শুষ্ক মৌসুম নয় বিএনপির টার্গেট বর্ষা!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম   |   ১২:৩৫, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

  • ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়াই আন্দোলনের শঙ্কা
  • সরকারের পতনে এক দফার আন্দোলনে বেশির ভাগের মতামত এসেছে
  • ভবিষ্যৎ ক্ষমতার চিন্তায় সমঝোতা আর কৌশলে চলছে দল
  • আন্দোলনে খালেদা জিয়া জীবিন্ত অবস্থায় বের হলে দল বাঁচবে
  • নেত্রীর অঘটন ঘটলে বিএনপির চলমান অবস্থাও বিলীন হয়ে যাবে
  • স্থায়ী কমিটিসহ শীর্ষরা সামনে থাকলে কর্মীরা বুলেটের সামনে জীবন দেবে

শুকনো মৌসুমে এক দফার আন্দোলনের প্রস্তাবনা দিয়েছে বিএনপির বেশির ভাগ নেতারা। রমজান, ঈদ ও বর্ষাকালের আগেই আন্দোলনের ঘোষণা চান তারা। আদালতের নির্দেশনার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গত ৫ তারিখে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে উপরের কারসাজি দেখছে বিএনপি।

তাই খালেদা জিয়াকে জীবন্ত অবস্থায় কারাগার থেকে বের করতে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া আর কোনো পথ খোলা দেখছেন না দলটির মাঠপর্যায়ের নেতারা। তাই আগামী ১২ ডিসেম্বর জামিন শুনানির আগে যে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়েছে তার সঙ্গে দেশ অচল ও সরকার পতনের ঘোষণাও চাওয়া হয়েছে।


তবে দলের নীতিনির্ধারকদের থেকে বলা হয়েছে, হুট করেই বড় আন্দোলন দিয়ে এত সহজে এই সরকারের পতন সম্ভব নয়। তাই আরও কয়েকমাস গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তার পরই কঠিন পথে যাওয়া হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করলে বর্ষাকাল চলে আসবে আর আন্দোলন করা সম্ভব হবে না।

এ নিয়ে কর্মসূচি নেয়া শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দলের বড় একটি অংশের কথা কাটাকাটি হয়েছে। বর্ষাকাল নয়, আন্দোলনের চিন্তা থাকলে ঘোষণা দিতে হবে এখনই। শুষ্ক মৌসুমই আন্দোলনের সঠিক সময়।

আদালতে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার অঘোষিতভাবে আইনজীবীদের নিয়ে বৈঠক করে স্থায়ী কমিটি। এরপর সম্প্রতি দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের নিয়ে নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ে যৌথ বৈঠকে বসা হয়। বৈঠক থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল দেশব্যাপী বিক্ষোভ-সমাবেশ পালন করা হয়েছে।

এছাড়া বিজয় দিবস ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষেও ঘরোয়া কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি।

দুটি বৈঠকে উপস্থিত থাকা নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনজীবীরাও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তির আশা ক্ষীণ। তাই রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমেই মুক্তিতে বাধ্য করতে হবে সরকারকে।

এছাড়া তৃণমূল নেতারাও বলেছেন, চূড়ান্ত আন্দোলনের ঘোষণা দিতে। তারা রাজপথে নামতে প্রস্তুত রয়েছেন।

বিশেষ করে গতকাল নয়াপল্টনে যৌথ বৈঠকে একাধিক নেতা অতীতের ভুল সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন। সরকারের ওপর আস্থা-বিশ্বাসে যে সমস্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো ভণ্ডুল হয়েছে তা তুলে ধরেন।

এর মধ্যে ছিলো ভোট বিপ্লবে সরকারের পতন না হওয়া। দলের দাবিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও মানেনি ক্ষমতাসীনরা। ছয়-সাতটি আসনের লোভও ছাড়েনি বিএনপি, তাই সরকারকে বৈধতা দিয়ে রয়েছেন জাতীয় সংসদে।

আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে শঙ্কটাপন্ন দলীয় নেত্রীকে মুক্তির জন্য এখনো কেনো ‘হার্ডলাইনে’ যাওয়া হচ্ছে না তার জবাব চাওয়া হয়।

দলটির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী ১২ তারিখ খালেদা জিয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না এলে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা যদি চূড়ান্ত আন্দোলনের ঘোষণা না দেন তাহলে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়াই আন্দোলনের শঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে ভেতরে ভেতরে বিএনপির বড় একটি প্রভাবশালী অংশ সেই পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাই বিএনপিও দল টেকাতে শেষপর্যায়ে আন্দোলনের পথেই হাঁটতে বাধ্য হবেন বলে মনে করছেন দলটির পর্যবেক্ষণ করা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

জানা গেছে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব, বাজার ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের সমর্থন, কূটনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা দাবি নিয়ে এখনই রাজপথে নামার মুখ্য সময় মনে করা হচ্ছে।

তাই খালেদাপন্থিদের বড় অংশটি আন্দোলনের জন্য দলটির নীতিনির্ধারকদের চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। সরকারকে চাপ দেয়া ছাড়া নেত্রী মুক্ত হবেন না। নেত্রীর অঘটন ঘটলে বিএনপির এখন যে অবস্থা, সেটিও বিলীন হয়ে যাবে। আর আন্দোলনের মাধ্যমে যদি নেত্রী জীবন্ত অবস্থায় বের হন তাহলে দল টিকবে। বিএনপির ভবিষ্যৎ থাকবে।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র অংশটি মনে করছেন, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কোনো লাভ নেই। স্বৈরাচার সরকারকে খুব সহজে সরানো যাবে না। হঠাৎ আন্দোলন করলে বিএনপিরই ক্ষতি বেশি হবে। এখনই রাস্তায় নেমে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করলে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

এদিকে আন্দোলনের জন্য লন্ডন থেকে তারেক জিয়া দল পুনর্গঠনের চেষ্টা করলেও একটি অংশের অনাগ্রহে সেটিও থমকে গেছে। রাতের আঁধারে ছাত্রদলের নেতৃত্ব এলেও এখনো দুই নেতা দিয়েই চলছে আন্দোলনের মূলশক্তির ছাত্রসংগঠনটি।

আসছে না পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আর লন্ডন থেকে যুবদলের কমিটি গঠনের নির্দেশ এলেও বর্তমান সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব সেটি কর্ণপাত করছেন না।

এছাড়া হচ্ছে না স্বেচ্ছাসেবকসহ অন্য কমিটিগুলোও। মাঠপর্যায়ের আন্দোলনের জন্য প্রথম সারিতে যেসব কর্মীর প্রয়োজন সেটা এখনো তৈরি হয়নি। তাই ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে যারা চিন্তা করছেন তাদের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আন্দোলন গৌণ বলেই মনে করছে একটি অংশ।

তাই তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, এখন দল গঠনের চেয়ে খালেদার মুক্তিতে নেতাকর্মীদের রাজপথে চাঙ্গা রাখাই বড় বিষয় হওয়া প্রয়োজন। দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য, স্থায়ী কমিটিসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা যদি রাজপথে নেমে আসতেন তাহলে নেতাকর্মীরা রাজপথে রক্ত দিতে নেমে আসতো। বড় নেতারা যদি আন্দোলনের সময় সামনের সারিতে থাকতেন তাহলে তৃণমূলের নেতারা পুলিশের বুলেটের সামনে জীবন দিতো।

কিন্তু বিএনপি যেভাবে চলা উচিত ছিলো, সেভাবে চলছে না। সমঝোতা আর কৌশলের ফাঁকে দলটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলেও নানান মহল থেকে অভিযোগ আসছে।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আইনগত লড়াইয়ের পাশাপাশি সরকার পতন আন্দোলনও বিএনপি চালিয়ে যাবে।আন্দোলনে সফলতার ব্যাপারে আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আশাবাদী।’

আন্দোলন প্রসঙ্গ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আরও ভাষ্য, ‘আন্দোলনের দাবি নিয়ে আমরা নিজেরা নিজেরা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছি, এটা ঠিক নয়। এখন আন্দোলনের চাইতেও ঐক্য বড়। স্বৈরাচার সরকারকে খুব সহজেই সরানো যায় না।’

বিএনপির আন্দোলনের চিন্তা নিয়ে জানতে চাইলে দলটির জ্যেষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এক দফার আন্দোলন ছাড়া, সরকার পতনের আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। আন্দোলন আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আমাদের আন্দোলনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সেখানে যদি সরকার উস্কানি দেয়, নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করে তাহলে এর দায়দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। অতএব সরকার পতনই সবকিছুর একমাত্র সমাধান। বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন তারা হতে দেবে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা আন্দোলনের কথা ভাবছি।’

তবে আন্দোলন প্রসঙ্গে সমপ্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদের মন্তব্য ছিলো এমন— বিএনপির কর্মীরা সাহসী, নেতারা দুর্বল। নেতাদের কেউ কেউ এত পয়সা বানিয়েছেন যে রাজপথে রোদ লাগাতে ইচ্ছে করে না।

তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা মাঠে নামুন, ইনশাআল্লাহ সরকার বিদায় হয়ে যাবে।’

এছাড়া গত বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনও বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি হবে না। আন্দোলন ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ খোলা নেই।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন