‘আমার বুক ও যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দিয়েছে’

প্রিন্ট সংস্করণ॥ শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   |   ০১:৪০, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে গিয়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা মৌলভীবাজারের এক তরুণী সরকারের কাছে বিচার চেয়েছেন। ২২ বছর বয়সি ওই তরুণীর বাড়ি কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ৯ নম্বর ইসলামপুর ইউনিয়নে।

গত ২৬ নভেম্বর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর ২৮ নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টায় শ্রীমঙ্গলের ‘মুক্তি মেডিকেয়ার’ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা অসামপ্ত রেখেই রোববার তাকে বাড়ি নিয়ে যায় স্বজনরা।

ওই হাসপাতালের ম্যানেজার পংকজ জানান, মেয়েটির যৌনাঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ক্ষতগুলো সারতে সময় লাগবে।

নির্যাতনের ফলে ওই তরুণী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন জানিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক সাধন চন্দ্র ঘোষ বলেন, মাঝে মধ্যে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আবোল-তাবোল বকছে। দ্রুত তাকে মানসিক চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন।

মেয়েটির মা জানান, সরকারের সহায়তায় গত ২৬ নভেম্বর দেশে ফিরিয়ে আনা হয় মেয়েকে। বাড়ি ফেরার পর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় সে। তখন তাকে শ্রীমঙ্গল মুক্তি মেডিকেয়ারে ভর্তি করা হয়।

তিনি বলেন, আমার ভালো মেয়ে বিদেশ থেকে এসেছে আধমরা হয়ে। টাকা রোজগারের আশায় গেলো, একটি টাকাও ওকে দেয়া হয়নি। মুক্তি মেডিকেয়ারে চিকিৎসা নেয়া তরুণী সৌদি আরবে নির্যাতনের ভয়ঙ্কর বিবরণ দেন। বিয়ের সাত মাসের মাথায় স্থানীয় আদম ব্যাপারী মোস্তফা কামালের প্রলোভনে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। তখন তাকে গৃহকর্মীর কাজ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু দাম্মামে পৌঁছানোর পর একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, চার লাখ টাকায় তাকে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। যৌনকর্মে রাজি না হলে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। একটি অফিসে রেখে প্রতিদিন কয়েকজন পালাক্রমে ধর্ষণ চালাতো।

তার ভাষ্য, জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে আমার বুক, স্পর্শকাতর জায়গা ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে। তার দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে হাত-পা ও উরুতে জখম করে দিয়েছে। দলবেঁধে চার-পাঁচজন মিলে ধর্ষণ করতো, তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম।

অসুস্থ হয়ে পড়ায় একসময় সৌদি আরবের পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। সে সময় গোপনে তিনি আহত হওয়ার ছবি দেশে পাঠান। তার দিনমজুর স্বামী বিষয়টি তাকে সৌদি পাঠানো দালাল মোস্তফাকে জানালে ‘মিথ্যা কথা’ বলে উড়িয়ে দেন।

নির্যাতিতার স্বামী বিষয়টি পুলিশ ও সাংবাদিকদের জানাবে বললে মোস্তফা দাবি করেন, যে বাড়িতে কাজ পেয়েছিল, সেখান থেকে দুই হাজার ২০০ রিয়াল নিয়ে পালিয়ে গেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হন রুবিনা আক্তারের স্বামী। প্রশাসনের তৎপরতায় ছয় মাস ২৬ দিন পর দেশে ফেরেন।

এখনো অনেক বিপদগ্রস্ত নারী সৌদি আরবে রয়ে গেছেন জানিয়ে তাদের উদ্ধার করার জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে ওই চক্রের হোতাদের শাস্তি দাবি করেন।

তরুণীর স্বামী জানান, বাঁশের কাজ করে অভাব অনটনে কোনোমতে তাদের সংসার চলছিল। মোস্তফা তখন তার স্ত্রীকে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। তাতে প্রথমে রাজি না হলেও পরে অন্য দালাল দিয়ে প্রচুর টাকা আয়ের লোভ দেখায়।

বলা হয়, মোস্তফা নিজের মেয়ে পরিচয়ে তাকে বিদেশে পাঠাবে, সেখানে সে যত্নে থাকবে, পাসপোর্ট-ভিসা সব করে দেয়া হবে, কোনো টাকা লাগবে না। এতসব প্রলোভনে রাজি হয়ে যান তরুণী আর তার স্বামী।

বিদেশ যাওয়ার পরপরই মেয়েটির ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু হয় জানিয়ে তার স্বামী বলেন, প্রথম কয়েকদিন যোগাযোগ করলেও পরে আর তার স্ত্রী যোগাযোগ করতে পারেননি। পরে এক সৌদি প্রবাসী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আমার স্ত্রীকে নির্যাতনের খবর দেয়। সঙ্গে নির্যাতনের ছবি আর ভিডিও পাঠায়।

তিনি তখন স্থানীয় এক সাংবাদিককে ঘটনাটি জানান। তার মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি পাঠায় জেলা প্রশাসকের কাছে।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সাংবাদিকরা মোস্তফা কামালের বাড়িতে গেলে তাদের বলা হয়, মোস্তফা ‘বাড়িতে নেই’। পরে মোবাইলে ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে অর্থাভাবে ওই তরুণীকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরিয়ে নেয়ার কথা জানানো হলে কমলগঞ্জের উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল হক গতকাল বলেন, আজকের (সোমবার) মধ্যেই তিনি মেয়েটির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ব্যবস্থা নেবেন।

সেই সঙ্গে মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের ডেকে মামলা করার উদ্যোগ নেয়া হবে জানিয়ে ইউএনও বলেন, বিচার না হলে এসব ঘটনা বাড়তেই থাকবে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর