আলেমসমাজের ভূমিকা ও করণীয় প্রসঙ্গে

প্রিন্ট সংস্করণ॥নূরুল আমিন চৌধুরী   |   ০২:০৫, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

নবীশ্রেষ্ঠ বিশ্বনবী হজরত মুহম্মদ (সা.)’র প্রতি যথাযথ সন্মান জ্ঞাপনপূর্বক দেশের আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে পরিচিত আমাদের বাংলাদেশের পূর্বাপর সার্বিক অবস্থা বিবেচনা সাপেক্ষে আমি এ লেখাটা লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছি।

অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, ইতোমধ্যে আমাদের দেশটা সার্বিক দিক দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার কারণে দেশের সরকার প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিবাজদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কঠোর ঘোষণার মাধ্যমে দেশব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান চালাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

ন্যায়-নীতি, সততা, সাম্য-মৈত্রী ও ইনসাফ এর ধর্ম ইসলামের অনুসারী মেজরিটি মুসলমানের দেশে এমনতো হওয়ার কথা নয়। যদি এমন হতো যে, দুর্নীতিবাজদের মধ্যে কেউই মুসলমান নয়, তাহলে সেটা হতো ভিন্ন কথা। হিসেবে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতি ও অসততার সঙ্গে জড়িত।

এমনকি আলেমদের মধ্যকার অনেকেই কেবল যে দুর্নীতি ও অসততার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবেই নয়, সরাসরিই সম্পৃক্ত। মসজিদ-মাদ্রাসার আলেমদের অনেকেই প্রতিষ্ঠানের তহবিল তসরুপ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প বা সরকারের অর্থ আত্মসাৎ, নারী ধর্ষণ, ছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো বিভিন্ন অঘটন ঘটিয়ে রীতিমতো বিস্ময়কর চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে অনেকে সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়ে গোটা আলেম সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়াসহ আলেম সমাজের প্রতি মানুষের চিরাচরিত ভক্তি-শ্রদ্ধাকেও ভুলুণ্ঠিত করে দিচ্ছে।

এতে সাধারণ মানুষ আরো বেশি বেশি অসততা, দুর্নীতি, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি অপরাধ কর্মগুলোকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ ধরণের মানুষদের মধ্যে নিশ্চয় এমন একটা বেয়াকুবি বোধ কাজ করে এই ভেবে যে, জাগতিক জীবনে বৈধ-অবৈধ, ভালো-মন্দ যা কিছুই করিনা কেন, তৌবা-তাওবা করলে, নামাজ-কালাম পড়লে, হজ্জ করলে, যাকাত দিলে এবং দান-খয়রাত করলে নিশ্চয়ই আল্লাহ যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন এবং এভাবে পার পেয়ে পরজগতে বেহেস্তবাসী হতে পারবে।

আসলে ব্যাপারটা কি এতোই সহজ? সাধারণত এ ধরণের বিভ্রান্তিকর কথাগুলো কুরআন-হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে বেশিভাগ ক্ষেত্রে আলেমরাই প্রচার করে এসেছেন এবং এখনো করে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়টা হলো এ ধরণের অর্বাচিনরা এটা ভাবেনা যে, তারা যা জেনে আসছে এবং যা চিন্তা করছে সেটা তাদেরকে জাহান্নামের কোন্ অতলে নিয়ে যাবে সেটাতো পরের কথা, এ জগতেই এসব অবিবেচক অমানুষদের জন্যে যে কী করুণ পরিণতি অপেক্ষমান থাকে তা এদের মতো অনেকেই সময় মতো সেটা কেবল যে নিজেরাই প্রত্যক্ষ করে এমন নয়, জগতের মানুষও প্রত্যক্ষ করে।

এখানে এ বিষয়ে কোনো বিশেষ ঘটনা বা ব্যক্তি বিশেষের নামোল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। আমার আজকের লেখার শিরোনাম অনুযায়ী এবার আমি আমার জীবনের যাবতীয় শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে অতি সংক্ষেপে আমাদের দেশের পূর্বাপর সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপট ও আলেম সমাজের ভূমিকা ও করণীয় সম্পর্কিত কিছু বিষয় উল্লেখ করছি: ১. প্রথমে অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটের বিষয়টাই তুলে ধরছি- আধিপত্যবাদি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ-ভারত সরকারের আমলে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতবর্ষে একচেটিয়াভাবে ইংরেজি ভাষার ব্যবহারের প্রচলন করে।

এর পূর্বে মুসলমান শাসকদের শাসনামলে ভারতের রাজভাষা ছিলো ফার্সি। তাই ভারতের আলেমরা ফার্সি ও আরবী ভাষাই চর্চা করত। আর স্থানীয় পর্যায়ে বিশাল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লোকরা তাদের নিজস্ব ভাষাই চর্চা করত। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে পুরোপুরি রাষ্ট্রভাষা না হলেও কোর্ট-কাচারিসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তাদের সুবিধার্থেই ইংরেজি ভাষাকে সাধারণ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করা হয়।

কিন্তু তখনকার আলেমরা মুসলমানদের জন্যে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করা ‘কাট্টা হরাম’ বলে ফতুয়া জারি করার ফলে ধর্মান্ধ বেশিরভাগ মুসলমানই ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করে। এই একটিমাত্র কারণে ভারতবর্ষের মুসলমানদের যে ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল, তার জন্যে ভারতের মুসলমানদের প্রচুর খেসারত দেওয়াসহ জাতি হিসেবে তাদের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে অন্যান্য জাতি ইংরেজি শিক্ষা লাভ করে ইংরেজ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কাজকর্ম জুটিয়ে, বিভিন্ন দিক থেকে শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থে-সম্পদে, পজিশনে মুসলমানদের পেছনে ফেলে সব দিক থেকে লাভবান হওয়াসহ প্রভূত উন্নতি লাভ করে।

আর মুসলমানরা যাবতীয় অগ্রগতি থেকে পেছনে পড়ে থেকে নিদারুণ দুর্ভোগে নিপতিত হয়েছিল। ঐ দুর্ভোগ থেকে বের হয়ে আসা যখন কষ্টকর হয়ে ওঠে, তখন মুসলিমপ্রেমী কয়েকজন মণীষী মুসলমানদেরকে এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্গত অবস্থা থেকে বের করে আনার জন্যে প্রাণপণ উদ্যোগ গ্রহণ করলে ঐ সময়কার আলেমরা তাতে শত বাধা প্রদানের চেষ্টা করার পরও কিছু মুসলমান ইংরেজি চর্চায় উদ্বুদ্ধ হলে ধীরে ধীরে এর হার বাড়তে থাকে। এতো দিনে যে ক্ষতিটা হয়ে গেছে তার জের আজ পর্যন্ত চলে আসছে।

২. এবার আসছি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটের দিকে। পাকিস্তান আমলে মুসলিম দেশের পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলিম সরকার ও শাসকদের বাংলাদেশিদের প্রতি অনৈতিক বিমাতাসুলভ ও অমুসলিমসুলভ আচরণ ও ক্রিয়াকলাপের ফলশ্রুতিতে যখন পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাদ-প্রতিবাদের শেষ পর্যায়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানের শাসন-শোষণের কবল থেকে পূর্ব পাকিস্তান নামক বাংলা দেশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করতে চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতির পিতা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়, তখন এদেশেরই আলেম সমাজের একাংশ এর ঘোর বিরোধিতা করে, পাকিস্তানিদের শত সাহায্য-সহযোগিতা করেও এদেশের মুক্তি আন্দোলনকে রুখতে পারেনি।

কিন্তু এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশের মধ্যে জাতীয়তাবোধ সম্পর্কিত একটা রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি হয়। জাতির পিতার অনাকাঙ্খিত দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকাণ্ডজণিত অকাল মৃত্যুতে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ও প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটা বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক অবস্থাসহ মারাত্মক প্রশাসনিক ঝুঁকিতে পতিত হয়েছিল। এর পরপরই পাকিস্তানি সামরিক শাসনের আদলে জাতি আবার দু-দুবার দেশি সামরিক শাসনের কবলে পতিত হয়েছিল।

এর পর অনেক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে নামে গণতান্ত্রিক সিভিল সরকার গঠিত হলেও দেশের মানুষের মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এক ধরণের মানসিক প্রবণতা সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রকট হয়ে ওঠার একটা পর্যায়ে ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের কাল রাত্রিতে পুরো পরিবারসহ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সময় অতি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যার মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতা বড় কন্যা শেখ হাসিনা নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর তিরোধানের দীর্ঘ ২১ বছর পর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় এসে চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যেতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এমনই একটা অবস্থায় অসাধু অসৎ লোকদের কারণে উন্নয়ন কর্ম পদে পদে হোচট খাচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে জিরো টলারেন্সমূলক ব্যাপক দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এতে দেশের যেখানে দেশের আলেম সমাজের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত ছিলো, সেই পবিত্র ইসলাম ধর্মের ধারক-বাহক আলেম সমাজের লোকদের চরিত্র ও চালচিত্র যদি এমন কলুষপূর্ণ ও কালিমালিপ্ত প্রতীয়মান হয় তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে ? এই শুদ্ধি অভিযানকে সফল করার কাজে আইনী প্রক্রিয়ার পাশাপাশি যেখানে হুজুররা কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জনসচেতনতা মূলক প্রচার-প্রচারণায় জোর দেবেন, সেখানে তারা তাদের বিভিন্ন ওয়াজ-নসিহতের মধ্যে প্রায়শঃই সরকারের এটা-ওটা নিয়ে সমালোচনা করতেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

আবার সরকারের কাছে তাদের বিভিন্ন প্রকার দাবি-দাওয়া নিয়ে মিটিং-মিছিলও করে থাকে এবং বিভিন্ন কৌশলে সেগুলো আদায় করে নেয়। এভাবে অধিকাংশ ধর্মান্ধ জনগণের দেশে তারা নির্বিঘ্নে অতি সুখেই দিন গুজরান করছে। আমার এ লেখার মাধ্যমে কারো বাড়া ভাতে ছাই দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে কিছু বিষয়ের দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

বিষয়গুলো হচ্ছে ১. প্রতিটি মানুষকে ধর্মান্ধতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের ধর্মীয় শিক্ষা অবগত হয়ে ধর্মচর্চায় মনোযোগী হওয়া উচিত। ২. আলেম নামধারি যেসব হুজুর এমন সব আকাম-কুকামে জড়িত, আমলধারি হাক্কানী আলেমরা যেন এর প্রতিবিধানে নিজেরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় সে ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবেন এই মর্মে সবার প্রতি বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি। হে মহান আল্লাহ ! আমাদের সবার প্রতি সদয় রহমত বর্ষণ করুন।

লেখক : সাবেক কলেজ অধ্যক্ষ, গবেষক ও কলামিস্ট

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর