   ০১:২১, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

  • খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ‘অবিকৃত’ প্রতিবেদন দাবি আব্বাসের
  • রেডি-স্টার্ট পর্ব শেষ, এখন গো বলার পালা, বললেন আলাল
  • আইনের ওপর আস্থা রেখে বসে থাকবো: ঘোষণা মোশাররফের
  • খালেদার মুক্তির জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে: জানালেন রিজভী
  • ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় ও বিভাগীয় শহরে শোভাযাত্রার ঘোষণা

আগামী ৫ তারিখ বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এটিকে কেন্দ্র করে হঠাৎ ঘরোয়া কর্মসূচি থেকে সরকারকে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির নেতারাসহ মধ্যম সারির নেতারাও রাজধানীতে নানান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আন্দোলনের বার্তা দিচ্ছেন।

সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এর আগে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও নেতাকর্মীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন।

এছাড়া সমপ্রতি বাজারে অস্থিরতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় ও বিভাগীয় শহরে শোভাযাত্রা করার ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকায় আরও বড় কর্মসূচি দেয়ারও ইঙ্গিত দেন।

এছাড়া গত শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকেও চলতি মাসে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের দুর্নীতির বিষয় নিয়ে সেমিনার, চুক্তি বিষয়ে জানতে জবাব চেয়ে চিঠি, দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে প্রেস কনফারেন্স, বিদেশি নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের প্রতিবাদ, ভারতীয় নাগরিকদের এদেশে পাঠানোর বিষয় নিয়ে প্রেস কনফারেন্স, নির্বাচন কমিশনের দুর্নীতি নিয়ে তদন্তের দাবি করেন।

তবে দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্য, আগামী ৫ তারিখ খালেদা জিয়ার মামলা খারিজ হয়ে গেলে চলতি মাসে বড় ধরনের আন্দোলনের কথা চিন্তা করছে দলটি। এক দফা আন্দোলনের ঘোষণাও আসতে পারে বলে দলটির বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

গত সোমবার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সঠিক চিত্র তুলে ধরার দাবি জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, আগামী ৫ তারিখ বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে উপস্থাপন করা হবে। আমরা চাই এই প্রতিবেদন যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় উপস্থাপন করা হোক। অবিকৃত অবস্থায় উপস্থাপন করা হোক। পরিবর্তন যেন না করা হয়। তাহলে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ, তার সাথে এখন আর দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। সন্দেহ হচ্ছে, তাকে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করা হচ্ছে কি না, ক্ষতি করার জন্য। খালেদা জিয়ার ক্ষতি হলে তার হিসাব জনগণ পাই পাই করে নেবেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘আন্দোলন বিএনপি করার আগেই তো আপনারা ভয় পেয়ে গেছেন। কখন কি হবে বুঝতে পারছেন না?’

বিএনপির কর্মীদের গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই মন্তব্য করে আব্বাস বলেন, ‘আমাদের আলাল সাহেব (মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল) তথ্য দিলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখন মামলার সংখ্যা ২৬ লাখ নয়, ৩৫ লাখ। অর্থাৎ আমাদের ৩৫ লাখ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। তাদের বাবা-মা, ভাই-বোনরাও রয়েছেন। সুতরাং আওয়ামী লীগের সতর্ক হওয়া উচিত। বাংলাদেশের কোটি কোটি বিএনপির সমর্থক এবং জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে।’

আন্দোলনের নামে অরাজনৈতিকভাবে সহিংসতার পথে গেলে বিএনপিকে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে— আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের জবাবে বিএনপির এই নীতিনির্ধারক বলেন, বিএনপি আন্দোলন করার আগেই তো আপনারা ভয় পেয়ে গেছেন, গ্রেপ্তার করা শুরু করে দিয়েছেন। আপনারা যে দাঁতভাঙা জবাব দেবেন আপনাদের কি কামড় দেয়ার সেই দাঁতগুলো আছে? আমি চ্যালেঞ্জ করে বলে দিতে চাই— আওয়ামী লীগের ছোট্ট একটি মটরশুটি কামড় দেয়ার যোগ্যতাও নাই এখন।

মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পেটোয়াবাহিনী পুলিশ-র্যাব-বিজিবি ছাড়া এক মিনিটও ক্ষমতায় থাকার ক্ষমতা নেই তাদের। পেটোয়াবাহিনী দিয়ে ক্ষমতায় থাকার ক্ষমতাও ফুরিয়ে আসছে। অতএব বেশি কথা বলা ঠিক নয় কাদের সাহেব। গ্রেপ্তারের ভয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা গর্তে লুকিয়ে থাকে না। আমাদের ভয়ের কিছু নাই।’

দল দিয়ে দলের ইমেজে টিকে থাকবে সেই আওয়ামী লীগ এখন আর নেই। শেখ মুজিবের আমলে যে আওয়ামী ছিল সেই আওয়ামী লীগের কথা এখন আপনারা ভুলে যান, সেই আওয়ামী লীগকে আপনারা অনেক আগেই কবর দিয়ে দিয়েছেন। সেই আওয়ামী লীগকে আজকের আওয়ামী লীগ খেয়ে ফেলেছে।

এছাড়া দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক যুবদল সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, দৌড় প্রতিযোগিতায় যেমন রেডির পরে স্টার্ট বলা হয় এবং গো বলার পর যেমন সবাই একযোগে দৌড় দেয় তেমনই আমাদের আন্দোলনের রেডি, স্টাড পর্ব শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু গো বলার পালা। গো বললেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একযোগে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কখন আন্দোলন হবে এই দায়িত্বটা স্থায়ী কমিটি ও ভাইস চেয়ারম্যানদের ওপর ছেড়ে দিয়ে আপনারা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিন। কারণ যেকোনো মুহূর্তে ‘গো’ বলা হবে। যখনই ‘গো’ বলা হবে তখনই আপনারা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে আনবেন।

মনে রাখবেন— এই সরকারের পতনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। পুরো বাংলাদেশটাই আজ কারাগার— মন্তব্য করে আলাল বলেন, মুক্ত করা দরকার বাংলাদেশকে। কারণ পুরো বাংলাদেশটাই আজ কারাগারে পরিণত হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া একটি নির্দিষ্ট কারাগারে, আকন কুদ্দুস একটি ছোট কারাগারে আর সারা দেশের জনগণ বাংলাদেশ নামক একটি বৃহৎ কারাগারে বন্দি হয়ে আছে।

এসি রুমের মধ্যে আলোচনা সভা করে কোনো সফলতা আসবে না উল্লেখ করে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা কি বিভাগীয় শহরে জনসভা করিনি? বিনা অনুমতিতে কার্যালয়ের সামনে জনসভা করিনি? তাহলে এ ধরনের কথা কেন? আন্দোলনে ঐক্যমত আর কমিটি গঠনের সময় নিজের মতো- এই জায়গা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। আন্দোলনে সফল হতে হলে নেতৃত্ব গঠনের সময় ঐক্যমত হতে হবে। দুই দিকে বিচরণ করলে কোনো সফলতা আসবে না।

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, এই সরকার দেশটাকে যে জায়গায় নিয়ে গেছে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে শুধু বিএনপির লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী নয়, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে দেশের সব জনগণকে। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কীসের এত হতাশা? সব হতাশা কাটিয়ে আন্দোলনে সফল হতে হবে।

হামলা-মামলা, গুম-খুন-নির্যাতন-ধর্ষণ এমন কোনো অত্যাচার নাই যা আমাদের ওপরে আসেনি। তারপরও হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আদেশের জন্য আগামী ৫ ডিসেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।

এ ব্যাপারে আলাল বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কীসের ৫ ডিসেম্বর, পারলে এখনই মুক্তি চাই আমরা। তারিখ দিয়ে আন্দোলন হয় না। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসা বঞ্চিত না করে এবং তাকে আর কষ্ট না দিয়ে অবিলম্বে মুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে রিজভী বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করে বিনা চিকিৎসায় আপনি অমানবিক কষ্ট দিচ্ছেন, বেগম জিয়ার প্রতি এই নিষ্ঠুরতা বিশ্বের স্বৈরশাসকরা যে আচরণ করে সেই আচরণেরই সমতুল্য। দেশনেত্রীকে আর কষ্ট না দিয়ে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিন। আপনি জনগণের পুঞ্জিভূত ক্রোধ আঁচ করতে পারছেন না বলেই বেগম জিয়াকে মুক্তি না দিয়ে তাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করার চেষ্টায় উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু আপনার নেতৃত্বে পরিচালিত ফ্যাসিবাদী সরকারের লোহার খাঁচা ভেঙে দেশনেত্রীকে মুক্ত করার জন্য জনগণ এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে রাজধানীতে এক বিক্ষোভ মিছিল শেষে পথসভায় দেয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন রিজভী। মিছিলটি ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

বিক্ষোভ মিছিলে ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু আশফাক, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান সুমন, পশ্চিম ছাত্রদল নেতা কামরুজ্জামান জুয়েল এবং যুবদল নেতা সোহেলসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন।

রিজভী বলেন, সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— পৃথিবীর অতীত ইতিহাস ভুলে যাবেন না, কোনো স্বৈরাচারী শাসক এভাবে দেশে দুঃশাসন চালু রেখে জনগণের রোষানল থেকে রেহাই পায়নি। যুগে যুগে বিশ্বে স্বৈরশাসকদের পতনের মতো আপনাদেরও যেকোনো মুহূর্তে পতনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি আবারো অবিলম্বে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।

এর আগে দলের জ্যেষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আইনের ওপর আস্থা রেখে এক বছর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছি। আগামী ৫ তারিখ খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে আর আইনের ওপর আস্থা রেখে বসে থাকবো না।

তিনি বলেন, ৮০ ভাগ মানুষ খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়। এক দফার আন্দোলন ছাড়া, সরকার পতনের আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না।

বিএনপির এই নেতা বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের ব্যাপারে উচ্চ আদালত তার স্বাস্থ্যের সার্টিফিকেট চেয়েছে। আমি আশা করবো যারা বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন তারা নৈতিক দিক থেকে সঠিক রিপোর্টে পেশ করবেন। আর যদি না করেন তাহলে ভাববো দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসার নৈতিকতা ধরে রাখতে পারছে না। মানুষ তাদের আর বিশ্বাস করবে না। এছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর