রাজনীতি বনাম অপরাজনীতি

প্রিন্ট সংস্করণ॥নূরুল আমিন চৌধুরী   |   ১০:৩৮, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

যেকোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে রাজনীতি থাকবে, রাজনৈতিক দল থাকবে, রাজনীতির চর্চা থাকবে, তার অনুশীলন থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টা অনেকটা অস্বাভাবিক হয়ে যায় তখনই, যখন রাজনৈতিক কোন্দল, দলের ভেতর দলাদলি, নেতৃত্বের কোন্দল, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে দলের ভাবাদর্শবিরোধী বা চরিত্র স্খলনজনিত স্বার্থবাদী ক্রিয়াকলাপ পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে অথবা কেবল কোনো না কোনো কারণে দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে বা দলের মধ্যকার বিশেষ কোনো ব্যক্তির দলনেতা হতে আর তর সয়না, এমতাবস্থায় দলে ভাঙনের সৃষ্টি হয়ে কোনো কোনো দল কয়েকটি দল বা উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। আবার দলের মধ্যে কেবল দলাদলিই নয়, মারামারি থেকে শুরু করে হানাহানি খুনাখুনি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এতে কেবল যে দলের ক্ষতি হয় তা-ই নয়, দলের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনীতিসচেতন নির্দলীয় মানুষরা কেবল যে এ ধরনের রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতৃবৃন্দের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠে তা-ই নয়, কোন্দলীয় রাজনীতির প্রতি আস্থাই হারিয়ে ফেলে। এ ধরনের রাজনীতি ও রাজনৈতিক চর্চাকে অপরাজনীতি বলাই যায়। সাধারণত রাজনীতির ক্রিয়াকর্ম দুই ধরনের। একটা হলো সরকার দলীয় রাজনীতি, অন্যটি হলো বিরোধী দলীয় রাজনীতি। যে দল সরকারে থাকে, তখন সরকার দলীয় রাজনীতিটা হয়ে পড়ে সরকারি রাজনীতি, আর বিরোধীদলীয় রাজনীতি হয়ে যায় জনগণের রাজনীতি।


এর কারণটা হলো— সরকারের ক্ষমতায় আসা দলটিও কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগে জনগণের রাজনীতি করেই ক্ষমতায় আরোহণ করে। গণতান্ত্র্রিক দেশে এই ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়াটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে। বিধিমতো নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে থাকে। গোপন ব্যালট পদ্ধতিতে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত ১৮ বছর থেকে তদুর্ধ বয়সি সকল নাগরিক এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারপ্রাপ্ত। যদি কোনো দল নির্বাচনে একচেটিয়াভাবে দেশের জাতীয় সংসদের আসনগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী ওই বিজিত দলই সরকার গঠন করবে।

সেখানে পরাজিত দল যদি এক তৃতীয়াংশ বা সংবিধান নির্দেশিত সংখ্যক আসনে নির্বাচিত হয়ে থাকে, তাদের সমন্বয়ে বা মেজরিটি আসনপ্রাপ্ত সরকারগঠনকারী দল তাদের পছন্দমতো উপযুক্ত বিবেচ্য যে কাউকে মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভূক্ত করে সরকার গঠন করতে পারে। এরপর শুরু হয়ে যায় দেশে নতুন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মহা কর্মযজ্ঞ। তখন আগের সরকারে থাকা ক্ষমতাসীন দল হয়ে যায় বিরোধী দল। আর আগের বিরোধী দল পরিণত হয় সরকারি দলে।

তবে ক্ষমতায় আসা সরকারি দল ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনকালে কেন জনগণ তাদের দলকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে, অন্যান্য দলের মতো তারাও তার সপক্ষে একটা ম্যানিফেস্টো প্রকাশসহ প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকে। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর যদি তারা ওই ম্যানিফেস্টো মোতাবেক সঠিকভাবে প্রদত্ত অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণই তাদের ভোটের মাধ্যমে সমুচিত জবাব দেবে। এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি বিরোধী দলগুলোরও কাজ হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে সহনশীল গঠনমূলক সমালোচনাপূর্বক সরকারের যাবতীয় মন্দ কাজের সঠিক তথ্য-উপাত্ত ঘরোয়া পরিবেশে বা যথাসম্ভব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে, সভা-সমাবেশ ও বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করা।

তাতে সরকার যদি কর্ণপাত না করে স্বেচ্ছাচারিতার পথে চলতে থাকে, তাহলে বিরোধী দল সভা-সমাবেশ ও বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করে পরবর্তী নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে তাদের পক্ষে জনমত গঠনের প্রয়াস চালাতে থাকবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু তার পরিবর্তে যদি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে জ্বালাও-পোড়াওসহ প্রকাশ্য রাজপথে সহিংস আন্দোলনের ভূমিকা গ্রহণ করে, সেটা হবে দেশে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাজনৈতিক তৎপরতা। আর সরকার যদি বিরোধী দলের কোনো ভালো পরামর্শকে উপেক্ষা করে তারা যেভাবে যা ভালো মনে করে তা-ই করতে থাকে, তখনই সহিংস আন্দোলনের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

আবার এই বিরোধী দলই যদি সরকারে থাকাকালে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের আগে বিরোধী দলে থাকার সময় এমনই আচরণ করে থাকে, তখন ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে, এ ধরনের দল ক্ষমতা হরানোর গ্লানি এবং আবার যেকোনোভাবে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার তাড়নায় মরিয়া হয়ে উঠে সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলনের পথটাই বেছে নিতে চায়। যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়, সমুচিতও নয়। তাহলে ওটাও হবে রাজনীতির পরিবর্তে অপরাজনীতি।

এরূপ অপরাজনীতি চর্চা কেবল যে সরকারের জন্যই বিপর্যয়কর তা-ই নয়, এটা একটা জাতিকে ও গোটা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে নষ্ট করে, দেশের অগ্রগতি ব্যাহত করে এবং জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চিরাচরিত প্রথায় দেশের স্বার্থপর সুবিধাবাদী ধর্মীয় বেশধারী, ব্যবসায়ীর সাইনবোর্ডধারী, জননেতার বেশধারী দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তরা ক্ষমতাসীন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি করার কূটকৌশলে শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পদ্ধতিতে যাবতীয় ভোগ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাজারে অনির্বাপণীয় আগুন ধরিয়ে দেবে।

যাতে সম্পূর্ণ অমানবিক ও অনৈতিক উপায়ে নিরীহ জনগণের গলা কেটে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারে, মানুষের মধ্যে সরকারবিরোধী জনরোষ সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পারে। মানুষের জীবন নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনীতির এরূপ খেলাই হলো অপরাজনীতি। কোনো দেশে যখন অপরাজনীতি খুব বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, আর দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং দেশ অস্ত্বিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখী হয়, তখন অনিবার্য কারণে দেশ দেশের সেনাশাসনের অধীনে চলে যায়।

যেটা পাকিস্তান আমলে, স্বাধীনতা লাভের পরবর্তীসময়গুলোতে, সর্বশেষ গত ২০০৭ সালে দেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হতে দেখা গেছে। এরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি না কোনো দলের জন্য, না দেশের জন্য, না জনগণের জন্য, কারো জন্যই কল্যাণকর নয়। সেনাশাসন ব্যবস্থায় দেশের সংবিধান রহিত হওয়াসহ দেশে সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়ে যায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কবর রচিত হয়। এরপর অপরাজনীতি চর্চাকারীদের শুভ বুদ্ধির উদয় হলেও দেশে আবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাটা কতটুকু দুঃসাধ্যজনক হয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতাও আছে এ দেশের মানুষদের ও রাজনৈতিক দলগুলোর।

তাই দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে, দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে, জাতির ভষ্যিৎ প্রজন্মের স্বার্থে অপরাজনীতি চর্চা থেকে বিরত হওয়া যেমন মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও বটে। তাই দেশের সরকারি দল ও সকল বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের উচিত নিজেদের স্বার্থে, নিজ নিজ দলের স্বার্থে দলীয় কোন্দল, দলীয় মনোমালিন্য হেতু দল ভাঙন প্রবণতা, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতার পরিবর্তে বিশুদ্ধ মননশীল, সহনশীল ও গঠনমূলক রাজনীতি চর্চাকে প্রাধান্য দেয়া।

ভোটারবিহীন বলা হোক বা যা-ই বলা হোক না কেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার হটানোর সকল চেষ্টা তো ব্যর্থ হয়ে মাত্র একটি বছরের মাথাতেই পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময় এসে গেলো বলে, এ মুহূর্তে দেশের বিরোধী দলগুলোর উচিত সরকারবিরোধী সহিংস কোনো কর্মসূচির দিকে না গিয়ে সর্বান্তকরণে মরণপণ সাহস ও শক্তি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। গোঁয়ার্তুমি বা অভিমানের কারণে বা একটি দলের পেশিশক্তি না হোক কৌশলের কাছে হার মানার ভয়ে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যারা ওই নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচন বলে আসছে, তারা সেটা ঠিক করেছিল না বেঠিক করেছিল সেটা এখন বলাই বাহুল্য।

তাদের এখনকার কর্তব্য হলো আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ ও সর্বতো প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কথায় বলে ‘কেউ দেখে শেখে আবার কেউ ঠেকে শেখে’। এতদিনের কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কে কতটুকু শিখলো এবং সে শিক্ষাটা কতটুকু কাজে লাগাতে পারে— এখন সেটাই দেখার পালা। দেশের নিরীহ সরল মানুষদের রাজনীতি চক্রের গিনিপিগ না বানিয়ে সত্যিকার দেশপ্রেমী ও জনহিতকর রাজনীতি চর্চার পরিচয় দেয়ার এ সুযোগকে কোনোভাবে হাতছাড়া হতে দিয়ে আর যেন কেউ পরবর্তী সময়ে পস্তানোর মতো অবস্থায় না পড়ে এটাই হবে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ সঠিক রাজনীতির কাজ।

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা এ ব্যাপারটা সঠিকভাবে অনুধাবন করলে দেশ ও দেশের মানুষ অপরাজনীতির কবল ও প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করে রাজনীতিতে প্রবাহিতব্য সুবাতাসে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে এবং নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুস্থ রাজনীতি চর্চায় উৎসাহিত হবে।

লেখক : সাবেক কলেজ অধ্যক্ষ, গবেষক ও কলামিস্ট

এমএআই


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর