বিতর্কে স্বাস্থ্যসেবা খসড়া আইন

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান   |   ০১:১৫, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি হলো চিকিৎসা। এ অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। এ খাতের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। কিন্তু সময়োপযোগী আইন না থাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে সরকার দেশের স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১৬ সালে রোগী সুরক্ষা আইন নামে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তিনবছর পর সেটি স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৮ নামে খসড়া আইনটি মন্ত্রিপরিষদে জমা পড়েছে। আইনটি পাস হলে দেশের চিকিৎসা খাতে প্রায় চারদশক পর নতুন কোনো নিয়ম চালু হতে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।

সেই আইনের অসঙ্গতিগুলো কাটিয়ে নতুন এই আইন তৈরি করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এতে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ে উপকৃত হবে। চিকিৎসা খাতে অস্থিরতাও কেটে যাবে। কিন্তু ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে চারদিকে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে।

চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এই আইনের খসড়া তৈরি করেছে আমলারা।

অন্যদিকে সরকারপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো বলছে, তারা চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এই আইনের খসড়া প্রণয়নে পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতের ইতিবাচক প্রতিফল হলো এই খসড়াটি।

তবে অপরপক্ষ বলছে, এখানে চিকিৎসকদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ বলছে, নতুন আইনের খসড়ায় চিকিৎসকদের ছাড় দেয়া হয়েছে। ভুল চিকিৎসায় মারা গেলে চিকিৎসককে আর দায় নিতে হবে না।

অথচ শুরুতে যখন রোগী সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরিতে হাত দেয়া হয় তখন বলা হয়েছিলো, অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা করা যাবে।

কিন্তু বর্তমান খসড়ায় এই অংশটুকু বাদ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে নতুন খসড়া আইনকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে চিকিৎসকরা এই আইন সংশোধনে আদালতের দারস্থ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

তারা বলছেন, এই আইনে রোগী-চিকিৎসককে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রহসন করা হয়েছে। এছাড়াও বিদেশি বিনিয়োগে হাসপাতাল স্থাপন, পরিচালনা ও বিদেশি চিকিৎসকদের নিয়োগের সমালোচনা করেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আইনের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে উভয়পক্ষের সঙ্গে আরও আলাপ-আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা প্রয়োজন, নয়তো এ খাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তবে আইনটি খসড়া তৈরিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ আইন চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করেই করা হয়েছে।

ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এফডিএসআর) উপদেষ্টা ডা. আব্দুন নূর তুষার আমার সংবাদকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে আমাদের বিভিন্ন আপত্তির কথা এই খসড়া প্রণয়নের সাথে সংশ্লিষ্টদের বলতে চেয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের মতামত শুনতে ডাকেনি। তাই আমরা নিজেরাই আপত্তির বিষয়গুলো সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছি।

সেখানে শুধু চিকিৎসক নয়, রোগীর সুরক্ষা নিয়েও কথা বলেছি। যার মধ্যে অন্যতম সেবার মূল্য, চিকিৎসকের ফি নির্ধারণ, চিকিৎসক ও রোগীর নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছি।

ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি ডা. হারুন আল-রশিদ আমার সংবাদকে বলেন, প্রকৃত স্টোকহোল্ডারদের মতামত ছাড়া সরকার স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছে। যাদের পরামর্শে এই আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে তারা সরকারেরই লোক। বলতে পারেন তারা ক্ষমতাসীন সরকারের অঙ্গ সংগঠন। ফলে চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের স্বার্থের বাইরে নিজেদের ইচ্ছেমতো একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব আমার সংবাদকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনটি চূড়ান্ত করার আগে চিকিৎসকদেরও অনেক বলার মতো কথা আছে সেগুলো শুনতে হবে। সেই সাথে জনগণের অধিকার ও সুবিধার কথাও বিবেচনা করতে হবে। নতুন এই আইনটা বিভিন্ন বিষয়কে বিক্ষিপ্তভাবে টাচ করেছে।

এগুলোকে সরলিকরণ করলে আরও ভালো হতো। যেমন একজন চিকিৎসক কীভাবে সেবা দেবে, কোয়ালিটি ভেদে সেবার মান কেমন হবে। মানটা কীভাবে যাচাই করা যাবে। কোয়ালিটি বা মান নিশ্চিত করতে না পারলে কি শাস্তি হবে এগুলোকে এক সাথে জুড়ে না দিয়ে আলাদা আলাদাভাবে উপস্থাপন করলে ভালো হতো।

তিনি বলেন, কেউ যখন বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায় তখন তো আমরা তাদের বাধা দিতে পারি না। ঠিক তেমনিভাবে স্বাস্থ্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগকেও অস্বীকার করা যাবে না।

তবে সেখানে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়া বিদেশি কোনো চিকিৎসক যাতে রোগী দেখতে না পারে সেগুলো ভালোভাবে মনিটরিং করতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাবেক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, আমরা আইনের খসড়া প্রণয়নের সময় যুক্ত ছিলাম। বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছি।

এরপরও কিছু তো কাটছাঁট তারা করেছে। আমরা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে বসেছিলাম। তারা আমাদের কথা শুনেছে। আমাদের নতুন করে কোনো অসঙ্গতি থাকলে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে বলেছে। আমরা তাদের কাছ থেকে এক মাস সময় পেয়েছি। এর মধ্যে আমরা সবার সাথে কথা বলে নতুন সংশোধনী আবার পাঠাবো।

স্বাস্থ্যসচিব (সেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, নতুন আইন তৈরি করা একটি কঠিন বিষয়। বহুদিনে তৈরি হয় একটি আইন। স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়াটি তৈরির সময় চিকিৎসকদের প্রতিনিধিদের পরামর্শেই করা হয়েছে। আইনের খসড়া এখন আমার হাতে নেই। না দেখে এখন বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।

চিকিৎসকদের মধ্যে কাদের পরামর্শ নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সারা দেশের সব চিকিৎসকের সঙ্গে তো কথা বলা সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন সংগঠনের পরামর্শ নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়ায় কি আছে
স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়ার আলোচিত ধারাগুলোতে বলা আছে, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো চিকিৎসক অফিস সময়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা দিতে পারবেন না।

অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে এক লাখ টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। এমনকী ছুটির দিনে চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলের জেলার বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে বা ব্যক্তিগত চেম্বারে টাকার বিনিময়ে সেবা দিতেও সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

এছাড়া প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রোগীদের চিকিৎসকের ফি সম্পর্কে জানাতে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি তালিকা চেম্বারের সামনে টাঙানো ও উক্ত ফি-এর রশিদ রোগীকে দিতে বাধ্য থাকবেন। সেবাগ্রহীতা বা তার অভিভাবককে ওই রসিদের অনুলিপি প্রদান করতে হবে। চেম্বারে রোগ পরীক্ষার ন্যূনতম চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকতে হবে।

অনুমোদিত ডিগ্রি ছাড়া অন্য কোনো ডিগ্রির বিবরণ সাইনবোর্ড বা নামফলক কিংবা ভিজিটিং কার্ডে উল্লেখ করা যাবে না। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ও ভিজিটিং কার্ডে বিএমডিসির নিবন্ধন নম্বর লেখা থাকতে হবে। মহিলা রোগীর পরীক্ষার জন্য মহিলা নার্স বা সহায়ক থাকতে হবে।

তবে জটিল পরিস্থিতিতে যৌক্তিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই শর্ত শিথিলযোগ্য। এক্ষেত্রে আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে এক লাখ টাকা জরিমানা, একইসঙ্গে আদালত সংশ্লিষ্ট বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মালিককে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হবে।

রোগী ও রোগীর স্বজনদের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। প্রয়োজনে রোগীকে বিকল্প চিকিৎসা দিতে হবে এবং তা রোগীর স্বজনদের জানাতে হবে। চিকিৎসাকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং অস্ত্রোপচারের জটিলতা রোগীর স্বজনদের জানাতে হবে। চিকিৎসা ব্যয় অর্থাৎ কোন খাতে কত ব্যয় হবে তা রোগীর স্বজনদের জানাতে হবে। চিকিৎসা দেয়ার অনুমতি নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি সহিংস কাজ করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সে ক্ষেত্রে সেবাদানকারী ও প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট করা, ধ্বংসের মতো অপরাধের শাস্তি তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

সন্দেহজনক মৃত্যু, আত্মহত্যা, বিষ প্রয়োগে হত্যা, বেআইনি গর্ভপাত, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিসহ এ ধরনের ঘটনা প্রমাণিত হলে চিকিৎসক বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান পুলিশকে অবহিত করতে বাধ্য থাকবে।

বিদেশি ডাক্তার সরকারের পূর্বানুমতি নিয়ে নিয়োগ দেয়া যাবে। বিদেশি আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থায়নে হাসপাতাল স্থাপন করা যাবে। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগসংক্রান্ত সব বিধিবিধান মানতে হবে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর