বেসামাল পেঁয়াজে নাজেহাল টিসিবি

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী   |   ০১:৩০, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে পেঁয়াজের ঝাঁঝে নাকাল ভোক্তারা। ভারত রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করার পরদিন থেকেই দেশের বাজারে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। কয়েকদিনের মধ্যেই সেই দাম সেঞ্চুরি হাকিয়ে ডাবল সেঞ্চুরিও ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থায় পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়।

তারই অংশ হিসেবে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ- টিসিবির মাধ্যমে খোলা ট্রাকে করে ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় টিসিবির সরবরাহ ও বিক্রির পরিমাণ এতোই কম যে, তা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। উল্টো পেঁয়াজ নিয়ে নাজেহাল হতে হচ্ছে সংস্থাটিকে।

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৫টি ট্রাকে করে টিসিবি রাজধানীতে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। প্রতিটি ট্রাকে এক টন বা এক হাজার কেজি করে পেঁয়াজ দেয়া হয়। প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ধরা হয় ৪৫ টাকা। আর একজন ক্রেতা একবারে ২ কেজির বেশি পেঁয়াজ কিনতে পারবে না বলে জানানো হয়।

এর এক সপ্তাহ পর ২৩ সেপ্টম্বর ট্রাকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫টি থেকে ১০টি করা হয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করার পরদিন অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রাকের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ৩৫টি করা হয়। এই সময়ে খোলা বাজারে পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা কেজির ওপরে ছিলো।

কিন্তু নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হঠাৎ করে একলাফে পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা কেজির ওপরে উঠে যায়। এ অবস্থায় রাজধানীতে টিসিবির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হয়। ২০ নভেম্বরের পর থেকে রাজধানীর ৫০টি স্থানে খোলা ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে টিসিবি। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকার ৫৭টি স্থানে যায় টিসিবির পেঁয়াজের ট্রাক।

তবে সময়ের পরিবর্তনে টিসিবি তাদের বিক্রির পরিমাণ বাড়ালেও তা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। এখনো খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দামও ২০০ টাকা কেজির আশপাশেই অবস্থান করছে।

জানা গেছে, টিসিবি ৪৫ টাকা কেজি দরে ভোক্তাদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করলেও সংস্থাটি বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই দাম দিয়ে পেঁয়াজ কেনে। ফলে এক্ষেত্রে সরকারকে প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি কেজি পেঁয়াজে এই সময়ে সরকারকে ১০০ টাকার কাছাকাছি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু রাজধানীতেই প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন পেঁয়াজ বিক্রি করেছে টিসিবি।

সেক্ষেত্রে ঢাকাতেই সরকারের পেঁয়াজে ভর্তুকি গেছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা। এর বাইরে দেশের সবগুলো বিভাগীয় শহর ও বেশকিছু জেলা শহরেও খোলা ট্রাকে করে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে টিসিবি। ফলে গত আড়াই মাসে শুধু পেঁয়াজেই সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

সরকার ভর্তুকি দিয়ে ভোক্তাদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করলেও সেটা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ও উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে।

জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৪ লাখ টনের মতো পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে দেশে উৎপাদন হয় ১৮ থেকে ২০ লাখ টনের মতো। সঠিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করতে না পারায় ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়।

ফলে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ টনের মতো পেঁয়াজের ঘাটতি তৈরি হয়। আমদানি করে সেই ঘাটতি পূরণ করে সরকার। সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ আমদানির জন্য প্রায় এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। সেই ভারতই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে, টিসিবি তা সরবরাহ করতে পারছে না। সেটা সম্ভবও নয়। তাছাড়া তারা শুধু ঢাকা শহরের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম চালায়। যদিও সম্প্রতি টিসিবি বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে, তবে তাও পর্যাপ্ত নয়।

তিনি বলেন, পেঁয়াজ নিয়ে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, স্মরণকালের মধ্যে আর তেমনটি দেখা যায়নি। এবারের এ ঘটনা থেকে সরকারকে শিক্ষা নিতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমস্যা সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায় না। হয়তো আপাতত কিছুটা প্রশমন করা যায়। যদিও এবার পেঁয়াজের সমস্যা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। এটা তাদের ব্যর্থতা।

ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি আর যেন তৈরি না হয়, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক হিসাব রাখতে হবে। সেই অনুযায়ী ঘাটতি মেটাতে আমদানির জন্য একাধিক উৎস প্রস্তুত রাখতে হবে। কিছুতেই এককভাবে কোনো দেশের ওপর আর নির্ভর করা যাবে না।

এ বিষয়ে টিসিবির মুখপাত্র মো. হুমায়ূন কবির দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ার আগে থেকেই টিসিবি ঢাকা শহরে ট্রাকে করে বিক্রি শুরু করে। দাম বাড়ার সাথে সাথে এর পরিধি ক্রমাগত বাড়ানো হয়েছে। ৫টি ট্রাক থেকে বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়েছে। গত সোমবার ঢাকার ৫৭টি স্থানে টিসিবির ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে।

এছাড়া বর্তমানে ঢাকার বাইরেও প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এবং কিছু জেলা শহরেও টিসিবি খোলা ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। টিসিবি চেষ্টা করে যাচ্ছে ভোক্তাদের চাহিদা পূরণে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর