বানেশ্বর-সারদা-লালপুর-ঈশ্বরদী সড়কের বেহালদশা

ফেটে-চিড়ে চৌচির তবুও নেই বরাদ্দ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম   |   ১২:৫২, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

ফেটে-চিড়ে চৌচির হয়ে গেছে। খাড়া ইট (পোঁতা) হয়েছে গাড়া। ঈশ্বরদী থেকে বাঘা পর্যন্ত এই করুণদশা। বিশেষ করে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের কাছে আমবাড়িয়ার অবস্থা খুবই খারাপ। বড় বড় গর্তের কারণে ঠিকমতো চলাচল করা যাচ্ছে না। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি কেন ভালো হচ্ছে না।

এভাবে খেদোক্তি প্রকাশ করেন আমবাড়িয়ার ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন। শুধু ওই জালালই নয়, রাজশাহীর বানেশ্বর থেকে শুরু করে নাটোরের লালপুর ও পাবনার ঈশ্বরদীর সব মানুষেরই একই প্রশ্ন— কেন ভালো হচ্ছে না এই সড়ক।


পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ভারী যানবাহন চলাচলে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এটিকে আঞ্চলিক মহাসড়ক করা হবে। এ ব্যাপারে সড়ক পরিহন ও সেতু মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠালে সব প্রক্রিয়া শেষ করে একনেক সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের মানোন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫৪ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে পরিবহন খাতে ২৫৭টি প্রকল্পের বিপরীতে ৫২ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও স্থান পায়নি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি। তা বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় আছে।

তাই জুনের আগে একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও ব্যয় করার জন্য কোনো অর্থ পাবে না। অপেক্ষা করতে হবে আরও ছয় মাস বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বানেশ্বর-সারদা-চারঘাট-লালপুর- ইশ্বরদী সড়কটি একটি জেলা সড়ক।

কিন্তু এটি জাতীয় মহাসড়ক নাটোর-রাজশাহী-সোনামসজিদ সড়কের সাথে বানেশ্বর বাজারে মিলে চারঘাট-বাঘা-লালপুর হয়ে পাবনা জেলার সাথে মিলিত হয়েছে।

প্রায় ৫৫ কিলোমিটারের এই সড়কটিতে দীর্ঘদিন থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকে নাটোর ও পাবনায় পণ্য পরিবহনের প্রধান করিডোর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

এছাড়া বানেশ্বর থেকে চারঘাট পর্যন্ত দুপাশে ২৭টি অটো ডালমিল ও ৯টি রাইসমিলের পণ্য বহনে ভারী যান চলাচল করায় কয়েক বছর থেকে ফেটে-চিড়ে চৌচির হয়ে গেছে।

ইতিপূর্বে কিছু অংশ মজবুতিকরণ (ইটের সলিং) করা হলেও অধিকাংশ যানচলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে এই জেলা মহাসড়ককে আঞ্চলিক মহাসড়কের মানে উন্নীতকরণ নামে একটি প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।

সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর।

এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিজস্ব লোকবল দিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রকল্প এলাকা হচ্ছে— পুঠিয়া, চারঘাট, বাঘা, লালপুর ও ঈশ্বরদী উপজেলা।

প্রকল্পটি তিন জেলার পাঁচ উপজেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তালিকায় স্থান পায়নি। তা বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সড়ক পরিহনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, ওই এলাকার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো মানুষ কিছু বলেননি। আমদের নিজ উদ্যোগে এ পর্যায়ে আসা সম্ভব হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী সংশোধিত ডিপিপি পাঠানো হয়েছে।

কখন কাজ শুরু হবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, একনেক সভায় অনুমোদনের পর জিও (সরকারি আদেশ) জারি হবে। এরপর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ করে টেন্ডার আহবান করা হবে। সবমিলে চার মাস পার হয়ে যাবে কাজ শুরু করতে।

এবারে সবুজ পাতার তালিকায় থাকলেও আগামীতে এডিপির তালিকাভুক্ত হবে বলে জানান তিনি। তবে অন্য সূত্র জানায়, পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে এই সড়কের কাজ শুরু করতে ছয় মাস লাগবে।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয়েছে সড়ক বাঁধ প্রশস্তকরণ (মাটির কাজ) ৪ লাখ ৫২ হাজার ঘনমিটার, পেভমেন্ট পুনর্নির্মাণ ১০ দশমিক ৭০ কিলোমিটার।

এছাড়া বিদ্যমান পেভমেন্ট মজবুতিকরণ (সাড়ে ৫ মিটার প্রস্থ) ২৩ দশমিক ৯১ কি.মি.। বিদ্যমান পেভমেন্ট প্রশস্তকরণ সাড়ে ৫ মিটার থেকে ৭ দশমিক ৩০ মিটার) ৩৮ দশমিক ৮১ কিলোমিটার, হার্ড সোল্ডার নির্মাণ ৪৯ দশমিক ৫১ কিলোমিটার, সার্ফেসিং (৭ দশমিক ৩০ মিটার প্রস্থ) ৪৯ দশমিক ৫১ কি.মি.।

একইসাথে এই দীর্ঘ সড়ক পথে ১৪৭ মিটার আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। তাতে কালভার্ট হবে ৩৬টি। এক্সটেনশন আরসিসি বক্স কালভার্ট হবে ১৩টি। তাতে ৭৮ মিটার দীর্ঘ হবে।

এছাড়া পানি জমে যাতে সড়ক নষ্ট না হয় সেজন্য আরসিসি ইউ-ড্রেন নির্মাণ করা হবে প্রায় ২৬ কিলোমিটার এবং সসার ড্রেন হবে সোয়া কিলোমিটার।

এছাড়া সিগন্যাল, রোড মার্কিংসহ অন্যান্য কাজ করা হবে। এসব যাচাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে ৪ আগস্ট প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয় সড়ক মন্ত্রণালয়কে।

সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে সব প্রক্রিয়া শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সূত্র জানায়।

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামীমা নার্গিস বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীর পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘা উপজেলা, নাটোরের লালপুর এবং পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন