কাঁটাতারবিহীন দামুড়হুদার ঠাকুরপুর সীমান্ত

দালাল দিয়ে পুলিশ-বিজিবির চোরাচালান

প্রিন্ট সংস্করণ॥দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি   |   ১২:৫৫, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

  • যাচ্ছে মানব ও ধাতব মেডেল আসছে গরু, মোটরসাইকেল, মদ, ফেনসিডিল ও মেশিনারিজ
  • গরুর জোড়াপ্রতি দালাল পাচ্ছে ১০ হাজার, মানবপাচারে জনপ্রতি ২ হাজার
  • গরুর জোড়াপ্রতি পুলিশ পাচ্ছে ৩০০, বিজিবি পাচ্ছে ৫০০
  • প্রতি মোটরসাইকেলে বিজিবির নামে ৬ হাজার
  • থানা পুলিশের নামে ৭ হাজার টাকা আদায় করছে দালালরা

সরাসরি নয়, দালাল দিয়েই চলছে থানা পুলিশ ও বিজিবির দামুড়হুদার ঠাকুরপুর সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকার চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ। চোরাচালানের টাকায় দালাল যেমন কম সময়ে বনে যাচ্ছেন লাখপতিতে, তেমনি থানা পুলিশের অসাধু কর্মকর্তা ও বিজিবির অসাধু সদস্যরাও হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের অর্থ।

প্রশাসনিক দালালদের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের চোরাকারবারিরা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে চোরাচালান। এ যেন দেখার কেউ নেই। মাঝে মধ্যে কথিত অভিযানে দু-একজন পাচারকারি ধরা পড়লেও স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের তদবিরে আইনি প্রক্রিয়া শেষের আগেই বেরিয়েও আসে চোরাকারবারিরা।


স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের ওপরেও রহস্যময়ী কোনো এক শক্তির জোরেই বারবার চোরাকারবারিরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং দিনের পর দিন চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে ঠাকুরপুর সীমান্ত।

সরেজমিন দেখা গেছে, দামুড়হুদার ঠাকুরপুর সীমান্তের ৮৯নং মেইন পিলার থেকে ৯২নং মেইন পিলার পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটারের মধ্যে নেই কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্ত উন্মুক্তের সুযোগ কাজে লাগিয়েই দিনের পর দিন আঞ্চলিক চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এই সীমান্ত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দামুড়হুদা থানা পুলিশের কথিত দালাল ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির দালালদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে ধাতব্য মেডেল ও মানবপাচার কয়েকগুণ বেড়ে গেছে এ সীমান্তে।

বাংলাদেশ থেকে এ সীমান্ত দিয়েই দাতব্য মেডেল আর মানবপাচারের পাশাপাশি ভারত থেকেও আসছে গরু, বিভিন্ন ধরনের চোরাই মোটরসাইকেলসহ মদ, ফেনসিডিল ও মেশিনারিজ। চোরাকারবারিরা রাতের অন্ধকারেই পুলিশ ও বিজিবির দালালদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চোরাচালানের কাজে জড়াচ্ছে বলেও জানা যায়।

অবৈধভাবে ভারত থেকে আনা এসব পণ্যে সয়লাব হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাজারগুলো, তেমনি দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ছে চোরাচালানের এসব পণ্য। যার মোটা অঙ্কের অর্থ যাচ্ছে থানা পুলিশ ও বিজিবির দালালদের পকেটে। বাদ নেই পুলিশ ও বিজিবির অসাধু সদস্যরাও।

এর বিনিময়েই পাচারকারিদের জন্য সীমান্ত বিচরণে নির্বিঘ্নতা এনে দিয়েছে তারা। সম্প্রতি গরু পাচার করতে গিয়ে ঠাকুরপুর গ্রামে গোলাম রসুলের ছেলে আব্দুল্লাহ ও চাকুলিয়া গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে গনি মিয়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বিএসএফ’র গুলিতে নিহত হয়।

সীমান্তে চোরাকারবারিদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা অহরহ ঘটলেও চোরাকারবার থেমে নেই ওই সীমান্তে। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও অদৃশ্য শক্তির বলে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই কাজে জড়িয়ে পড়ছে তারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ও কুড়ুলগাছি ইউনিয়নের ঠাকুরপুর সীমান্তে বিজিবির কথিত দালাল ওবাইদুল, লালু, মানিক, শহিদুল, আমির, কাটি, আবু আলী, ভুট্টু, মালেক, উজ্জল ও থানা পুলিশের ফটিক, আ. হাই, ইউনুচ, হাকিম মোল্লা, ছাব্দার, জাহাঙ্গীর, চাকুলিয়া সীমান্তে শমসের আলী, রিকাব আলী, হাবিবুর এবং মুন্সিপুর সীমান্তে কথিত দালাল শাহাবুদ্দিন, শাখাওয়াত, জলিলসহ অনেকেই চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। আর চোরাকারবারের দালালি করে এদের সবাই বনে গেছেন লাখপতি।

সূত্র জানায়, সীমান্তে গরু পাচারে জোড়াপ্রতি বিজিবি ও থানা পুলিশের নামে ১০ হাজার টাকা, মানবপাচারে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে দালালদের মাধ্যমে আদায় করছে দালালরা। অন্যদিকে গরুর জোড়াপ্রতি বিজিবির জন্য দালালরা নিচ্ছে ৫০০ টাকা আর থানা পুলিশের জন্য দালালরা নিচ্ছে ৩০০ টাকা করে।

জানা গেছে, ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী কেয়ামত ফকিরের ছেলে রমজান আলী, নজিরের ছেলে তারিক, রমজান মোল্লার ছেলে ফটিক, ইদ্রিস আলীর ছেলে মহসিন, ফকিরের ছেলে আশিক এবং সাহেব কল্লার ছেলে হিরোকসহ অনেকেই ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেলের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন মডেলের ভারতীয় মোটরসাইকেল কম দামে কিনে রাতের আঁধারে প্রশাসনের নজরদারির মধ্যেও সীমান্ত পারাপার করছে তারা।

সূত্র জানায়, দালালরা মোটরসাইকেল প্রতি বিজিবির নামে ছয় হাজার ও থানা পুলিশের নামে সাত হাজার টাকা আদায় করে। এসব গাড়ি আশপাশের জেলাসহ সারা দেশের বিভিন্নস্থানে সরবরাহ করছে চোরাকারবারিরা।

প্রায় ৬ মাস আগেও ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেল কিনে কার্পাসডাঙ্গা ফাঁড়ি পুলিশের ইনচার্জ এসআই অচিন্ত কুমার পাল বিপাকে পড়েছিলেন বলে প্রকাশ রয়েছে।

এছাড়াও এ ঘটনায় তাকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। এই সীমান্ত দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ভারতীয় মোটরসাইকেলসহ মদ, ফেনসিডিল, গাঁজা, বাইসাইকেল, বিভিন্ন মেশিনারিজ পাচার হয়ে আসছে নির্বিঘ্নে।

এদিকে ঠাকুরপুর সীমান্তের প্রায় ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় পাচার-বাণিজ্য দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েই চলছে। যা নিয়ে থানা পুলিশ কিংবা সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক বিজিবির কর্মকর্তাদের মাথাব্যথা না থাকায় চোরাকারবার বেড়েছে বলে দাবি করছে স্থানীয়রা।

সীমান্তে থানা পুলিশের দালালদের বিষয়ে দামুড়হুদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুকুমার বিশ্বাস আমার সংবাদকে বলেন, সীমান্তে থানা পুলিশের কোনো দালাল নেই। যদি কোনো ব্যক্তি পুলিশের নাম ভাঙিয়ে উৎকোচ আদায় করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে যা যা করা দরকার তিনি তা করবেন।

এছাড়া সীমান্তে বিজিবির দালাল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সীমান্তে বিজিবির কোনো সোর্স বা দালাল নেই। যদি কোনো ব্যক্তি বিজিবির নাম ভাঙিয়ে উৎকোচ আদায় করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া সীমান্তে চোরাকারবারি ও প্রশাসনের কথিত দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমার সংবাদের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার ও ৬ বিজিবির অধিনায়কের প্রতি অনুরোধ জানান স্থানীয় সচেতন মহল।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন