অন্যরকম এক রাজনীতির চমক

প্রিন্ট সংস্করণ॥রায়হান আহমেদ তপাদার   |   ০২:০৩, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

পিয়েরে ট্রুডোর কোলে থাকা তার শিশুটিকে দেখে প্রেসিডেন্ট নিক্সন মজা করে বলেছিলেন, এই শিশুটি এক দিন কানাডার প্রধানমন্ত্রী হবে। লোকজন তো তাই বলে! সেই রসিকতা কিন্তু হাসি-ঠাট্টায় মিলিয়ে যায়নি।

সেই ভবিষ্যদ্বাণী এক দিন সত্যি হয়েছে। ৪৩ বছর পর সেই শিশুটিই হলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। তাও একবার নয়। দু-দুবার! পিয়েরে ট্রুডোর সন্তান জাস্টিন ট্রুডো দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত হয়েছেন।

পরপর দুবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি। প্রথমবার মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কানাডার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনিই হলেন কানাডার ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী যার বাবাও ছিলেন একজন প্রধানমন্ত্রী।

২০১৫ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ দলের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারকে বিপুল ভোটে হারিয়ে বিজয়ী হন লিবারেল পার্টির নেতা ট্রুডো। ৪৩ বছর বয়সে প্রথম কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন জাস্টিন। কানাডার সবচেয়ে কম বয়স্ক প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় তিনি রয়েছেন দুই নাম্বারে।

কিন্তু হাস্যোজ্জ্বল, খোলা মনের ও চটপটে তারুণ্যেমাখা প্রধানমন্ত্রীর কথা এলে তিনি এক নাম্বারে। রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রীর কথা উঠলে আমরা ভেবেই নেই ব্যক্তিটি রাশভারী। গম্ভীর মুখে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বহর নিয়ে সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থাকবেন তিনি। না, সে ভাবনায় ছেদ ফেলেছেন জাস্টিন ট্রুডো।

রাস্তায় নেচে গেয়ে ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগিতেই তিনি বরং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফেসবুক, টুইটারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় তার নাচ। ভারতীয় উৎসব সংগীত ‘হাদিপ্পা’ এর সঙ্গে তার নাচে কোটি কোটি মানুষ আনন্দ পেয়েছে। কোর্তা-পায়জামা পরে এ ধরনের নাচ নতুন নয় তার জন্য।

এর আগে নির্বাচনি প্রচারণাতেও তাকে রাস্তায় নাচতে দেখা গেছে। টরন্টো গিয়ে চীনা নববর্ষ উদযাপনেও সিংহ পুতুলের সঙ্গে তিনি নেচে গেয়ে আনন্দ করেন। রেগিনা মোসাইক কালচার ফেস্টিভ্যালেও স্টেজ মাতিয়েছেন তিনি। শার্ট-প্যান্ট পরেই দর্শকদের আনন্দ-উল্লাসে নেচে শামিল হন।

ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তার ভালো লাগার গল্প এখন আর কারোরই অজানা নেই। ত্রিনিদাদে গিয়ে ভারতীয় উৎসবে নেচেছিলেন তিনি। তার উদার মনের এই শারীরিক প্রকাশই তাকে সাধারণের কাছে আলোচনায় এনেছে। অন্য প্রধানমন্ত্রীদের মতো বড়-সড় নিরাপত্তা বহর নিয়ে ছোটেন না তিনি।

তার পরিবারের অতীত ঘাঁটলে জানা যাবে, তিনি বেড়েই উঠেছেন বেশ রাজনৈতিক পরিবেশে। তার দাদা ছিলেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একজন। তার নানা ছিলেন এমপি ও মন্ত্রী। তার বাবা ছিলেন কানাডার প্রেসিডেন্ট। তার মা ছিলেন অভিনেত্রী, জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক।

তার স্ত্রী সোফিয়াও একজন খ্যাতনামা মডেল, উপস্থাপিকা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে জাস্টিন ট্রুডো নানা পেশায় জড়িয়েছেন। বরফে স্কি করার স্নো-বার্ডিং খেলায় তিনি পেশাদার কোচ ছিলেন। নাইট ক্লাবের গেটে দারোয়ান হিসেবেও কাজ করেছেন। বরফে ছোটার ‘র্যাফটিং গাইড’ও ছিলেন তিনি।

এছাড়া অভিনেতা ও ক্যাম্প কাউন্সিলর হিসেবে রয়েছে তার সুনাম। করেছেন শিক্ষকতা। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অল্পবিস্তর গাঁজাও টেনেছেন, সহজ স্বীকারোক্তি তার। এখন সেসব ছেড়েছেন পুরোপুরি। ক্ষমতার মালিক হয়ে গেলেই যে নেতারা বদলে যান; সে ধারণা ভেঙে দিয়েছেন তিনি। বরং সব শ্রেণির মানুষের মনই জয় করে নিয়েছেন।

ধর্ম, জাতি, ভাষা ও শ্রেণির বিভেদ ভুলে সবাইকে কাছে টেনে নিয়েছেন, প্রাপ্য সম্মান দিয়েছেন বলেই তিনি সবার চেয়ে আলাদা। নির্বাচিত হওয়ার পর সিরিয়া ও তুরস্কের শরণার্থীদের কানাডায় আশ্রয় দিয়েছেন। মধ্যবিত্তের করের বোঝা কমিয়ে বাড়িয়েছেন ধনীদের। কানাডার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরণটাও একেবারেই তৃণমূল থেকে ওঠে আসে।

নির্বাচনি এলাকার নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের রেজিস্টার্ড মেম্বারদের মধ্যে ওই এলাকার নেতা নির্ধারণের পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। কানাডাতে লিবারেল, কনজারভেটিভ, এনডিপি, ব্লক কুবেকিয়া, গ্রিন পার্টি, পিপলস পার্টি— এ দলগুলো সক্রিয়ভাবে রাজনীতির মাঠে আছে। স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার সুযোগও এখানে বিদ্যমান।

এছাড়া খুব আগ্রহ করে কানাডার ভোটাররা এদিকে তাকান না। তবে তারা জানেন, যার যেটুকু কাজ সেটুকু তিনি সৎভাবে পালন করবেন। নির্বাচনের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একজন অধিকর্তাও তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে এতটুকু অসৎ হওয়ার চিন্তা কখনো করতে পারেন না। এমন চর্চাই নেই এখানে। আমি হলফ করে বলতে পারি, কানাডার প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্টিফেন পেরোল্টের নাম কানাডার শতকরা ১০ ভাগ ভোটারও বলতে পারবেন না।

তাদের তেমনটা প্রয়োজনও নেই। কেননা, শুধু তিনিই নন, প্রত্যেক কর্মকর্তাই জানেন এবং বোঝেন নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর হতে হবে। তাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে— তা তারা একেবারেই জানতে চান না।

তিনি জনসমক্ষে কখনো আসেন না। টিভিতে তার চেহারা কখনো দেখা যায় না। তিনি জানেন, শুধু তার কাজ, তিনি জানেন তার সততা এবং একাগ্রতা। দেশ ও জনগণ ছাড়া তিনি যেন আর কাউকেই চেনেন না, জানেন না।

২০১৫ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই শরণার্থীদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন ট্রুডো। প্রথম চার মাসেই প্রায় ২৫ হাজার শরণার্থীকে কানাডায় আশ্রয় দেন।

এমনকি মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল এই তরুণ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ধর্মবিশ্বাস যাই হোক না কেন; নির্যাতন, সন্ত্রাস ও যুদ্ধপীড়িত অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা কানাডায় স্বাগত। তিনি পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও রাজনীতি শুরু করেন ২০০৮ সালে।

এর আগে এই তরুণ নানা পেশায় জড়িয়েছেন। জাস্টিন ট্রুডো গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। আর তখন থেকেই তিনি আলোচনায় ছিলেন। দুটি কারণে তার জনপ্রিয়তার পারদ ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর ছেলে বলে কানাডার রাজনীতিতে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জো নেই। জাস্টিন ট্রুডো সবার নজর কাড়েন কথা দিয়ে। দারুণ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। যতক্ষণ বক্তৃতা দেন শ্রোতারা জাদুমন্ত্রের মতো মুগ্ধ হয়ে থাকেন। খুব সহজেই মানুষের মনের চাওয়া-পাওয়া, দাবি, অভিযোগ তুলে ধরেন বক্তৃতায়। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যান। দ্বিতীয়ত, সাধারণ জীবন।

বড় নেতার এই গুণ তার মধ্যেও রয়েছে ট্রেনে, রেস্টুরেন্টে, স্টেডিয়ামে যেখানেই যান, গিয়ে বসেন সাধারণ মানুষের কাতারে। তিনি দুবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও এখনো সাধারণ মানুষ থেকে তাকে বিলাসীতায় অথবা ক্ষমতায় আলাদা করে দেখার জো নেই। রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষের সঙ্গে সেলফি তোলেন, বাচ্চা পেলে কোলে তুলে হেঁটে বেড়ান। রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার করে সবার সঙ্গে খেতে বসে যান। সকালে মর্নিং ওয়াকের জন্য দৌড়াতে শুরু করেন।

সঙ্গেই থাকে শহরের অন্য সাধারণ মানুষ। তিনি তাদের কথা শোনেন, আড্ডা দেন। রাজনীতিতে নামার আগেই তিনি দেশে তারকা। সুন্দরীদের কাছে তার আবেদনও কম ছিলো না। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের নিকটজন বলে মেনে নিয়েছে অনেক আগেই।

যখন ভোট চাইলেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তখন তার বয়স ৪০ পেরিয়েছে। যুবক বয়সেই সবার আস্থা আর ভালোবাসায় মাখামাখি তার। তারই প্রতিদান পেলেন। কানাডার পরপর দুবারের প্রধানমন্ত্রী হলেন। তার শুরুটা হয়েছিল ২০০৮ সালে মন্ট্রিয়লের পাপিনিউ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে।

সকালের সূর্য গোটা দিনের প্রতিচ্ছবি- কানাডার প্রভাবশালী পত্রিকা গ্লোব অ্যান্ড মেইলের প্রধান সম্পাদক অ্যাডওয়ার্ড গ্রিনস্পন তার সম্পাদকীয়তে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই বলে যে, নতুনদের মধ্যে তিনিই হয়তো আগামীর প্রধানমন্ত্রী। ২০১১ সালের নির্বাচন। লিবারেল পার্টির অবস্থা তখন নাজুক। কিন্তু চমক দেখালেন ট্রুডো।

২০১১ সালের নির্বাচনে যেখানে লিবারেল পার্টির আসন সংখ্যা ছিলো মাত্র ৩৬টি; সেখানে এবারের নির্বাচনে তার দল আসন পায় ১৮৪টি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিলো ১৭০টি। তিনি তার চেয়েও ১৪টি বেশি আসন পান। নির্বাচনে ভরাডুবির পর মাইকেল পদত্যাগ করেন দলের নেতৃত্ব থেকে।

২০১৩ সালে জাস্টিন ট্রুডো দলনেতা পদে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং বিপুল সমর্থন পেয়ে দলের নেতৃত্ব নেন। লিবারেল পার্টির প্রধান নেতা হিসেবে তিনি ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে নামেন।

মাত্র এক বছর নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন। প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রী থেকেই দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে নামেন ২০১৯ সালে। সাধারণ মানুষ এবারও ট্রুডোকেই বেছে নিলো কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর